সুনামগঞ্জের ছাতক ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ৬ হাওরের ৭টি ফসলরক্ষা বেড়ি বাঁধ নির্মাণের কাজ  নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না হওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে হাওরে উৎপাদিত ফসল গোলায় উঠবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। পাউবোর সংশ্লিষ্টরা ব্যস্ত রয়েছেন কমিশন বাণিজ্যে আর কৃষকরা ভুগছেন ফসল ডুবির আতংকে।
বাঁধের কাজ অসমাপ্ত থাকায় আগাম বন্যায় হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কৃষকরা অভিযোগ তুলেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে ছাতক উপজেলার ৫টি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়নি।
ছাতক উপজেলার সিংচাপইড় ইউনিয়নের সিংচাপইড় উত্তরবন্দের হাওরের বেড়ি বাঁধের কাজ প্রায় অর্ধেক সম্পন্ন হয়েছে। এক্সেভেটর নষ্টের অজুহাতে এ বাঁধের নির্মাণকাজ গত এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে। বেড়ি বাঁধ নির্মাণ কমিটির সভাপতি স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফুর রহমান জানান, ওয়াপদার নিয়োগপ্রাপ্ত দুটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাঁধের কাজ দু’ভাগে চলছে।
একটি প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও ঠিকাদার জুয়েল মিয়ার অংশে থাকা বাঁধের কাজ এক্সেভেটর নষ্টের কারণে বন্ধ রয়েছে।  চরমহল­া ইউনিয়নে দুটি বেড়ি বাঁধের কাজ শতকরা ৬৫ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।
এর মধ্যে কামরাঙ্গি-দাইনাকান্দি বেড়ি বাঁধের কাজ সম্পন্ন হতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে স্থানীয় কৃষকদের ধারণা। অপরটি মাটিয়া-চরদুর্লভের ভাঙা বেড়ি বাঁধের কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমের আগে বেড়ি বাঁধের কাজ সম্পন্ন না হওয়ার আশংকা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
এ দুটি বেড়ি বাঁধের প্রকল্প চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা কদর মিয়া। তিনি গত উপজেলা নির্বাচনের আগে যুক্তরাজ্যে চলে যান। এখনও তিনি যুক্তরাজ্যেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। কামরাঙ্গি-দাইনাকান্দি ৩৭০ মিটার দীর্ঘ বেড়ি বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প সেক্রেটারি মাস্টার আঙ্গুর মিয়া জানান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাঁধের নির্মাণকাজ শেষ না হলেও এরই মধ্যে বাঁধের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে।
অপরদিকে মাটিয়া-চরদুর্লভের ভাঙা বেড়ি বাঁধের কাজ চলতি বোরো মৌসুমের আগে আদৌ শেষ হবে কিনা তা নিয়ে স্থানীয় কৃষকরা শংকিত। নোয়ারাই ইউনিয়নের লক্ষ্মীবাউর এলাকায় মির্জাখালের ওপর নির্মিত বেড়ি বাঁধ ও একই ইউনিয়নের বিশনাই হাওরের বেড়ি বাঁধের কাজ এখনও শেষ করা হয়নি। বাঁধ দুটির প্রকল্প চেয়ারম্যান স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আফজাল আবেদীন আবুল জানান, উপজেলা নির্বাচন ও বোরো ফসলে সেচ সুবিধার জন্য যথা সময়ে বাঁধ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকারি ইস্টিমিটের চেয়ে অনেক বেশি ও টেকসই কাজ করেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
নোয়ারাই ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা উপজেলা কৃষি অধিদফতরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবদুল হামিদ জানান, মির্জাখালের ওপর বেড়ি বাঁধ নির্মাণে প্রতি বছর সরকারের লাখ-লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ এখানে একটি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হলে প্রতি বছর সরকার এ অপচয় থেকে রক্ষা পাবে, পাশাপাশি কৃষকরাও তাদের বোরো ফসল নিয়ে আর শংকিত হবেন না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রদ্যুৎ ভট্টাচার্য্য জানান, বোরো ফসল রক্ষার স্বার্থেই সরকার বেড়ি বাঁধ নির্মাণকাজে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে।
যথা সময়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক হাজার হেক্টর বোরো ফসল হুমকির মুখে পড়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হাওর রক্ষা বাঁধ সম্পন্ন না হওয়ার বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আইনুর আক্তার পান্না জানান, বেড়ি বাঁধে  দায়সারাভাবে কাজ হচ্ছে। অন্যদিকে পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী বরকত উল­াহর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইলফোনে যোগাযোগ করলেও তার বক্তব্য জানা যায়নি।    
অপরদিকে জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের উতারিয়া ও পাচালীর বাঁধের নিন্মমানের কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কৃষকরা। সামান্য বৃষ্টি হলে যে কোনো সময় এই বাঁধ ভেঙে যাবে বলে আশংকা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
প্রতিবছর সরকার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও পিআইসির যোগসাজশে সময়মতো বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু না করে সময় ক্ষেপণ করায় বাঁধ অরক্ষিত থাকছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেলার বোরো ধানের বৃহৎ হাওর হল দেখার হাওর। দেখার হাওরে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, সুনামগঞ্জ সদর , ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার কৃষকদের এক ফসলি বোরো জমির পানি নিষ্কাশনের পথ উতারিয়া খাল ও পাচালী অবস্থিত। মহাসিং নদীর সঙ্গে এই খালগুলো সংযুক্ত। এই খালের ওপর বাঁধ অকালে ভেঙে গেলে ওই ৪ উপজেলার কৃষকদের ৬ মাসের পরিশ্রমের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যাবে।
কিন্তু ওই হাওরের উতারিয়া ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে পিআইসির সভাপতি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদ মিয়া সাব ঠিকাদার নিয়োগ করে বাঁধ নির্মাণ করছেন। সাব ঠিকাদার নিজের স্বার্থ রক্ষা করে দায়সারা গোছের বাঁধ নির্মাণ করছেন।
অপরদিকে পার্শ্ববর্তী পাচালী হাওর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে পিআইসির সভাপতি জয়কলস ইউপি সদস্য পুষ্পা বেগম ওই বাঁধের কাজ নিজেই পরিচালনা করছেন। পাচালী বাঁধে নাম সর্বস্ব কাজ হওয়া ছাড়াও ২৮ ফেব্র“য়ারি এই বাঁধ নির্মাণকাজে সরকারের নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম হওয়ার পরও অসমাপ্ত রয়েছে বাঁধের অধিকাংশ কাজ। ফলে এ বাঁধের অধীনে রোপণকৃত বোরো ফসল গোলায় উঠা নিয়ে শংকিত কৃষকরা।
হাওর পাড়ের কৃষকদের অভিযোগ দেখার যারা তারাই হাওরের বাঁধ নির্মাণের কাজ নিজের ইচ্ছামতো করছেন চেয়ারম্যান-মেম্বাররা। বাঁধের পশ্চিম ও পূর্বপাশে অনেক স্থানে মাটিই দেয়া হয়নি।
উতারিয়া বাঁধের পিআইসিরি সভাপতি মাসুদ মিয়া বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পাচালী ফসল রক্ষা বাঁধের পিআইসির সভাপতি পুষ্পা বেগমও বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ ব্যাপারে পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী সাঈদ আহমদ বলেন, উতারিয়া ও পাচালী হাওর ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে, ছাতকের বাঁধগুলো আমি এখনও পরিদর্শন করিনি তাই ছাতকের বাঁধ বিষয়ে আপাতত কিছু বলতে পারছি না।
[b]ঢাকা, ১৭ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // ইএইচ
[/b]