ঢাকা: ইইউ ও মার্কিন বাজারে পুনরায় বাণিজ্য সুবিধা ফিরে পাওয়ার অন্যতম শর্ত ছিল চলতি মাসের মধ্যে ২০০ পরিদর্শক নিয়োগ।কিন্ত ঘোষণা সত্ত্বেও ২০০ কারখানা পরিদর্শক নিয়োগ দিতে পারেনি সরকার। তবে এখন পর্যন্ত পরিদর্শক নিয়োগ হয়েছে মাত্র ৩৯ জন। অন্যদের নিয়োগ করতে মার্চ পর্যন্ত সময় চেয়েছে সরকার।
এদিকে মার্কিন বাজারে জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে আনতে বেঁধে দেয়া কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চাপ অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেয়া অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করার সময় চলতি বছরের মধ্যে ২০০ পরিদর্শক নিয়োগের সময় বেঁধে দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এতে সমর্থন জানায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের ৩১ ডিসেম্ববরের মধ্যে ২০০ পরিদর্শক নিয়োগের ঘোষণা দেন।
এদিকে পরিদর্শক নিয়োগসহ শ্রম অধিকার ও নিরাপত্তা জোরদারের রূপকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ করেন পাঁচ বিদেশী রাষ্ট্রদূত। গতকাল সোমবার শ্রম, বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সচিব মাহমুদ আহমেদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সচিব মিকাইল শিপার এবং পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক। তারা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, সুইডেনের রাষ্ট্রদূতসহ ইইউ অঞ্চলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, মার্কিন বাজারে জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে আনতে বেঁধে দেয়া কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চাপ অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে অন্যতম ছিল পরিদর্শক নিয়োগ। এখন পর্যন্ত ৩৯ জন নিয়োগ নিয়ে রাষ্ট্রদূতরা সন্তুষ্ট হলেও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সচিবরা সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন। এছাড়া ইইউ বাজারে আগামী বছর পর্যালোচনা হবে জিএসপি সুবিধা। তার আগেই এ অঞ্চলের সঙ্গে হওয়া চুক্তি বাস্তবায়নে জোর দিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত এ অঞ্চলের প্রতিনিধিরা।
পরিদর্শক নিয়োগের বিষয়ে আলোচনাসহ বৈঠকের অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল শ্রম আইন বাস্তবায়ন বিধিমালা চূড়ান্ত করা, ট্রেড ইউনিয়ন ও কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত দুটি হটলাইন চালু করা এবং তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা। বৈঠকে সবগুলো বিষয়ের অগ্রগতি নিয়েই আলোচনা হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রদূতরা ক্রেতারা অন্যান্য দেশের ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণসহ ক্রেতাদের উদ্বিগ্ন মনোভাবের কথাও জানিয়েছেন বৈঠকে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা।
পরিদর্শক নিয়োগে মার্চ পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছে- এমন তথ্য জানিয়ে বাণিজ্য সচিব মাহমুব আহমেদ বলেন, শ্রম অধিকার ও নিরাপত্তা জোড়দারে গৃহীত রূপকল্পের অগ্রগতি নিয়ে রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সচিব মিকাইল শিপার বলেন, পরিদর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে আরো কিছু সময় লাগবে। আমরা সময় চেয়ে নিয়েছি। এছাড়া শ্রম আইন বাস্তবায়ন বিধিমালা চূড়ান্ত হতে সময় লাগছে তা জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রদূতদের তরফ থেকে ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ সরিয়ে নেয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছে। আর হাতে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের চাপও তারা অব্যাহত রেখেছেন।
এদিকে শ্রমঘন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে বাণিজ্য সুবিধা আগামী দিনগুলোয় হুমকির মুখে রয়েছে। তাদের দাবি, ২০১৪ সালের জুনে ইইউতে বাণিজ্য সুবিধা পর্যালোচনা করা হবে। তার আগেই এ অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার পর্যায়ে হওয়া চুক্তি ‘স্টেয়িং এনগেজ্ড এ সাসটেইনেবিলিটি কমপ্যাক্ট উইথ বাংলাদেশ’-এর বাস্তবায়ন চায়।
তবে এ চুক্তির অগ্রগতি যাই হোক না কেন বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শ্রম নিরাপত্তার সঙ্গে মানবাধিকার নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ এক করে বাণিজ্য সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, গতকালের বৈঠক পর্যন্ত এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত রাষ্ট্রদূতরা দেননি। বরং এখন পর্যন্ত হওয়া অগ্রগতি নিয়ে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
প্রসঙ্গত, শ্রম অধিকার ও নিরাপত্তা উন্নয়নে সরকারি পর্যায়ে চুক্তি ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে চুক্তিগুলোর মধ্যে আছে ইউরোপীয় ক্রেতাদের অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘দি অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি’।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পোশাক খাতের দুর্ঘটনার পর থেকেই নিয়মিত আন্তর্জাতিক মহলকে হালনাগাদ তথ্য দিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে অগ্রগতি না থাকলে আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়।’
উল্লেখ্য, তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন এবং রানা প্লাজা ধসের পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা ক্রেতাদের চাপের ভিত্তিতে কারখানা নিরাপত্তা উন্নয়নে ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান শীর্ষক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে কারখানা পরিদর্শন ও এজন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ পরিদর্শক নিয়োগ।





