স্থানীয় সরকার খাতের সুশাসন নিশ্চিতকরণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডে সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুষম বন্টনের কোনো বিকল্প নেই।
রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার মিলনায়তনে 'স্থানীয় সরকার খাত: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়' শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে টিআইবি কর্তৃক আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা।
টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে মূল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জারিনা রহমান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান এবং স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ।
গবেষণা প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট আইনের পর্যালোচনাসহ স্থানীয় সরকার খাতের আর্থিক বরাদ্দ, জনবল ব্যবস্থাপনা, কার্যক্রমের তদারকি, নিরীক্ষা, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, প্রতিষ্ঠানসমূহের আন্তঃসম্পর্ক, তথ্যের উন্মুক্ততা, অবকাঠামো, লজিস্টিকস ব্যবহার ও ক্রয় প্রক্রিয়া, উন্নয়নমূলক কার্যক্রম/ প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যায়, সেবামূলক কার্যক্রম এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের বিষয়সমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, 'মানুষের মৌলিক চাহিদা পুরণে আমরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। দুর্নীতির কারণে মৌলিক চাহিদা পুরণের বিষয়টি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারলে ৭৫ ভাগ দুর্নীতি হ্রাস করা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মানুষ জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা পেলে দূর্নীতি করে না দাবি করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো ইউনিয়ন পরিষদ অথবা উপজেলা পরিষদ কিংবা  স্থানীয় সরকার পরিষদের যে কোন পর্যায়ে কোনো ধরণের দুর্নীতি হলে তা যদি কেউ ডকুমন্টেসহ অনিয়মের লিখিত অভিযোগ জমা দেয় তবে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার।
স্থানীয় সরকারের সব উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদে বিদ্যমান সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে আইন সংশোধন, বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি, অযাচিত হস্তক্ষেপ কমানোসহ বিভিন্ন সুপারিশ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, সরকার দুর্নীতি নির্মূলকরণে কতোটা আগ্রহী তা জনগণ জানতে চায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমরা সবাই স্থানীয় সরকার পর্যায়ে দুর্নীতির বিষয়টি বেশি চাউর করছি অথচ সরকারের প্রত্যেক মন্ত্রনালয়ে দুর্নীতি হচ্ছে। স্বয়ং মন্ত্রনালয়ে যদি দুর্নীতি হয় তবে স্থানীয় সরকার প্রশাসনে তো দুর্নীতি হওয়াটা স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, 'জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। তাই এ খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে জনগণের সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।'
ড. তোফায়েল আহমেদ স্থানীয় সরকার খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ত্রাণ ও পুর্নবাসন, সমাজসেবা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কার্যক্রমকেও বিবেচনায় আনার আহ্বান জানান।
অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, 'এডিবিতে উপজেলা ভিত্তিক ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো গেলে স্থানীয় সরকার খাত উন্নয়নে গুনগত মান বজায় রাখা সম্ভব হবে।
অধ্যাপক জারিনা রহমান খান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্থায়ী কমিটিগুলোতে নাগরিকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার খাতের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৮ দফা সুপারিশ উত্থাপন  করা হয়।
উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো হল:- সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ততা বন্ধ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে ক্ষমতা প্রদান করা; প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুষম বণ্টন করা; যেসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি সেসব প্রতিষ্ঠানে দ্রুত নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া; সরকারি বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের শ্রেণির পাশাপাশি জনসংখ্যা, আয়তন এবং প্রয়োজন বিবেচনা করা; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাল কাজের জন্য প্রণোদনা এবং দুর্নীতির জন্য তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ; উন্মুক্ত সভার মাধ্যমে বাজেট প্রকাশ করে তাতে জনমতের প্রতিফলন ঘটানো; ই-প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে চালু করা এবং ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করা; এবং সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও অধিদপ্তরে নাগরিক সনদ প্রদর্শন করা এবং নিয়মিত হালনাগাদ করা।
[b]ঢাকা, জেইউ, ২৫ মে(টাইমনিউজবিডি.কম)//এসআর
[/b]