আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। আজ থেকে ৪৩ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনে লড়াকু স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের। অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ছিলো পবিত্র জুমাবার। সেদিন সুউচ্চ মিনার থেকে ভেসে আসা মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি, মুক্ত বিহঙ্গের উড়াউড়ি বা ডাকাডাকি, নদীর নিঃশব্দে কিংবা কলকল রবে বয়ে চলা, এমনকি শাশ্বত সূর্যোদয়ের মধ্যেও নিহিত ছিলো অন্যরকম দ্যোতনা। কারণ সেদিন এ দেশের নির্বিশেষে মানুষ স্বাধীনতা লাভের অদম্য বাসনা নিয়ে দখলদার পশ্চিম পাকিস্তানিদের সীমাহীন ও অব্যাহত শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করেছিলেন।
অপারেশন সার্চলাইট নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে জঘন্যতম গণহত্যা শুরু করেছিল সেই নৃশংস নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল এক সর্বাত্মক জনযুদ্ধ। সেদিন আমাদের পুলিশ, ইপিআর, সেনাবাহিনী, আনসার, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক- সবাই মিলে এক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল প্রাণপণ এক যুদ্ধে, যার লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা, মুক্তি। ক্যালেন্ডারের পাতায় অন্য দিনগুলোর মতই একটি সাধারণ দিন হলেও ২৬ মার্চ জাতির মনে এক ভিন্নতর ভঙ্গী ও অনুভূতি শব্দায়মান হয়ে ওঠে। যেন ডাক দিয়ে যায় স্বাধীনতার। জাগিয়ে তোলে আমাদের স্বাধীনচেতা মনটাকে। স্মরণ করিয়ে দেয়া আমাদের লড়াকু দিনগুলির কথা। জানিয়ে যায ‘বাঙালিরা মাথা নোয়াবার জাতি নয়’।
বাঙলা ও বাঙালির স্বাধীনতা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে হলেও এর শেকড় প্রোথিত হয়েছিল আরও আগেই। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল বাঙালির মনের স্বাধীনতার কথা। ওই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করার পরেও বাঙালি জাতির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা। এ অবস্থার মধ্যেই ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। তার এই ঘোষণার পর আপামর জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশের স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, কলকারখানা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অচল হয়ে পড়ে সারাদেশ। ওই বছরের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধুর ওই ঘোষণার পরপরই স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ বাঙালি জাতি চূড়ান্ত সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
এদিকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের প্রক্রিয়া চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর নামে নিরীহ বাঙালি বেসামরিক লোকজনের ওপর গণহত্যা শুরু করে। তাদের এ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সকল সচেতন নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা। সেনা অভিযানের শুরুতেই হানাদার বাহিনী মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। সারাদেশে বেজে ওঠে স্বাধীনতার দামামা। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে ভেসে আসে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
বাঙলার দামাল ছেলেরা দেশকে মুক্ত করতে হাতে তুলে নেয় অস্ত্র। দেশকে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করে দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে নেমে পড়ে বাঙালি জাতি। শুরু হয় স্বাধীনতার যুদ্ধ। গঠন করা হয়, স্বাধীন বাংলার প্রবাসী সরকার। ১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার নিভৃত এক আমবাগানে শপথ নেয় স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী সরকার। এ আমবাগানকে পরে 'মুজিবনগর' নামকরণ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত এ বিপ্লবী সরকারের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় হানাদার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে এই মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। ৯ মাসের গেরিলা যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামের স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক দিন আজ। লড়াকু ও দুর্বিনীত সাহসী জাতি হিসেবে আমাদের কাছে দিনটি অনন্য সাধারণ ও স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য মন্ডিত।
[b]ঢাকা, ২৬ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি[/b]