রিক্যুইজিশনের নামে বছরের পর বছর ধরে ফাও গাড়ি ব্যবহার করছে পুলিশ। মালিকপক্ষকে ন্যায্য পাওনা মিটিয়ে রিক্যুইজিশন নিয়ে গাড়ি ব্যবহার করার নিয়ম থাকলেও তা মানছে না পুলিশ কর্মকর্তারা।
এক হিসাবে দেখা গেছে, গাড়ি রিক্যুইজিশনের নামে গত ২০ বছরে প্রায় ১ শ’ ৪৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে পুলিশ কর্মকর্তারা। কতিপয় অসাধু রিক্যুইজিশন-কর্মকর্তাদের কারসাজি আর সরকারের অবহেলার কারণে এই পুরো টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে গাড়ীর স্টাফ ও মালিকপক্ষ।
চলতি বছরেও রিক্যুইজিশন বাবদ গাড়ির মালিকপক্ষকে কোনো টাকাই পরিশোধ করেনি পুলিশ। এনিয়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গাড়ি-মালিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশন’র কর্তাব্যক্তিরা।
মালিকরা বলছেন, পুলিশ কোনো টাকা দিচ্ছে না বরং কখনো কখনো রাস্তায় চলতি বাস থামিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে গাড়ি রিক্যুইজিশন করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে অভিযোগ করা হলেও আমলে নিচ্ছে না পুলিশ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ রিক্যুইজিশন বাবদ গাড়ির মালিক ও স্টাফদের পাওনা টাকা সরকারের কাছ থেকে ঠিকই আদায় করছে। সে টাকা গাড়ি মালিক ও স্টাফ সদস্যরা পাচ্ছে না। সে টাকা যাচ্ছে কতিপয় অসাধু রিক্যুইজিশন-কর্মকর্তার পকেটে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ৩শ’ গাড়ি সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য রিক্যুইজিশন করে পুলিশ।
নিয়মানুযায়ী প্রতিটি গাড়ি ব্যবহারের জন্য মালিককে জ্বালানী খরচ বাদে ১ হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ২০ বছর ধরে কোন টাকা দেয় না পুলিশের রিক্যুইজিশন বিভাগ।
হিসাব করে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে ২শ’ গাড়িকে যদি রিক্যুইজিশন করা হয় তবে ১ হাজার টাকা করে দিলে ২ লাখ টাকা পান গাড়ি মালিকরা। সে হিসেবে মাস শেষে এই টাকার পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ৬০ লাখ টাকায়। আর বছর শেষে গিয়ে দাঁড়ায় ৭২ কোটি টাকায়। এভাবেই গত ২০ বছরে ১শ’ ৪৪ কোটি টাকা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছ থেকে পাবে গাড়ির মালিকপক্ষ। কিন্তু সে টাকা পরিশোধ করছে না পুলিশের রিক্যুইজিশন বিভাগ। চলতি বছরেও রিক্যুইজিশন বাবদ গাড়ি মালিকপক্ষকে কোনো টাকা পরিশোধ করেনি পুলিশ।
মালিকপক্ষের অভিযোগ, রিক্যুইজিশনে নেওয়ার জন্য গাড়ির মালিককে কমপক্ষে ৫০০  টাকা এবং ড্রাইভার, সুপারভাইজার ও হেলপারকে ৯৫০ টাকা দেয়ার কথা থাকলেও তা কখনও দেয়া হয়না। অনেকক্ষেত্রে গাড়ির জ্বালানীর খরচও মালিকদের দিতে হয়।
নিয়মানুযায়ী একবার একটি গাড়ি রিক্যুইজিশন করলে সেই গাড়ি ৪৫ দিনের আগে পুনরায় নেয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু প্রতিমাসেই একাধিকবার পুলিশের রিক্যুইজিশনের ফাঁদে পড়তে হয়। তবে ৫শ' থেকে দুই হাজার টাকা দিলে রিক্যুইজিশন থেকে পার পাওয়া যায় বলেও জানা গেছে।
পরিবহন মালিক ও গাড়ির স্টাফ সদস্যদের অভিযোগ, গাড়ি রিক্যুইজিশনে গেলে চালকদের ঠিকমত খোরাকি এবং তাদের বিশ্রামও দেয়া হয়না। রাজারবাগ থেকে কোন পুলিশ কর্মকর্তা ৩টি রিক্যুইজিশন স্লিপ পেলে তা দেখিয়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি গাড়িকে হয়রানি করে।
রিক্যুইজিশনের গাড়ি কেবল সরকারি কাজে ব্যবহারের কথা থাকলেও অনেক কর্মকর্তাই তা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন। এভাবে রিক্যুইজিশনের নামে সার্জেন্ট, টিআইসহ ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা কৌশলে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী মাইক্রোবাস, পিকআপ, লেগুনা, সিএনজি, ম্যাক্সি ও মিনিবাসসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
২০১০ সালের মে মাসে গাড়ি রিক্যুইজিশন সংক্রান্ত আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন 'হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (HRPB) জনস্বার্থে একটি রিট মামলা দায়ের করেন। এতে সরকার ও পুলিশকে জনস্বার্থ ব্যতীত কোনো গাড়ি রিক্যুইজিশন না করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এছাড়া অধ্যাদেশের ১০৩-ক ধারায় (২) উপধারা -১  বলা হয়েছে, কোনেো যানবাহন রিক্যুইজিশন করা হলে মালিককে নির্ধারিত পরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। কিন্তু আদালতের আদেশ ও ডিএমপির অধ্যাদেশের তোয়াক্কা করছে না পুলিশ কর্মকর্তারা।
এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশন(BBTOA)-এর নবনির্বাচিত সভাপতি ও সোহাগ পরিবহনের মালিক মো. ফারুক তালুকদার সোহেল টাইমনিউজবিডি’কে জানান, “পুলিশ গাড়ি রিক্যুইজিশন বাবদ আমাদের কোনো টাকাই পরিশোধ করে না। যে টাকা দেয়ার কথা সে টাকা গত ২০ বছরেও পাইনি।”
তিনি বলেন, টাকা তো দেয়ই না বরং গাড়ির ড্রাইভার, সুপারভাইজার ও হেল্পারদের খোরাকি বাবদ যে টাকা দেয়ার কথা সে টাকাও দেয় না পুলিশ। কখনো কখনো আমাদের নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীদের মাঝপথে নামিয়ে গাড়ি রিক্যুইজিশন করছে পুলিশ।
তিনি জানান, রিক্যুইজিশনের নামে যাতে অযথা হয়রানি না করা হয় সেজন্য মালিকপক্ষ থেকে প্রতিদিন ৮০ টি গাড়ি ব্যবহারের জন্য পুলিশকে দিয়ে রাখা হয়। তারপরও রাস্তা থেকে যাত্রী নামিয়ে গাড়ি নিয়ে যায়। ফলে দুর্ভোগে পড়ে যাত্রীরা।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুধু পুলিশই নয় এখন বিভিন্ন জেলা প্রশাসনও গাড়ি রিক্যুইজিশন করছে। এমন ঘটেছে যে, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কথা বলে সরকার দলীয় লোকজনের প্রভাব খাটিয়ে গাড়ি রিক্যুইজিশন করছে।
“আমরা নাজেহাল, এই যাবে সেই যাবে, আজ পুলিশ, কাল আনসার নয়তো জেলা প্রশাসন, পড়শু সরকারী দল। এভাবেই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গাড়ি রিক্যুইজিশন চলছে” বলেন তিনি।
তিনি জানান, সারাদেশে আমাদের লক্ষ লক্ষ গাড়ি চলে কখন কোন গাড়ি রিক্যুইজিশনের ফাঁদে পড়বে তা আমরা আগাম বলতে পারছি না। ফলে যাত্রীরাও হয়রানির শিকার হচ্ছে আমাদের ব্যবসাও লাটে উঠার দশা।”
ফারুক তালুকদার সোহেল আরও বলেন, “আমরা একাধিকবার আবেদন জানিয়েছি, গাড়ি রিক্যুইজিশন করার ক্ষেত্রে যেন একটা সুনির্দিষ্ট ট্রান্সপারেন্স পলিসি মেইনটেইন করা হয়। আমরা যেন আমাদের ন্যায্য পাওনাটা পাই আর যাত্রীরা যেন অযথা হয়রানির শিকার না হয়। কিন্তু তা তো মানাই হচ্ছে না বরং বাই-রোটেশন অনেক থানা, জেলা পুলিশ প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশের হুমকিতে গাড়ি পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি।”
তবে তিনি বলেন, লক্ষ কন্ঠে সোনার বাংলা’র অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী আমাদের কয়েক হাজার গাড়ি রিক্যুইজিশনে নিয়েছিল। গত ২০ বছরের ইতিহাসে রিক্যুইজিশন বাবদ এই প্রথম আমাদের সব টাকাই পরিশোধ করেছে সেনাবাহিনী।
এব্যাপারে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন 'হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ (HRPB) এর প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরশেদ টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, “পুলিশ-প্রশাসন গাড়ি রিক্যুইজিশন করার ক্ষেত্রে ট্রান্সপারেন্স পলিসি যে মেইনটেইন করছে না এমন অভিযোগ আমরা একাধিকবার পেয়েছি। মালিকপক্ষের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনে আবার জনস্বার্থে মামলা করা হবে।”
এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের(ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, “আমরা জনস্বার্থেই গাড়ি রিক্যুইজিশন করি। রিক্যুইজিশন বাবদ টাকাও পরিশোধ করি। সরকার টাকা দিলে গাড়ি মালিকদের টাকা দিয়ে দেই। তবে সরকার যে পরিমাণ টাকা দেয় তা রিক্যুইজিশন বাবদ পর্যাপ্ত না।”
এব্যাপারে মালিকপক্ষ যে অভিযোগ করেছে সে ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মালিকপক্ষের সব কথাই সঠিক নয়।

ঢাকা, জেইউ// ০৩ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসআর