রেলওয়ের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এটি বাস্তবায়নের মেয়াদ হবে ২০ বছর। এতে চলমানসহ ২৩৫টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপন হবে অন্যতম।
পাশাপাশি পদ্মা ও যমুনা নদীতে দুটি রেল সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে শিগগিরই।
বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পরামর্শে প্রণীত খসড়া মহাপরিকল্পনায় প্রকল্প ছিল ১৩১টি। সেটি বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৮ হাজার কোটি টাকা। তবে চূড়ান্ত করার আগে মহাপরিকল্পনায় বেশকিছু বিলাসবহুল প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৭২টি বড় ধরনের নাশকতার ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা।  
এ ব্যাপারে রেলমন্ত্রী মজিবুল হক বলেন, রেলওয়ের উন্নয়নে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই রেলওয়েতে ব্যাপক উন্নয়ন কাজ শুরু হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট আন্দোলনের নামে রেলের অনেক সম্পদ ধ্বংস করেছে। রেল জাতীয় সম্পদ।
এই সম্পদ রক্ষার্থে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে কেউ রেলওয়ের কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর দেয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাস্টার প্ল্যান অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।  
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মহাপরিকল্পনায় আগামী দুই বছরের জন্য ৬৫টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা সরকারের দুই বছরের উন্নয়ন বরাদ্দের সমান। এক্ষেত্রে ২০১৫ সালের মধ্যে ৯৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার ৩৪টি প্রকল্প বৈদেশিক সাহায্য বা সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নতুন প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইন নির্মাণ, ৮ হাজার কোটি টাকায় বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে আরেকটি রেল সেতু নির্মাণ, ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনা নদীর ওপর বাহাদুরবাদ-ফুলছড়ি রুটে রেল সেতু নির্মাণ, ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম বৈদ্যুতিক রেলপথ চালু করা, ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা-পার্বতীপুর ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ, ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আখাউড়া-সিলেট ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ, ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পদ্মা নদীর ওপর আরেকটি রেল সেতু নির্মাণ করার কথা রয়েছে।
রেল সূত্র জানায়, ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায় টেকসই রেল অবকাঠামো গড়ে তুলতে দাতা সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কিছু বিলাসবহুল প্রকল্পও রাখা হয়েছে। তবে প্রথম অবস্থায় এ প্রকল্পগুলো মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন কমিটির একাধিক সদস্য। নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন সদস্য বলেন, ২০ বছরে দেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতির আকার ও রেল পরিবহন ক্ষমতা বিবেচনা করে মাস্টার প্ল্যানের খসড়া প্রণয়ন করা হয়। বর্তমান সরকার রেল যোগাযোগকে অধিক জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করায় এ খাতে অপ্রয়োজনীয় বা কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া উচিত হবে না। তারা আরও মনে করেন, বিলাসবহুল প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না হলেও রেল যোগাযোগে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। তাই রেল কর্তৃপক্ষের উচিত হবে বিলাসবহুল এসব অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিয়ে নির্ধারিত প্রকল্পগুলোকে বাস্তবে রূপ দেয়া। এতে বিভিন্ন দাতা সংস্থার সাহায্য পাওয়া সহজ হবে।
রেলওয়ের তথ্য মতে, ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনাটি চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় ভাগ করে বাস্তবায়ন করা হবে। এর প্রথম অংশ চলতি ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যে বাস্তবায়নে এক্ষেত্রে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বর্তমান ৪৮টি প্রকল্প ছাড়াও সরকারি অর্থায়নে ৩১টি ও বৈদেশিক অর্থায়নের জন্য ৩৪টি প্রকল্প রাখা হয়েছে।
খসড়া মহাপরিকল্পনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের বেশকিছু প্রকল্প স্থানান্তরের পাশাপাশি নতুন প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত ৪৮টি প্রকল্প রাখা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে সরকারি অর্থায়নে ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ৯ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়।
আর বৈদেশিক অর্থায়নে ২৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয় ১৯ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। রাজধানীর চারপাশে এলিভেটেড সার্কুলার রেলপথ নির্মাণ, জয়দেবপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ, শান্তাহার-বগুড়া-কাউনিয়া রেলপথ ডুয়ালগেজে রূপান্তর, হার্ডিঞ্জ সেতু পুনর্নির্মাণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
তৃতীয় পর্যায়ে ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ৩৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে রেলপথের পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নতুন বেশকিছু প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত চতুর্থ পর্যায়ে ৩৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বিদ্যমান ও নতুন নির্মিত রেলপথগুলোর সংস্কারের পাশাপাশি পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে কোচ, ইঞ্জিন, ওয়াগন কেনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
সূত্র মতে, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ছাড়াও ভারতীয় ঋণ, জাপানি ঋণ মওকুফ সহায়তা তহবিল (জেডিসিএফ), কোরিয়ান ঋণ মওকুফ তহবিল (ইডিসিএফ), বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও অন্যান্য উন্নত দেশের সহায়তা নেয়া হবে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টাও করা হবে। মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় সব জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় চলে আসবে। পাশাপাশি ট্রান্স-এশিয়ান রেলরুটেও বাংলাদেশ যুক্ত হবে।
রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ইতিমধ্যে মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য কিছু প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে সিডিউল বিপর্যয় থেকে শুরু করে অন্যান্য কোনো সমস্যাই থাকবে না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রেলের দুর্নীতি রোধ করতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তার পাশাপাশি যাত্রীসেবা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
[b]
ঢাকা, ২ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজ.কম)//ইএইচ[/b]