তারা আরো বলেন, পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলা হয়েছে। বিভক্তির জন্য শাস্তির হুঁশিয়ারিও রয়েছে। তাই ছোট-খাট মতভেদ ভুলে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য জরুরি। এছাড়া আমেরিকা-ইসরাইল সহ বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর মোকাবেলায় জ্ঞান-বিজ্ঞানেও মুসলমানদের পুরানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। বাংলাদেশেও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে আলেম-ওলামাদের এক টেবিলে বসার আহবান জানান বক্তারা।

মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে ‘এক মুসলিম দাওয়াহ কল্যাণ সংস্থা’। সংগঠনের সভাপতি মো. জালাল ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে সভায় মুল প্রবন্ধ পাঠ করেন সেক্রেটারি সৈয়দ এম আর জুলফিকর।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, সব কিছুতেই ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে আমরা যেভাবে মার খাচ্ছি, সেখানে শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যদি এক হয়ে একটা হুংকার দেয় তাহলে ইসরাইলের কোন অবস্থা থাকে না। কিন্তু সবাই নিজের চিন্তায় মগ্ন। এটাও ঠিক যে, ইরানের যে শক্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, যদি এই প্রতিরোধটা না হতো তাহলে এতদিনে সম্পূর্ণ মুসলিম উম্মাহকে গ্রাস করা হতো। এই প্রতিরোধ হয়েছে বলেই আগ্রাসন একটা জায়গায় থমকে দাঁড়িয়েছে; এখান থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

আব্দুস সালাম আরো বলেন, সত্যিকার অর্থে আমরা যদি নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করি, তবে মানবিকতার চরম লঙ্ঘন আমাদের মনে এবং অন্তরে লাগা উচিত। আজকের বিশ্বে মুসলমানদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং মানবিকতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বেঁচে থাকার জন্য নিজের শক্তি নিজে অর্জন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নাই।

তিনির বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আজকে যদি একজনকে আক্রমণ করা হয় তবে অন্য কেউ নিরাপদ নয়। ইরাক ও সিরিয়াকে শেষ করার পর এখন ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং ইরান সফল না হলে পরবর্তী লক্ষ্য অন্য কেউ হবে। বিভক্তির কারণে আজ আমরা আমাদের পূর্বের মেধা ও শক্তি হারিয়ে ফেলছি; অথচ একসময় মুসলমানরাই বিশ্ব পরিচালনা করত। তাই বিভেদ দূর করে ঐক্যের ব্যানারে আসতে পারলে আমাদের শক্তির পরাজয় ঘটার কোনো কারণ নেই।

প্রধান আলোচক হিসেবে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি অনেক প্রাচীন। হযরত হাসান (রা.) ৬৬১ সালে হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পরে তিনি দুঃখ-ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন রক্তের বন্যায় উম্মাহ ভেসে গেছে। অথচ তার মাত্র ২৫ বছর আগে ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান বাহিনী একই সঙ্গে তৎকালীন সবথেকে শক্তিশালী দুই সাম্রাজ্য—বাইজানটাইন এবং পার্সিয়াকে একই সঙ্গে পরাজিত করেছিল। ইসলামের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল তখন থেকেই।

তিনি বলেন, আল্লাহ আমাদের অনেক সম্পদ দিয়েছেন, কিন্তু তারপরও আমরা পিছিয়ে গেছি। কারণ আল্লাহ সম্পদ দেয়ার পাশাপাশি মাথাকে কাজে লাগাতে বলেছেন। তিনি পবিত্র কোরআনের শুরুতেই পড়তে বলেছেন। অথচ আমরা সেই পড়াটাই ছেড়ে দিয়েছি। আমরা যদি জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যেতে না পারি তাহলে কিভাবে পৃথিবীতে এই আমেরিকা বা ইসরাইলের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে পারব? একটা সমস্যা তো অবশ্যই আমাদের বিভক্তি, তার সঙ্গে আরেকটা সমস্যা হলো যে জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমরা পিছিয়ে আছি।

মাহমুদুর রহমান বলেন, আমরা যদি আজ থেকে এক হাজার বছর আগে পিছনে চলে যাই, তাহলে দেখব জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানরাই সর্বশ্রেষ্ঠ। তখনকার যত দার্শনিক, যত বিজ্ঞানী—ইবনে সিনা, আল-বেরুনির মত লোক ছিল। কিন্তু আজকে আমাদের যুগের ইবনে সিনা কই? আমাদের যুগের আল-বেরুনি কই? আমাদের যুগের রুমি কই? কাজেই আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে গেছি এটা আমাদেরকে মেনে নিতে হবে। এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে যদি আমরা এগিয়ে যেতে না পারি সেক্ষেত্রে আমরা সফলভাবে অন্যান্য জাতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে পারব না।

তিনি বলেন, ইরানে ইসলামিক বিপ্লব সফল হওয়ার পর থেকেই আমেরিকা ইরানকে টার্গেট করেছে। কারণ আমেরিকা চিন্তা করেছে যে, একটি রাষ্ট্রে যদি ইসলামিক রেভল্যুশন সাকসেসফুল হয়ে যায় এবং তারা যদি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে উন্নতি করে ফেলে তাহলে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোও একই দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কাজেই ইসলামিক বিপ্লবকে ব্যর্থ করতে না পারলে পৃথিবীতে ইসলামের বিজয় ঠেকানো যাবে না। বর্তমানে ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সবথেকে এগিয়ে আছে ইরান। আর আমাদের দুর্ভাগ্যের কথা হচ্ছে ওআইসিকে কার্যকর দেখতে পারি নাই। মুসলিম অত্যাচারের বিরুদ্ধে কখনো সংস্থাটি প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। কাজেই ওআইসির পুনর্গঠন করা দরকার। এই পুনর্গঠন ছাড়া মুসলিম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না।

শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব কোনো নতুন উদ্ভাবন নয়, এটি হাজার বছর ধরে চলে আসছে মন্তব্য করে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, এটাকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। আমরা সবাই মুসলমান এটা মূল কথা। তিনি বলেন, শুধু ইসলামের মধ্যে বিভক্তি আছে? খ্রিস্টানদের মধ্যেও প্রধান তিনটি ভাগ আছে, কিন্তু সারাদিন নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করি। তাই আমাদের খোলা মনে আলোচনা করা দরকার। আমি ধর্মীয় নেতাদেরও আহ্বান জানাব আপনারা এক টেবিলে বসুন। একে অপরকে মুসলমান মেনে নিলেই বিভেদ অনেকাংশে চলে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইরান দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত জলিল রাহিমী জাহানাবাদী বলেন, মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে ইরানে আমেরিকা-ইসরাইল হামলার সাহস পেত না, অন্য দেশে তারা ঘাটি গাড়তে পারত না, ফিলিস্তিনে শিশুদের হত্যাও করতে পারত না। তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে বাইরের শক্তির কাছে দ্বারস্থ হওয়া লাগবে না। বিভিন্ন চুক্তি ও ঘাটির মাধ্যমে কুফরি শক্তির আধিপত্যের সুযোগ আমরাই করে দিয়েছি। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে মুসলিম সংস্থাগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

আরো বক্তব্য রাখেন সাবেক মন্ত্রী এম নাজিমুদ্দিন আল আজাদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত মসউদ মান্নান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের, অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান খন্দকার প্রমুখ।

এমএম