ব্যাপক ভোট জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের মধ্য দিয়ে পঞ্চম দফায় ৭৩ টি উপজেলার নির্বাচন সম্পন্ন  হয়েছে। উপজেলাগুলোর মধ্যে ৪০টি উপজেলায় ভোটের আগের রাতেই ব্যালটে সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ভরে রাখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীরা। আর ব্যালট বাক্সে রাখতে অসম্মতি জানালে প্রাণনাশের  হুমকি দেয়া হয়  নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী প্রিসাইডিং অফিসারসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাকে।  
এক রকম বাধ্য হয়েই সিল মারা ব্যালটগুলো বাক্সে রাখতে বাধ্য হন প্রিসাইডিং অফিসারসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা। এমনকি তাদের দিয়ে (প্রিসাইডিং অফিসারসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা) ব্যালটে সিল মারতেও বাধ্য করা হয়। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে মাঠ পর্যায় (বিভিন্ন উপজেলার নির্বাচন কর্মকর্তরা) থেকে পাঠানো রিপোর্ট থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ইসি সূত্র জানায়,গত ৩১ মার্চ (সোমবার) পঞ্চম দফা উপজেলা নির্বাচনে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় ভোট শুরুর আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখা হয়। ভোট শুরু হলে ভোটাররা  ভোট  কেন্দ্রে  গেলে তাদের ভোট  দেয়া হয়ে গেছে,আপনাদের ভোট দিতে হবেনা। যে যার  বাড়ি চলে যান বলে আওয়ামী লীগ কর্মীরা ভোট কেন্দ্র থেকে সবাইকে তাড়িয়ে দেয়। ভোট কে দিয়েছে? এমন তথ্য কেউ জানতে চাইলে তাদের হুমকি দিয়ে ভোট কেন্দ্র থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হয়।
এরকম তালা বি. দে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র,হরিশ্চন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র,গঙ্গারামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র,শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কলেজসহ এ উপজেলার ১০০টি কেন্দ্রের বেশির ভাগে একই ঘটনা ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে পঞ্চম দফা নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হাজিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার মো. ইস্রাফিলকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকরা আনারস প্রতীকে প্রকাশ্যেই সিল মারেন। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মটবী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর কর্মীরা হাত-পা ভেঙ্গে দেয়ার হুমকি দিয়ে সিল মারতে বাধ্য করেন সহকারি প্রিসাইডিং অফিাসারকে।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ত্রিমোহনী বুরুজঢালী ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর পোলিং এজেন্ট নিজেই ব্যালটে সিল মারেন। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান গৌরাঙ্গপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সিল মারতে বাধ্য করা হয় পোলিং অফিসারকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে সিল মারে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর কর্মীরা। ভোট শুরুর আগের রাতেই ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্র  দখল করে ছিল মারে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা কর্মীরা। এছাড়া  দক্ষিণ সতর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার আইয়ুব আলীকে হুমকি   দিয়ে আওয়ামী সমর্থিত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর পক্ষে শতাধিক ব্যালটে সিল মারতে বাধ্য করা হয়।  
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় চান্দিনা পাইলট হাই স্কুল কেন্দ্রে পুরুষ ও মহিলা ভোটাররা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও ভোট দিতে পারেননি।  ভোট কেন্দ্রে  পোলিং অফিসাররা আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে  ব্যালটে সিল মারেন।
এদিকে  টাঙ্গাইলের ৪টি উপজেলা সন্ধানপুর,ধলাপাড়া,বসুলপুর ও দেওপাড়া ইউনিয়নের ১৩৫টি কেন্দ্র রাতেই দখল করে সব ব্যালট পেপারে নিজেদের পছন্দমতো সিল মেরেছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর নেতা-কর্মীরা। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার রাহেলা খাতুন বালিকা বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে বিএনপি এজেন্টদের  ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রের ভেতর ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে নির্বিঘ্নে সিল মারে আওয়ামীলীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর কর্মীরা। আলমডাঙ্গায় কিছু ভোটকেন্দ্রে গভীর রাতে ব্যালট পেপারে সিল মারার হয়েছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগের বহিরাগত নেতারা বিভিন্ন কেন্দ্র দখল করে নেন। এরপর সিল মেরে সব ভোট নিয়ে নেন। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামসহ কয়েকটি উপজেলার ১৪৩ কেন্দ্রে  বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে জাল ভোট দেয়া শুরু করে।  
এদিকে  বরগুনার আমতলী উপজেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র রাতেই দখল করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা কর্মীরা। ব্যালটে ছিল ব্যালট বক্স ভর্তি করে রাখে। গাজীপুরের কালীগঞ্জে ভোট শুরুর পরপরই ৯০টি ভোটকেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরা।
এ বিষয়ে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান এই অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন,'নির্বাচন কমিশন উপজেলা নির্বাচনের শুরুটা ভালো করলেও শেষটায় তা ধরে রাখতে পারেনি। চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপে প্রার্থীরা নির্বাচনী নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। এর ফলে ভোটাররা নির্বাচনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে। বেশ কিছুদিন যাবৎ চলা একটা ব্যবস্থার ওপর ভক্তি উঠে যাবে। একবার যদি সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে যায় তাহলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।'
তিনি আরও বলেন,রাজনৈতিক পরিচয়ে দলীয় প্রতীক নিয়ে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। তাছাড়া দলগুলোকে দায়বদ্ধতার মধ্যে আনা যাবে না।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. (অব.) মো. জাবেদ আলী বলেন,'শুনেছি বেশ কিছু উপজেলা থেকে নির্বাচন কর্মকর্তারা রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। রিপোর্টে কি বলা হয়েছে তা দেখার পর এ বিষয়ে জানানো হবে।'
পঞ্চম দফা নির্বাচনে অনিয়মের ঘটনায় ৬৫ জন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
[b]ঢাকা, ৬ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ[/b]