আজ ভয়াল ২৫ মার্চ। একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর ওপর দানবের মতো হানাদার পাক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেদিন রাতের ঢাকা শহর ছিল নিস্তব্ধ। ট্যাংকের ঘড়ঘড় আওয়াজ আর রিকয়েলেস রাইফেলের গর্জনে সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে রচিত হলো মানব ইতিহাসের এক নৃশংস ও জঘন্য গণহত্যা।
এ বর্বরতা বা বিভত্সতা কোনো বিশেষণই ২৫ মার্চের কালরাতের ইতিহাসকে বর্ণনা করার মতো যথেষ্ট নয়। পাক বাহিনীর ঘৃণিত এ গণহত্যা কেবল তুলনা করা যায় পুরাণে বর্ণিত জুজেস ও মাইগেসের (ইয়াজুজ-মাজুজ) পৈশাচিক তাণ্ডবের সঙ্গে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে নারকীয় এ হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে। এটি চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের টানা নয় মাস; কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি মুক্তিকামী দুর্বীনিত বাঙালি। তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে পাক দানবের বিরুদ্ধে।
সেই রাত থেকে জন্ম নিতে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের; যা ভূমিষ্ঠ হয় নয় মাসের রক্তক্ষরণের মধ্যে দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর।
‘অপরাশেন সার্চ লাইট’ শুরু হয় রাত ১২টার পর জিরো আওয়ারে। ঢাকার সৈন্যদের কমান্ডে ছিলেন রাও
ফরমান আলি। অন্য সব স্থানে কমান্ডে ছিলেন জেনারেল খাদেম। জেনারেল টিক্কা ও তার কর্মকর্তারা ৩১তম কমান্ড সেন্টারের সব কিছু তদারক করা এবং ১৪তম ডিভিশনের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে উপস্থিত ছিলেন। এ অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং স্বশস্ত্র বাহিনীর যারা সামরিক শাসনকালে আওয়ামী লীগকে সমর্থন জুগিয়েছে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।
এছাড়া গণআন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগসহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ জনবসতি ও হিন্দু এলাকাগুলো।
সন্ধ্যার পরপরই সারা শহরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে— ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। মধ্যরাত থেকে পাক সাঁজোয়াযান ঘিরে ফেলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমান রূপসী বাংলা)।
ওই হোটেলেই অবস্থান করছিলেন পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ও বিভিন্ন বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। তাদের সবাইকে বাইরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
এসব সংবাদ পেয়েই আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড বসানো শুরু করেন; কিন্তু পাক বাহিনীর ভারী অস্ত্রের মুখে এ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিমিষেই ভেঙে যায়। ২৫ মার্চ কালরাতে এ প্রতিরোধকারীরা প্রথম শহীদ হন। এরপর পাক হানাদাররা রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়।
অকুতোভয় বাঙালি পুলিশ তখন প্রতিরোধ গড়ে তুললে তাদের ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের গর্জনে সে প্রতিরোধও ভেঙে যায়। শহীদ হন শত শত পুলিশ সদস্য। সেখান থেকে ট্যাংক আর সাঁজোয়াযান নিয়ে পাকবাহিনী রওনা দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে।
পথের দুই পাশে থাকা বস্তুির ঘুমন্ত মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর ফ্লেম থ্রোয়ার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
প্রথমেই তারা টার্গেট করে ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ও জগন্নাথ হল। কারণ এ দুটি হল থেকেই পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের দিকনির্দেশনা আসত। এ দুটি হলসহ আরও কয়েকটি হলে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় পাক সেনারা।
তাদের বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি ছাত্রীদের বেগম রোকেয়া হলও। ওই রাতে নিহত হন তিন শতাধিক ছাত্রছাত্রী। শেষ রাতের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায়ও হানা দেয়া হয়।
খুব সম্ভবত প্রথম আক্রমণ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩ নম্বর নীলক্ষেত আবাসের বাড়িতে। সেখানে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফজলুর রহমনকে তার দুই আত্মীয়সহ হত্যা করা হয়। বেগম ফজলুর রহমান দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
পাক বাহিনী অধ্যাপক আনোয়ার পাশা (বাংলা) ও অধ্যাপক রাশিদুল হাসানের (ইংরেজি) বাড়িতে প্রবেশ করলেও তাদের খুঁজে পায়নি। এ দুই অধ্যাপক ওই রাতে বেঁচে গেলেও মুক্তিযুদ্ধের শেষে তারা আলবদর বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে পারেননি। সেখান থেকে হানাদাররা ফুলার রোডের ১২ নম্বর বাড়িতে হানা দিয়ে ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ মুকতাদিরকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর বিভিন্ন বাসায় হানা দিয়ে পর্যায়ক্রমে একে একে হত্যা করে গোবিন্দচন্দ্র দেব, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষ ভট্টাচার্য ও মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ভাবধারার ১৩ শিক্ষককে।
একই রাতে পাকিস্তানি সেনারা শহীদ মিনার, দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়, ডেইলি পিপল কার্যালয় এবং রমনার কালীমন্দির কামান দাগিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর পাকবাহিনীর একটি ইউনিট যায় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে। পাক বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন তিনি।
২৫ মার্চ যে তাণ্ডবলীলা চালিয়েছিল পাক হানাদার বাহিনী; ২৬ মার্চ থেকে সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠে নয় মাসের তীব্র লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর নতুন সূর্যোদয় হয়।
জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হাজারও মানুষকে।
[b]ঢাকা, ২৫ মার্চ (টাইমনিউজিবিডিডটকম) // ইএইচ[/b]