ঢাকা: রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদকে নিয়ে আগাম কিছু বলা অসম্ভব। তার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হলো দশম সংসদের সদস্য হিসেবে আজ শনিবার তিনি শপথ নিয়েছেন। এরআগে তিনি শপথ নিতে সরকারকে চারটি শর্ত দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এসব শর্ত মানলে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন এবং বিরোধীদলীয় নেতাও হবেন।
তবে জাতীয় পার্টির স্থায়ী কমিটির সদস্য রওশন এরশাদ বলেছিলেন, দলের চেয়ারম্যান এরশাদ তাকে সংসদের বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব নিতে বলেছেন।
বিরোধীদলবিহীন একতরফা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়ার পর তিনি টানা ২৯ দিন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে আটক ছিলেন। এরপর দলটির বিভিন্ন অংশের নেতারা কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ আবার কখনো বর্জনের কথা বলেছেন। জাপার নেতাদের একাংশের অভিযোগ ছিল, নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থাকায় সরকার চিকিৎসার নামে এরশাদকে হাসপাতালে আটকে রেখেছে।
বর্জনের ঘোষণার পরেও ভোটারবিহীন এই বিতর্কিত নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন থেকে তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনের আগে এরশাদ মনোনয়ন প্রত্যাহারের আবেদন করলে ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে নির্বাচন কমিশনার তা গ্রহণ করেনি। জাতীয় পার্টির নির্বাচনে না যাওয়ার ব্যাপারে এরশাদের বিশেষ উপদেষ্টা ববি হাজ্জাজ দলের অবস্থান তুলে ধরতেন। এরশাদ সিএমএইচে আটকের পর র্যািব তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে লন্ডন পাঠিয়ে দেয়। ববি হাজ্জাজ বিশিষ্ট ও আলোচিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের ছেলে।
শপথ নিতে শনিবার দুপুর ১২টার কিছুক্ষণ আগে সংসদ ভবনে যান এরশাদ। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী তার কক্ষেই শপথ পড়ান জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে। এরপর তিনি সংসদ সচিবের কক্ষে শপথনামায় স্বাক্ষর করেন।
এরশাদের দলের নেতারা ইতোপূর্বে জানিয়েছিলেন,যে কোনো সময়ে তাদের চেয়ারম্যান শপথ নিতে পারেন। কারণ ২২ জানুয়ারি মঞ্জুর হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে। আর এরই অংশ হিসেবে এরশাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও শপথ নিয়েছেন বলে জানায় দলীয় সূত্র।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন। তখন চট্টগ্রামে অবস্থিত সেনাবাহিনীর ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার স্টাফ (জিওসি) ছিলেন মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর।
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর আত্মগোপনে যাওয়ার পথে মঞ্জুরকে পুলিশ আটক করে। এরপর ২ জুন মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে পুলিশ হেফাজত থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ঘটনার ১৪ বছর পর ১৯৯৫ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি মঞ্জুরের ভাই আইনজীবী আবুল মনসুর আহমেদ চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন। ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন এরশাদসহ পাঁচজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি।
শপথ নেয়ার সময় স্যুটপরা এরশাদকে স্পিকারের কক্ষে হাস্যোজ্জ্বল দেখা যায়। কক্ষে ঢুকেই তিনি শিরীন শারমিনকে সালাম দেন।
এরশাদের শপথের সময় স্পিকারের কক্ষের আশপাশে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা ছাড়া অন্যদের ঢোকার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি ছিল।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার অনুপস্থিত আওয়ামী লীগের নাজমুল হাসান এবং জাতীয় পার্টির নাসিম ওসমান শপথ নিতে সংসদে উপস্থিত হয়েছেন। তাদের শপথ হবে সংসদের শপথ কক্ষে।
১৯৮৩ সালে নির্বাচিত সরকারকে হাটিয়ে দেশে সামরিক শাসন জারি করেছিলেন এরশাদ। ১৯৮৬ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দিলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট তাতে অংশগ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও অংশ নিয়েছিল সেই নির্বাচনে। যদিও বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সেই একপেশে নির্বাচন প্রত্যাখান করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নয় বছর শাসনের পর নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এই জেনারেল।
৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ২৮৪ জন গত বৃহস্পতিবার শপথ নেন। তবে পাঁচজন সেদিন নেননি,তাদের মধ্যে এরশাদসহ এই তিনজন ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় এরশাদ ছুটি নিয়ে রংপুরে ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে তিনি পাকিস্তানে চলে যান। পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালিরা যখন ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসেন, তখন তিনিও প্রত্যাবর্তন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর সময় আগ্রা ক্যান্টনমেন্টে স্টাফ কোর্সে অংশগ্রহণ করেন।
পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর ১৯৭৩ সালে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুটান্ট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে তিনি কর্নেল ও ১৯৭৫ সালের জুন মাসে সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭৫ সালের ২৪ অগাস্ট ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় তিনি মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান ও ডেপুটি চিফ অফ আর্মি স্টাফ হিসেবে নিয়োগ পান। ১৫ অগাস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর এরশাদ বাংলাদেশের দিল্লি মিশনের মাধ্যমে দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে বার্তা পাঠান।
সংসদ সদস্য হিসাবে শপথ নিতে এরশাদের দেয়া শর্ত চারটি ছিল: এক. এরশাদের বিরুদ্ধে থাকা যেসব মামলা শেষ পর্যায়ে আছে, সেগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করা, দুই. তাঁর নির্দেশ মেনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে যাঁরা সাংসদ হওয়ার সুযোগ হারিয়েছেন, তাঁদেরকে ব্যাংক-বিমা-করপোরেশনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া, তিন. জি এম কাদেরকে উপনির্বাচনে জয়ী করে সংসদে আনা ও চার. জাতীয় পার্টি থেকে কাউকে মন্ত্রী না করা। তিনি এও বলেছেন, তাঁর এ শর্তগুলো মানলে দশম জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হতে তাঁর আপত্তি নেই। অন্যথায়, তিনি যেভাবে আছেন, প্রয়োজনে সেভাবেই থাকবেন।
এরশাদের ছোটভাই কাদের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে নির্বাচিত হননি। যদিও নির্বাচনের আগেই তিনি বলেছেন, এরশাদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেননা এবং তিনিও এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেননা। তবে উত্তরাঞ্চলীয় জেলা লালমনিরহাটের একটি আসনে ব্যালট পেপারে তার নাম ছিল।
শ্রেণীহীন
আনপ্রেডিক্টেবল এরশাদের নতুন নাটক
রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদকে নিয়ে আগাম কিছু বলা অসম্ভব। তার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হলো দশম সংসদের সদস্য হিসেবে আজ শনিবার তিনি শপথ নিয়েছেন। এরআগে তিনি শপথ নিতে সরকারকে চারটি শর্ত দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এসব শর্ত মানলে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন এবং বিরোধীদলীয় নেতাও হবেন।





