[b]ঢাকা:[/b] ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের কাছ থেকে এবার রিটার্ন (আয়কর বিবরণী) দাখিলে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পায়নি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পরও করদাতারা রিটার্ন দাখিল করেননি।
মঙ্গলবার ছিল চলতি করবর্ষে রিটার্ন দাখিলের শেষ দিন। এনবিআর বলছে, গত করবর্ষের তুলনায় এবার প্রায় তিন লাখ রিটার্ন কম দাখিল হয়েছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আহরণের বিষয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে এনবিআর।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের কাছ থেকে রাজস্বের একটি বড় অংশ আহরণ হয়। প্রতি বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে রিটার্ন দাখিল। করদাতাদের অনুরোধে প্রতি বছর রিটার্ন দাখিলের সময় বাড়ে। পাশাপাশি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় আয়কর মেলা। এ সময়ই ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের কাছ থেকে সরকারের কোষাগারে মোটা অঙ্কের রাজস্ব জমা হয়। কিন্ত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এজন্য করদাতারা রিটার্ন দাখিল করতে পারেননি। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় বাড়ানো হয়। এর পরও আশানুরূপ সাড়া মেলেনি।
এনবিআরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি করবর্ষে ৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতা আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। এর বিপরীতে সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অথচ গত করবর্ষে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতা রিটার্ন দাখিল করেন। এর বিপরীতে রাজস্ব আহরণ হয় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত করবর্ষের তুলনায় এবার রিটার্ন দাখিল কম হয়েছে প্রায় তিন লাখ। কমেছে রাজস্ব আহরণও।
আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মধ্যে আয়কর বিবরণী দাখিল করতে হয়।এনবিআর আশা করেছিল, চলতি করবর্ষে অন্তত ১২ লাখ আয়কর বিবরণী জমা পড়বে। কিন্তু কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পরও জমা হয় ৮ লাখ ৫০ হাজার রিটার্ন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনলাইনে কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) নিবন্ধন ও পুনর্নিবন্ধন জটিলতার কারণে আয়কর বিবরণী এবার কম জমা পড়ে বলে মনে করেন এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতাই রিটার্ন দাখিল কম হওয়ার মূল কারণ বলে মনে করেন অনেকে। এ বিষয়ে এনবিআরের সদস্য মো. বশির উদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে করদাতাদের কাছ থেকে রাজস্ব আহরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতি বিরাজ করলে করদাতাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের প্রত্যেকটি খাতে টান পড়েছে। কোনোভাবেই রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি বেড়েই চলছে। এনবিআরের প্রথম পাঁচ মাসের রাজস্ব আহরণের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি (২০১৩-১৪) অর্থবছরের প্রথম পাঁচ (জুলাই-নভেম্বর) মাসে রাজস্ব আহরণের চারটি খাত শুল্ক, স্থানীয় পর্যায়ে মূসক (ভ্যাট), আয়কর ও অন্যান্য শুল্ক খাতে নিট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪৬ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা। আদায়ের তুলনায় ঘাটতি রয়েছে ৫ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩৬ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
২০১২-১৩ অর্থবছরও রাজস্ব আদায়ে বড় অঙ্কের ঘাটতিতে পড়ে এনবিআর। বিদায়ী অর্থবছরে এনবিআরের হিসাবে রাজস্ব আহরণ হয় ১ লাখ ৯ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ) দফতর করদাতাদের দেয়া চালানের ভিত্তিতে হিসাব করে দেখেছে, এর পরিমাণ ১ লাখ ৩ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা।
সূত্রমতে, চলতি অর্থবছর ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে  শুল্কে ৩৫ হাজার ৭৯০ কোটি, ভ্যাটে ৫১ হাজার কোটি, আয়করে ৪৮ হাজার ৩০০ কোটি ও অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, হরতালসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতির প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়ে। এর ওপর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। তবে সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি না এলে চলতি অর্থবছরের বাড়তি লক্ষ্য পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
এদিকে চলতি করবর্ষে সব করদাতার জন্য ই-টিআইএন চালু করেছে এনবিআর। নিবন্ধনের সময় গতকাল মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর মেয়াদ আরো তিন মাস বাড়নো হয়েছে।
আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, টিআইএনধারীদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক। এনবিআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন কর অফিস থেকে প্রায় ১৭ লাখ টিআইএন ইস্যু করা হয়েছে। অর্থাৎ দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ। এদের সবার আয়কর বিবরণী জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। আর আয়কর বিবরণী জমা না দিলে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে আয়কর অধ্যাদেশে।
উল্লেখ্য, নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে এককালীন ১ হাজার ও পরবর্তী প্রতিদিনের জন্য বাড়তি ৫০ টাকা হারে জরিমানা করা হবে। তবে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে কেউ সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলের সহকারী কর কমিশনার বরাবর আবেদন করলে নির্ধারিত সময়ের পরও বিবরণী জমা নেয় এনবিআর। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে নেয়ার বিধান আছে।
[b]টাইমনিউজবিডি/এসএমআর[/b]