নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ’ আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্টজনরা বলেছেন, রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় ঐক্যমতে না পৌছার কারণ জাতীয় ঐক্য গড়তে জনগণ সরকারকে বাধ্য করতে পারছে না। এজন্য জনগণকে রাস্তায় নামতে হবে। তারা বলেন, প্রবাসীদেরকে নির্দলীয় অবস্থান থেকে গণতন্ত্রকে পক্ষে ভুমিকা রাখতে হবে। গণতন্ত্র আমাদের অধিকার। এটাকে আমরা রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না।
বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংকট : উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্টজনেরা এসব কথা বলেন।
গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে কবি ফরহাদ মজহার বলেন, রেজোয়ানার স্বামীকে অপহরণের ঘটনা আমাদের চরমভাবে মর্মাহত করেছে। গুম, অপহরণের ঘটনা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রেজোয়ানার স্বামীকে অপহরণের ঘটনার সঙ্গে ভারতের ‘র’ জড়িত থাকতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যারা বর্তমান সরকারকে সমর্থন করছেন না তাদের পরিবারের কেউ নিরাপদ নয়। আওয়ামী লীগ নামের সরকারটি জন্ম থেকেই ফ্যাসিস্ট। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধংস করেছে। হিটলার ও মুসলিনীর ফ্যাসিজম থেকেও ভয়ঙ্কর আওয়ামী লীগের ফ্যাসিজম। এই ফ্যাসিজমকে তাড়াতে হলে দেশে রক্তাক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে হবে।
ফরহাদ মাজহার বলেন, অদ্ভুত এক দেশ যেখানে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দেশ থেকে নাগরিকদের তুলে নিয়ে তাদের দেশে চলে যাচ্ছে। স্বাধীন কোনো দেশে এটা চলতে পারে না। কেউ এখানে নিরাপদ নয়। লুটপাট ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি এই সরকার। এ সরকার বাংলাদেশের সবকিছু লুট করে নিয়ে পরিত্যক্ত আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলে দেবে। তিনি বলেন, এমন অদ্ভুদ দেশ যেখানে ফ্যাসিস্ট সরকারের একশ্রেণীর সন্ত্রাসী লোক সাংবাদিক পরিচয়ে আমাকে গ্রেফতারের জন্য বাসায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেছে।
তিনি বলেন, দেশ বিদেশের কেউ এ সরকারকে গণতান্ত্রিক সরকার বলে মনে করে না। রাশিয়াসহ কিছু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ককে নষ্ট করছে। দলের উর্ধ্বে ওঠে গণতন্ত্রের জন্য কাজ করতে হবে। প্রবাসীদেরকে নির্দলীয় অবস্থান থেকে গণতন্ত্রকে পক্ষে ভুমিকা রাখতে হবে। সমাজের বিভাজনগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। প্রতিটি মানুষের কথা বলার অধিকার রক্ষা করা আমাদের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। গণতন্ত্র আমাদের অধিকার। এটাকে আমরা রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না।
ফরহাদ মজহার বলেন, পৃথিবীর কোথাও নেই বিচার চলাকালীন সময়ে আইন পরিবর্তন করে কাউকে ফাঁসি দেয়া হয়। শুধুমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতির্ষ্ঠিত হয় না। ৭১ এ সেটি হয়নি। সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অনেক সময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণায় ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসহ বর্তমান চার নীতি ছিল না। সেখানে ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। এর বাইরে যা যোগ হয়েছে তা দিল্লির সংযোজন।
মানবাধিকার লঙ্ঘনে সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কিছু মানবাধিকার সংগঠন সরকারের অধীনে কাজ করছে। আর মানবাধিকারের পক্ষে যারা কাজ করে তাদেরকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে।  প্রথমে সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে। কারণ বর্তমান সংবিধান ফ্যাসিস্ট। একজন ব্যক্তির বক্তৃতা সংবিধানের মধ্যে ঢুকে গেছে। এটা কখনো সংবিধান হতে পারে না। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করতে হবে।
গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থাকলেও শেখ মুজিব মেহেরপুরের মুজিবনগরে একদিনের জন্যও যায়নি। এটা নিয়ে নতুন বিতর্ক চলছে। জাতীয় সংসদে দেশ ও জনগণের উন্নয়ন নিয়ে কথা না বলে কে কার বিরুদ্ধে কতটুকু কুৎসা রটনা করতে পারে সেটি চলছে। বিচারকদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জজ সাহেবদের বিবেক নাড়াচাড়া করে না মাহমুদুর রহমান এক বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন। তাকে জামিন দিতে বিব্রতবোধ করলেও বেতন নিতে বিব্রত হন না বিচারকরা। প্রবাসী শ্রমিকদের ঘামে অর্জিত পয়সা দিয়ে সরকার কুইক রেন্টালের নামে কুইক পকেট ভর্তি করছে।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নবনির্বাচিত সভাপতি ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, দেশে বর্তমানে শুধু গণতান্ত্রিক সঙ্কট নয়, রাষ্ট্রীয় সঙ্কট চলছে। বর্তমান সরকার ফ্যাসিবাদের চরম রুপ দেখিয়েছে। মানুষের সমাধানের জন্য নয়, সমস্যা জিইয়ে রাখার জন্য ক্ষমতায় থেকে কাজ করছে সরকার। আদালতের স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়াই করলেও আদালত গণমাধ্যম ও বিশিষ্ট নাগরিকদের হেয় প্রতিপন্ন করছে। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যমতে না পৌছার কারণ জাতীয় ঐক্যের সরকারকে জনগণ বাধ্য করতে পারছে না। এজন্য জনগণকে রাস্তায় নামতে হবে। দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বর্তমানে জেলে। সরকার নিজে অথবা আদালতকে দিয়ে গণমাধ্যম বন্ধ করছে।  
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক ডা. রফিক চৌধুরী বলেন, সারা দেশে আজ গুম, খুন ও অপহরণের রাজনীতি চলছে। বিএনপি নেতা এম ইলিয়াসের মতো পরিবেশবাদী আন্দোলনের নেতা রেজোওয়ানার স্বামীকে অপহরণ করা হয়েছে।
জাস্ট নিউজের সম্পাদক মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, দেশের চরম সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় প্রবাসীরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। সঙ্কট উত্তরণে অবিলম্বে মানুষের ভোটারিধাকার প্রয়োগের নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান বলেন, প্রকাশনার দীর্ঘ ১৬ বছরে ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ’ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জন্মভূমির সঙ্গে তাদের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের শ্বাশত সংস্কৃতি ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার, আইনের শাসন ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরার পাশাপাশি যুক্তরাস্ট্রের মেইন স্ট্রীমের সংবাদ পরিবেশন করে সমানতালে ভুমিকা রেখে চলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত নতুন প্রজন্মের মাঝে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অক্ষুন্ন রাখতে সচেতনতা সৃষ্টি করছে সাপ্তাহিক বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, এখন রাজনীতিতে শুধু অসহিষষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাবই বিরাজ করছে না, রাস্ট্রীয় মৌলিক বিষয় জাতীয়তা, জাতীয় শ্লোগান, স্বাধীনতার ঘোষক, রাষ্ট্রীয় আদর্শ এমনকি স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির কথা বলে জাতিকে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে নিশ্চিত সংঘাতের পরিস্থিতি। ক্রমশঃ এ আশংকা বেড়েই চলছে। সংঘাত পরিস্থিতির প্রশমন অর্থাৎ শান্তির পথে ফেরার আপাতত কোনো আগ্রহ বা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
ডা. ওয়াজেদ এ খান আরও বলেন, জাতীয় জীবনে চলমান এই বিভেদ-বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা পরায়ণতা, অসহিষ্ণুতা দূর করে সহনশীল ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রীয় মৌলিক ইস্যু সমূহে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র জাতীয় রাজনৈতিক সমঝোতাই পারে চলমান সংকট এবং ভবিষ্যত সংঘাত থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় মৌলিক ইস্যুতে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশ গুলোতেও রাজনৈতিক দলের মধ্যে কম-বেশী মতদ্বৈততার নজির রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কতিপয় মৌলিক ইস্যুতে চরম বিরোধিতার কারনে গোটা জাতি আজ বিভক্ত। রাজনৈতিক সংঘাতে লিপ্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে সুনির্দিষ্ট জাতীয় সমঝোতা কাঠামোর আওতায় আসতে হবে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এমন জাতীয় সমঝোতার নজির যুক্তরাস্ট্র, বৃটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ডের মতো উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রয়েছে। এসব দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐক্যই তাদেরকে পৌঁছে দিয়েছে উন্নতির শীর্ষে।
তিনি বলেন, দলীয় এই বিভক্তির মাঝেও বাংলাদেশের সিংহ ভাগ মানুষ শান্তি চায়। আশা করি, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের এই আকাঙ্খার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতায় উপনীত হবে। এটা বাংলাদেশের সিংহভাগ নাগরিকের মতো প্রবাসীদেরও প্রাণের দাবি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাপ্তাহিক বাংলাদেশ-এর সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহ-সভাপতি এম আবদুল্লাহ।
আলোচনায় অংশ নেন গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, ফোবানা নিউইয়র্ক-২০১৪ এর আহ্বায়ক হাসানুজ্জামান হাসান, পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি কামরুল ইসলাম খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক ডা. রফিক চৌধুরী, অনলাইন পত্রিকা জাস্ট নিউজের সম্পাদক মুশফিকুল ফজল আনসারী প্রমুখ।
[b]ঢাকা, এমআর, ১৭ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসআর[/b]