[b]ঢাকা:[/b] ২০১৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতি আরেকটি নিম্ন প্রবৃদ্ধির বছর পার করল। এ সময় সবচেয়ে সহজতম পূর্বাভাসগুলোও ব্যর্থ হয়েছে। এর পরও সমস্যা কাটিয়ে বেশির ভাগ উন্নত অর্থনীতিই একটি স্থিতিশীল পুনরুদ্ধারের দিকে এগোচ্ছে। সঠিক নীতি নির্ধারণ ও তা প্রয়োগে কাজ করে যাচ্ছে তারা। অন্যদিকে নানা প্রতিকূলতায় পূর্ববর্তী বছরগুলোয় অর্জিত প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে পারেনি উন্নয়নশীল দেশগুলো।
অবশ্য সদ্য শেষ হওয়া বছরের শেষাংশে নানা ইতিবাচক অর্জনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা গেলে নতুন বছরে বিশ্ব অর্থনীতির গতি বাড়বে বলে আশা করা যায়। জাতিসংঘের সমন্বিত হিসাবে দেখা যায়, ২০১৪ সালে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বৈশ্বিক জিডিপির। ২০১৩ সালে তা ২ দশমিক ১ শতাংশের মতো ছিল।
উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ইউরো অঞ্চল শেষ পর্যন্ত প্রলম্বিত মন্দার হাত থেকে রেহাই পেয়েছে। বর্তমান উপাত্ত ও প্রবণতা বিশ্লেষণে এটি বলাই যায়। যুক্তরাষ্ট্রের উপাত্তগুলোয় ক্রম উন্নতি দেখা যাচ্ছে। জাপানের সম্প্রসারণশীল নীতিগুলোর সুফল প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০১১ সালের পর প্রথমবারের মতো উন্নত অর্থনীতিগুলোকে একই সঙ্গে এগুতে দেখা যাচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে একটি ইতিবাচক চক্রে যুক্ত করবে।
প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার নীতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা। অন্যদিকে জাপান প্রণোদনা বাড়াচ্ছে। ইউরোপ বহাল রাখছে। উন্নত দেশগুলো নিজ নিজ মুদ্রা ও আর্থিক নীতি নিজ অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রেখেই প্রণয়ন করবে। আগামী দুই বছর এক্ষেত্রে সতর্কতাও থাকবে তুলনামূলক বেশি। আর্থিক খাত ও অর্থনীতি দুটোই শক্তিশালী করতে তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথেই হাঁটবে-আশা করা যায়।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়সংকোচন আগের চেয়ে শিথিল হবে। আর্থিক সংকটের পরবর্তী বছরগুলোয় সরকারগুলোর মিতব্যয়িতায় প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।
এদিকে দুই বছর ধরে ব্রাজিল, ভারত, চীন কিংবা রাশিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি কমে আসছিল। তবে বছরের শেষ প্রান্তিকে এসে তারা এ ধীরগতির ধারা ঠেকাতে পেরেছে।  কিছু ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি বাড়াও শুরু হয়েছে। অবশ্য ধীরে ধীরে।
উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ধরে রেখেছে আফ্রিকার দেশগুলো। অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ার কারণে নগরায়নের গতি বাড়ছে মহাদেশটিতে। অর্থনৈতিক সুশাসন ও ব্যবস্থাপনাও উন্নত হচ্ছে এসব দেশে।
তবে বিনিময় হার ও পুঁজিপ্রবাহে অস্থিরতা, কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোর দামের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা রয়েই গেছে। তবে অনেক দেশে চলমান কাঠামোগত সংস্কার তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ধরে রেখেছে।
গত বছরের অন্যতম সফলতা ছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) এক যুগের অচলাবস্থা কাটিয়ে বালিতে সদস্যদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদন। ২০০১ সালে প্রস্তাবিত দোহা রাউন্ডের মতো না হলেও বিশ্ববাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধিতে এর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকবে। স্বল্প মেয়াদে বেশি কিছু আশা করা যাচ্ছে না তা থেকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বিশ্বের প্রধান প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রণোদনা ও মুদ্রানীতি। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানুয়ারি থেকে বন্ড ক্রয় কমানো শুরু করছে। আর্থিক বাজারগুলোয় এর প্রভাব খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না এবার। বছরের মাঝামাঝি সময়ই এর প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছে বিনিয়োগকারীরা। তবে প্রণোদনামূলক নীতি থেকে সরে আসার ফলে আর্থিক বাজার ও অর্থনীতিতে এর প্রভাব আগামী দিনগুলোয় পড়বে না, এমনটি নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রণোদনা প্রত্যাহার হলে সুদের হার হঠাৎই বেড়ে যেতে পারে। শেয়ারবাজারে বিক্রয় চাপ বেড়ে নতুন সংকট প্রবৃদ্ধির জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ বিক্রয় চাপ বিদেশী তহবিলগুলোর পক্ষ থেকে এলে চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়তে পারে অনেক দেশের। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর, যেমনটি মে-জুনে দেখা যায়।
দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন বিভিন্ন বহিঃঝুঁকির বিপরীতে তুলনামূলক শক্ত। তবে নিজ দেশের বাস্তবতাও তাদের জন্য উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে না পারা, স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি খাতের ঋণ বেড়ে যাওয়া, বিলাস ব্যয় ও সম্পত্তির মূল্য বেড়ে যাওয়া, ছায়া ব্যাংকিং ও অনাদায়ী ঋণের কারণে আর্থিক খাতের অস্থিরতা বৃদ্ধির মতো অনেক নেতিবাচক বিষয় ধরে রেখেছে। তবে নীতিনির্ধারকরা এসব সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এটি ইতিবাচক।
অন্যদিকে ইউরোপে সরকারি ঋণ, বাজেট ঘাটতি, স্বল্প চাহিদা, উচ্চ বেকারত্ব, ব্যাংকিং খাতের অবশিষ্ট ঝুঁকি-এমন অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। গ্রিস ও স্পেনে গড় বেকারত্ব এখনো ২৭ শতাংশের নিচে নামেনি।
জাপানে ‘আবেনোমিক্স’ কাজ করলেও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সরকারের ঋণ নিয়ন্ত্রণ তাদের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিষয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় করার চ্যালেঞ্জটি তুলনামূলক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে ২০১৪ সালে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বয় একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে এসব ঝুঁকি প্রশমনে।
জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোস্যাল অ্যাফেয়ার্সের গ্লোবাল ইকোনমিক মনিটরিং ইউনিটের প্রধান পিংফ্যান হংয়ের প্রতিবেদন অনুসারে।
[b]টাইমনিউজবিডি/এসএমআর [/b]