আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনৈতিক সফলতার পর বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক পুশব্যাক করার উসকানিমূলক তৎপরতা হঠাৎ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার এখন আসামের মতোই রাজ্যটিতে মুসলিম জনগোষ্ঠী কমানোর কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এরই অংশ হিসেবে অনেক বাংলাভাষী ভারতীয় মুসলিমকেও ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভারতের বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থাও বিজেপি সরকারের এই বৈষম্যমূলক প্রয়াসের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্য দিকে ভারতের এই আকস্মিক ও আগ্রাসী তৎপরতা রুখতে বাংলাদেশ সীমান্তে ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক সীমান্তরক্ষী মোতায়েন করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বর্তমানে বিজিবির প্রায় ৬০ হাজার সদস্য চার শিফটে বিভক্ত হয়ে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। রাজনৈতিক সংবাদ বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগেই এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়। নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যটির প্রায় ৬০ লাখ মানুষের নাম কেটে দেয়া হয়, যার একটি বড় অংশই মুসলিম। এর ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের চিরাচরিত ভোটব্যাংকে ধস নামে। নির্বাচনের পর দেখা যায়, রাজারহাট-নিউটাউনের মতো ৮৮ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বুথেও ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি, যা বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক সন্দেহ ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, যেসব জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি এবং যারা নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, পরিকল্পিতভাবে সেখানেই নাম কাটার হার ছিল সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে শুধু মুর্শিদাবাদেই ৪ লাখ ৬০ হাজার, উত্তর চব্বিশ পরগনায় ৩ লাখ ৩০ হাজার এবং মালদহে ২ লাখ ৪০ হাজার ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। পুরো নির্বাচনে বিজেপি ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ ও ‘রোহিঙ্গা খেদাও’ ইস্যুকে প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ে দিল্লির বিজেপি সরকারগুলোর দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। তবে এর কারণ কোনো বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ নয়; বরং স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের উচ্চ জন্মহার ও বাল্যবিয়ে। কোনো জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি হয়ে গেলে হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি করা বিজেপির জন্য নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, আর তখনই মূলত ‘ধর্মীয় কার্ড’ খেলা হয়।
২০১১ সালের ভারতের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, আসামের মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ (৩৫%)। বর্তমানে তা বেড়ে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি ৪৬ লাখ (২৭%)। ২০২৬ সালের আনুমানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যে মুসলমানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ৫০ থেকে ৭০ লাখের কাছাকাছি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ। আসামের ধুবড়ি জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৮০%)। এ ছাড়া বরপেটা, নগাঁও ও করিমগঞ্জেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় মুসলিম জনগোষ্ঠী ৬৬ শতাংশ।
দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মতে, সীমান্তবর্তী এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভবিষ্যতে ভারতের জন্য নিরাপত্তাজনিত হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে কাছাকাছি অঞ্চলে চীনের অবস্থান এবং অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে বেইজিংয়ের দাবির কারণে ভারত শঙ্কিত যে, কোনো সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখা দিলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী কোন দিকে ঝুঁকবে। অথচ ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার বা কেরালা রাজ্যে বিপুলসংখ্যক মুসলিম থাকলেও সীমান্তবর্তী না হওয়ায় তা নিয়ে বিজেপির কোনো মাথাব্যথা নেই।
ঐতিহাসিকভাবে, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের অনেকেরই পূর্বপুরুষ বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, জামালপুর ও নেত্রকোনা অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। তবে দেশভাগের পর ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত এবং পরে আসাম আন্দোলনের চুক্তি অনুযায়ী, ২৪ মার্চ ১৯৭১ সালের আগে যারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে ধর্ম নির্বিশেষে ভারতে এসেছেন, তারা সবাই আইনিভাবে ভারতীয় নাগরিক। ফলে কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী এই বাংলাভাষীদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা ভারতের নিজস্ব আইনেই কঠিন।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘বাংলাদেশের বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ই ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন ছিল। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর ভারতের কাছ থেকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বার্তা আসছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পরপরই হঠাৎ করে সীমান্তে উসকানি ও পুশইন তৎপরতা বেড়ে গেছে।’
তিনি আরো জানান, ভারতের বিভিন্ন সামরিক থিংক ট্যাংকের মতে, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা নিয়ে ভারত একটি বিশেষ ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ গড়ে তুলতে চায়, যেখান থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদের বাংলাদেশে পুশইন করার সামরিক রূপরেখা রয়েছে। আলতাফ পারভেজের মতে, এই আকস্মিক পুশইনের পেছনে গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। এর মাধ্যমে ভারত সম্ভবত বাংলাদেশকে কোনো বিশেষ বার্তা দিতে চাইছে, যার নেপথ্যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন রাজনীতি, চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা এগিয়ে নেয়া অথবা তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক ঘনিষ্ঠতার মতো ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলো জড়িত থাকতে পারে।রাজনৈতিক সংবাদ বিশ্লেষণ
সীমান্তে পরিবারগুলোর নাগরিকত্ব যাচাই
এদিকে সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী প্রতিটি পরিবারের নাগরিকত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলোতে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক (ডেমোগ্রাফিক) পরিবর্তনের ওপর একটি কমিটি গঠন করেছে। আমি মনে করি সরকার সীমান্ত এলাকায় জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন নিয়ে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার উদ্ধৃতি দিয়ে এ সব কথা জানানো হয়েছে।
আসামের সাথে বাংলাদেশের এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে উল্লেখ করে শর্মা বলেন, ১৯৮৫ সালে আসাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর আমরা বলেছিলাম যে, আসাম-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া উচিত এবং সে অনুযায়ী কাজ করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা তখন ভাবিনি মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গেও একইভাবে বেড়া দেয়া দরকার।
বাংলাদেশের সাথে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ সীমান্তঘেঁষা সব রাজ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে দেরি করাকে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ আখ্যায়িত করেছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী।
এমএম