এরই মধ্যে ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামানসহ ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার ঘটনায় দায়ের করা বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে কালবেলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে পলাতক থাকা ৩৩ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে গত দুই বছরে পলাতক থাকার অভিযোগে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

চাকরি হারানোর প্রক্রিয়ায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন রংপুরের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত মো. শাহ নূর আলম পাটওয়ারী। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রায় হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে পলাতক।

সাবেক এসপি মো. আলী আশরাফ ভূঞার বিরুদ্ধেও পলাতক থাকার অভিযোগ রয়েছে। রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার জেসমিন কেকা ও আয়েশা সিদ্দিকাও পলাতক। জেসমিন কেকার বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। আর আয়েশা সিদ্দিকাকে বরখাস্তের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বগুড়ার সাবেক এসপি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ইতোমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে চলমান দ্বিতীয় বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি নূরে আলম মিনা পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধেও চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া চলছে। অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে ডিএমপির সাবেক ডিআইজি কাজী মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার অভিযোগে এ কে এম এহসানউল্লাহর বিরুদ্ধেও চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।

এ তালিকায় আরও রয়েছেন ডিআইজি বিপ্লব বিজয় তালুকদার, অতিরিক্ত ডিআইজি টুটুল চক্রবর্তী, অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, ডিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম, রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান, পুলিশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এন্টি টেররিজম ইউনিটের সাবেক পুলিশ সুপার মো. আবু মারুফ হোসেন, এপিবিএনে সংযুক্ত ডিআইজি হাসানুজ্জামান মোল্যা, নারায়ণগঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল, পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হাসান আরাফাত, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জামালপুরের সাবেক জেলা কমান্ড্যান্ট জে এম ইমরান, গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের সাবেক এসপি মো. রহমত উল্লাহ চৌধুরী, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার এস এম মেহেদী হাসান, লক্ষ্মীপুরের সাবেক এসপি মো. তারেক বিন রশিদ এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী।

গোলাম মোস্তফা রাসেলের বরখাস্তের আদেশ চূড়ান্ত করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বেআইনিভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো এবং তৎকালীন সরকারের সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের অনেকে দেশ ছেড়ে গেছেন। তাদের কেউ প্রতিবেশী দেশে, আবার কেউ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা কর্মকর্তাদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হলেও অনেকে তাতে সাড়া দেননি। এরপর তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তের প্রয়োজনে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশও পাঠানো হয়েছে। কয়েকজন নোটিশের জবাব দিলেও তা সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুসরণ করেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর চাকরিচ্যুতির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আরও যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চলছে

ঢাকা হাইওয়ে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মীর মোদাচ্ছের হোসেনের নথি উপস্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ২৪ আনসার ব্যাটালিয়নের সাবেক পরিচালক মুহাম্মদ মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণীর খসড়া পাঠানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর খুলনা রেঞ্জে সংযুক্ত করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

গাইবান্ধার সাবেক এসপি মো. কামাল হোসেনের বিভাগীয় মামলাও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, তাকেও চাকরিতে রাখা হবে না।

পুলিশ অধিদপ্তরে সংযুক্ত অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও চলছে। ব্যক্তিগত শুনানিতে হাজির হতে বলা হলেও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি উপস্থিত হননি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের মামলাটি বর্তমানে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া গাইবান্ধা পিবিআইয়ের সাবেক এসপি রাজীব ফরহান ও নাটোর সার্কেলের সাবেক এএসপি মো. আপেল মাহমুদের মামলায় ব্যক্তিগত শুনানি এখনো হয়নি।

নাশকতার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় কার্যক্রম চলছে। তাদের মধ্যে মুহাম্মদ মেহেদী হাসান, ময়মনসিংহ রেঞ্জে সংযুক্ত মো. ফখরুল আলম এবং রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত সৈয়দ ইফতেহার আলী রয়েছেন।

অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগেও চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে। এসব মামলার পরিণতিতে চাকরিচ্যুতির পথ তৈরি হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) মতামত এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত এবং ঠাকুরগাঁও ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের সাবেক কমান্ড্যান্ট (পুলিশ সুপার) এস এম ফজলুল হক বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের প্রক্রিয়া চলছে।

রংপুরের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শিবলী কায়সারের বিরুদ্ধে অসদাচরণের তদন্ত শেষ হয়েছে। তাকে বরখাস্তের বিষয়ে পিএসসির পরামর্শ চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে।

কক্সবাজারের সাবেক এসপি মুহাম্মদ রহমত উল্লাহর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলার তদন্ত চলছে। একই ধরনের অভিযোগে ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা রয়েছে।

পলায়ন, নাশকতা, অসদাচরণ ও দুর্নীতির বাইরে বিভিন্ন অভিযোগে আরও ১৩ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এসব কর্মকর্তার অধিকাংশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের সহিংসতার ঘটনায় গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও কারও কারও বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্তের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশনের মতামত নেওয়ার বিধান রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কয়েকজনের নথি পিএসসিতে পাঠানো হয়েছে। আরও কয়েকজনকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার অনুমোদন নিতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পিএসসি ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে মোট ১৫টি সারসংক্ষেপ।

এরই মধ্যে পলায়ন এবং অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামানসহ ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, বরখাস্ত হওয়া অন্য পাঁচ কর্মকর্তা হলেন—অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ রঞ্জন দে, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রাজীব দাস এবং সাবেক পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল।

এনএইচ