ঢাকা: রাত দশটায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত ১০ম সংসদ নির্বাচনের ১৪৭টি আসনের অধিকাংশের ফলাফলই প্রকাশিত হয়। যদি রাজধানী ঢাকা বিভিন্ন আসনে মোট কত শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে তার বিস্তারিত তখনও পূর্ণাঙ্গরুপে জানা যায়নি।  
এদিকে, এরই মধ্যে বেসরকারীভাবে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, সারাদিনে হাতে গোণা দু একজন ভোটারের দেখা মিলেছে যেসব আসনে সেখানেও ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে বিস্মিত হবার মতো।
রাজশাহীর ভোটকেন্দ্রগুলোতে দিনভর ভোটারের দেখা মেলেনি। সারাদিনে সামান্য কিছু ভোটার এসেছিলেন ভোট দিতে। কিন্তু ফলাফলে দেখা গেল রাজশাহীর বিভিন্ন আসনে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে।
রাজশাহী-৩ আসনে সবশেষ প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, এ আসনের মহিষকুণ্ডি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৫৮ শতাংশ।
ভোট গণনা শেষে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আয়েন উদ্দিন তার নিজ কেন্দ্র মোহনপুরের মহিষকুণ্ডি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পেয়েছেন ১ হাজার ৯১৮ ভোট। ওই কেন্দ্রে ১১৮ ভোট পেয়ে লাঙ্গল প্রতীকে শাহাবুদ্দিন বাচ্চু দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন। ভোটকেন্দ্রটির ৩ হাজার ৬৬০ ভোটারের ২ হাজার ১৩৫ জন ভোটার তাদের ভোট দিয়েছে। আসনগুলোতে ভোটার উপস্থিতির হার ৫৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শাহরিয়ার আলম তার নিজ কেন্দ্রে ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ৩৪০ ভোট। ওই কেন্দ্রে প্রজাপতি প্রতীকে আওয়ামী লীগের আরেক নেতা রায়হানুল হক পেয়েছেন ১২৮ ভোট। ওই কেন্দ্র্রের বাক্সে পড়ে ১৫২৯টি ভোট। মোট ভোটার সংখ্যা ৩ হাজার ৬১ জন। এই আসনের ভোটার উপস্থিতির হার ৪৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনের নির্বাচনে  করিমগঞ্জ ও তাড়াইলের বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে বেলা ১টা পর্যন্ত শতকরা আট থেকে ১০ ভাগ ভোট পড়েছে।
করিমগঞ্জের জাফরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়, কিরাটন উচ্চবিদ্যালয়, সাকুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ন্যামতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাটিয়া উচ্চবিদ্যালয়, তাড়াইলের ঘোষপাড়া উচ্চবিদ্যালয়সহ অন্তত ২৫টি কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে বেলা ১টা পর্যন্ত ওই সব কেন্দ্রে ১০ শতাংশ ভোট পড়েছে।
কিন্তু জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর নিজ বাড়ির কেন্দ্রে বেলা ১টার মধ্যে ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে। বেলা ১টায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তাড়াইল উপজেলার কাজলা গ্রামে মুজিবুল হক চুন্নুর বাড়িতে ঢোকার বাঁ পাশে রয়েছে কাজলা আলিম মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্র আর ডানপাশে রয়েছে কাজলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র। বাড়ির ১০০ গজের মধ্যে এ দুটি ভোটকেন্দ্র কাজলা আলিম মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে ভোট রয়েছে দুই হাজার ১১৯।বেলা ১টার মধ্যে ভোট পড়েছে এক হাজার ৮০০টি।
অপরদিকে কাজলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্রে ভোট আছে তিন হাজার ৫৫৯।বেলা ১টা ১০ মিনিটে দুই হাজার ৩০০ ভোটার তাঁদের ভোট দিয়ে দিয়েছেন।এ ঘটনা সারা এলাকায় চাঞ্চল্য ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভোট শুরু হয়েছে সকাল আটটায়।মাত্র পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে বিপুলসংখ্যক ভোট পড়ার ঘটনাটি মানতে পারছেন না এলাকার সচেতন ভোটাররা।কারণ, কাজলা আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে দেখা গেছে প্রতি ছয় সেকেন্ডে একটি করে ভোট পড়েছে।কাজলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি আট সেকেন্ডে একটি করে ভোট পড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাজলা আলিম মাদ্রাসার প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস গণমাধ্যমকে জানান, সকালে ভোটাররা এসে লাইন দাঁড়িয়ে ভোট দিয়ে চলে গেছেন। এত কম সময়ে বিপুলসংখ্যক ভোট পড়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভোটাররা ভোট দিয়ে চলে গেছেন।এতে আমার করার কী আছে?’
কাজলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এস এম কামাল উদ্দিন বলেন, সকালে এসে দুপুরের আগেই ভোটাররা ভোট দিয়ে ফেলেছেন।তাই একটার আগেই সিংহভাগ ভোট প্রদান সম্পন্ন হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হরিণ মার্কার মিজানুল হক বলেন, ‘৮৬-এর মতো এবার ভোট ডাকাতি হয়েছে। আমার পোলিং এজেন্ট মৃত্যুভয়ে কেন্দ্রে যায়নি।’ শুধু তাঁর কেন্দ্রে নয়, করিমগঞ্জের ৭৮টি এবং তাড়াইলের ৪২টি কেন্দ্রে মুজিবুল হকের লোকজন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা-কর্মীদের নিয়ে ভোট ডাকাতি করেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুজিবুল হক অবশ্য গণমাধ্যমকে বলেন, আমার বাড়ির কেন্দ্রে প্রতি নির্বাচনে ভোটাররা উত্সাহ নিয়ে সকালবেলায় ভোট দিয়ে কাজে চলে যায়।এবারের নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।বিগত ৯১ ও ৯৬-এ আমি পরাজিত হলেও এ দুটি কেন্দ্রে ৮০ ভাগ ভোট আমিই পেয়েছি।’
সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে শেষ হওয়া এই দশম সংসদের ১৪৭টি আসনের নির্বাচনে দিনভর সহিংসতায় সবশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নিহত হয়েছেন অন্তত ২১ জন।
এছাড়া সারা দেশে তিন শতাধিক কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছে। ভোট বর্জন করেছেন অন্তত ২৬জন প্রার্থী। নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্রে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও নির্বাচনী সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। অনেক কেন্দ্রে ভোটাররা ভোট দিতে যাননি। কোন কোন কেন্দ্রে ভোট পড়েছে একেবারেই নগন্য। আবার ভোটার ছিল না এমন কেন্দ্রেও অস্বাভাবিক ভোট পড়ার খবর পাওয়া গেছে। কোন কোন কেন্দ্রে ভোটের হার ১০ভাগেরও কম বলে জানা গেছে।
সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের বেলকুচি থানার কল্যাণপুর রওশনিয়া দাখিল মাদ্রাসা ৩৫১৮ভোটের মধ্যে বেলা দেড়টা পর্যন্ত কোন ভোট পড়েনি। জানিয়েছেন প্রিসাইডিং অফিসার ফরিদ আহমেদ। কল্যাণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে ভোটার ২৩৩৮। দেড়টা পর্যন্ত কোন ভোট পড়েনি বলে জানিয়েছেন, প্রিসাইডিং অফিসার আবুল কালাম আজাদ।
চট্টগ্রাম: সময় দুপুর ২টা। সকাল থেকে খোশগল্পে, কিছুটা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় কাটছে কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের। এমতাবস্থায় খা খা করা ব্যালট বাক্সে পড়েছে সাকুল্যে দুটি ভোট। এ চিত্র চট্টগ্রাম-১৫ সাতকানিয়া লোহাগড়া আসনের একটি কেন্দ্রের। সাতকানিয়া-বাশখালী সীমান্তের সর্বপশ্চিমের এ  কেন্দ্রটির নাম  চূড়ামনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া একই আসনের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে নির্বাচন শুরু চার পাঁচ ঘণ্টা  পর্যন্ত ১০/১২ ভোট করে পড়েছে।
সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলায় নিখোঁজ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর গ্রামের বাড়ির কেন্দ্রে  দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কোনো ভোটার ভোট দিতে যাননি ।
প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও পুড়িয়ে দেয়া ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকলেও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরের তিনটি আসনে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসনে(পীরগঞ্জ)উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) আওয়ামী লীগের যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ভোট কেন্দ্র দখল করে নিজেরাই সিল মারে। ফলে বেলা ১টার ৩ শতাংশ ভোট কাস্টিং বিকেল ৪টায় হয়ে যায় ৭০ ভাগের ওপরে।
প্রকাশিত খবরে আরো জানা যায়, অন্তত ৩৪টি কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসনে ৮৯টি ভোটকেন্দ্রের ২৭টিতে কোনো ভোট পড়েনি। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে বিষয়টি জানা যায়। এদিকে বার্তা সংস্থা ইউএনবির খবরে বলা হয়, সাতক্ষীরা-২ আসনে দুটি, সিলেট-২ আসনে দুটি, ফেনী-২ আসনে দুটি ও রাজশাহী-৬ আসনের একটি কেন্দ্র্রে কোনো ভোট পড়েনি। সদর উপজেলার বড়বাড়ী ইউনিয়নের সাতটি, পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের ছয়টি, কুলাঘাট ইউনিয়নের ছয়টি, মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের ছয়টি এবং হারাটি ইউনিয়নের দুটি কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কোনো ভোট পড়েনি।
দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন হাজারো অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন অন্তত ২৬জন প্রার্থী। অন্তত ১৩৯টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।
ঢাকার বিভিন্ন আসন ঘুরে ভোটার উপস্থিতির দৈন্যদশাই চোখে পড়েছে দিনভর। গণমাধ্যমে খবরও এসেছে বিস্তর।  
ঢাকা-৪ আসনে সকালের দিকে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। বেলা ১১টার পর ভোটার সংখ্যা কিছুটা বাড়ে। এরপরও এই আসনের সবচেয়ে বেশি ভোটার যেই দুটি কেন্দ্রে সেই  শ্যামপুর মডেল স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রে মোট ১০ হাজার ভোটারের মধ্যে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাত্র ৪০০ জন ভোট দিয়েছেন।
ঢাকা-৫ আসনে (ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, কদমতলী) দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে  দুটি কেন্দ্রে সকাল ১০টা পর্যন্ত ৬৩টি ভোট পড়েছে। এই দুটি কেন্দ্রে মোট ভোটার চার হাজার ৪৯৮ জন। এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ১০ হাজার ৩৬২। মোট ভোটকেন্দ্র ১৪৫টি।
ঢাকা-৬ আসনে সকাল থেকেই দেখা গেছে ভোটার উপস্থিতির দৈন্যদশা। কবি নজরুল সরকারি কলেজে প্রথম ভোটটি পড়ে আটটা ৫৫ মিনিটে। নয়টা ১০ মিনিট পর্যন্ত এই কেন্দ্রে মাত্র চারজন ভোট দিয়েছেন।  একই আসনের নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট তিনটি কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্র-১-এর মোট ভোটার সংখ্যা দুই হাজার ৫২ জন। সকাল সাড়ে ১০ পর্যন্ত এ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে মাত্র ২৯টি।
ঢাকা-১৫ আসনে (মিরপুর-কাফরুল) কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, কিছুসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে এসেছেন। কাফরুলের হাজী আশরাফ আলী হাইস্কুলে মোট সাতটি কেন্দ্র। সকাল আটটা ৪০ মিনিটে ৭৩ নম্বর কেন্দ্রে গিয়ে একজন ভোটারও দেখা যায়নি। একই স্কুলের ৭৪ নম্বর কেন্দ্রে পৌনে নয়টায় একজন ভোটারও দেখা যায়নি। তবে নয়টার দিকে ৬৯ নম্বর কেন্দ্রে কয়েকজন ভোটার এসেছেন বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসার। সকাল সোয়া আটটায় মধ্য পীরেরবাগের ফুলকি নার্সারি স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, পুরো চত্বর ফাঁকা। সেখানে মাত্র একটি ভোট পড়ে।
বেলা ১০টা ৫০ মিনিটে মিরপুরের মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের একটি কেন্দ্রে (৪৭ নম্বর কেন্দ্র) গিয়ে দেখা যায়, ভোটার উপস্থিতি একেবারেই হাতেগোনা। কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জানান, তাঁর কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা তিন হাজার ১৯। ওই কেন্দ্রের পাঁচটি বুথে ভোট নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ৫ নম্বর বুথে মাত্র একটি ভোট পড়েছে। বাকি চারটিতেও দু-একটি করে ভোট পড়েছে।
এর আগে সকাল ১০টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও প্রায় একই চিত্র। ওই বিদ্যালয়ে ৮৮ নম্বর কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে মোট ভোটার সংখ্যা দুই হাজার ৫৮৯ জন। তবে তখন পর্যন্ত সেখানে মাত্র ২৫টি ভোট পড়েছে। একই চিত্র কাফরুলের মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শাখা-৩-এ।
ঢাকা-১৭ আসনের বনানী মডেল স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, ওই কেন্দ্রের মাঠে শিশুসহ অনেক নারীরা বসে আছেন। তবে তাঁরা কেউই ভোটার না। তাঁরা সবাই বনানীর কড়াইল বস্তির বাসিন্দা। স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজন তাঁদের ভোট দিতে নিয়ে এসেছেন বলে জানা গেছে। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার রফিকুল ইসলাম জানান, ‘এঁদের ভোটার হিসেবে নেওয়ার জন্য আমাদের চাপ দেওয়া হচ্ছে। তবে তাঁদের ভোটার আইডি কার্ডের সঙ্গে ভোটের তালিকা মিলছে না।’
এই আসনের ৪৯ নম্বর কেন্দ্রে তিন নম্বর কক্ষে কর্তব্যরত পোলিং অফিসাররা জানান, বেলা ১১টা পর্যন্ত একটি বুথে মাত্র একটি ভোট পড়েছে। সব বুথেই ২-৩টি করে ভোট পড়েছে।
মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্রে মোট ভোটার দুই হাজার ৭০২।  বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে মোট নয়টি। পাঁচটি বুথের মধ্যে দু-তিনটি বুথে কোনো ভোটই পড়েনি। প্রিসাইডিং অফিসার জানান, যাঁরা আসছেন, তাঁদের সঙ্গে ভোটের তালিকা মিলছে না।
ঢাকা-১৮ আসনের কুর্মিটোলা হাই স্কুল এন্ড কলেজের ৫টি কেন্দ্রে হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করে। এর মেধ্য ৬০ নম্বর কেন্দ্রে দুপুর ২টা পর্যন্ত ছয় ঘন্টায় মাত্র ৫টি ভোট কাস্ট হয়েছে। একই স্কুলের অপর কেন্দ্রে (৫৯ নম্বর) ভোট দিয়েছে ৩০জন। ওই দুই কেন্দ্রের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার জাল ভোটের বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। ভোট গ্রহণের শেষের দিকে বিকাল পৌনে ৩টায় কেন্দ্রের সামনে লম্বা লাইন দেয় ছাত্রলীগের এক দল নেতাকর্মী।
এদিকে ওই স্কুলের অপর তিনটি কেন্দ্র চলছে স্থানীয় মহিলা লীগের নেত্রীদের কথায়। প্রিজাইডিং অফিসার সেখানে অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে ওই তিনটি কেন্দ্রে মহিলা ভোটারদের বুথে ভোটার উপস্থিতির হার খুবই কম। সেখানে এক নামের মহিলা অন্য নামের ভোটারের ভোট দিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে উপস্থিত মহিলা লীগের নেত্রীদের হুমকীর মুখে এ বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছেন না প্রিজাইডিং অফিসাররা।
সব মিলিয়ে পর্যবেক্ষনে দেখা যায় মোট ভোট গ্রহনের সময় সীমা সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা-এর মধ্য প্রথম অর্ধেক সময় অর্থাৎ দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকার আসনগুলোতে ভোট পড়েছে মাত্র ১০ শতাংশের মতো। বাকি অর্ধেক সময়ের ভোটার উপস্থিতির হার কত দেখানো হয় শেষ পর্যন্ত সেদিকেই উৎসুক নজর সবার।
বিরোধী জোটের নেতাদের দাবি এই নির্বাচনে ১০ শতাংশ ভোটও পড়েনি। এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিভাবে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে পরিমান ভোট পড়েছে তার থেকে কয়েকগুন বেশি করে ফলাফল ঘোষণায় ভোটার উপস্তিতি দেখানো হচ্ছে। জাতীয় পার্টির কাজী জাফরসহ বিরোধী অনেক নেতাদেরই একই অভিযোগ। ৯০ শতাংশ মানুষই এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে বলে দাবি জামায়াতের।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসা মাত্র দুটি ভারত ও ভূটানের ৪ পর্যবেক্ষকের মধ্যে অন্যতম একজন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা আশুতোষ জিন্দাল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এসে রোববার দুপুরে রাজধানীর আজিমপুর গালর্স হাই স্কুল ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে বলেছেন, “নির্বাচনে মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ নেই।”
এদিকে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গড়ে ১০ ভাগ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন। রোববার কমিশনের পরিচালক অ্যাডভোকেট এ কে আজাদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটার ছিলো খুবই স্বল্প সংখ্যক। বেশির ভাগ ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিলো শতকরা শূণ্য ভাগ থেকে ১০ ভাগ পর্যন্ত।
যাই হোক, ঢাকার আসনগুলোতে শেষ পর্যন্ত মোট ভোটার কত শতাংশ দেখানো হয় এবং শেষ চার ঘণ্টায় তাতে ভোট গ্রহণের গড় কেমন হয় এমন হিসেব নিকেশের ভেতর দিয়েই হয়তো বেরিয়ে আসবে এই নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ এবং দেশ-বিদেশে কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পাবে।