চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ মৎস্য উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত মিরসরাই উপজেলা। মিরসরাইয়ে উৎপাদিত মৎস্য দিয়ে চট্টগ্রামের মাছের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করা হলেও গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চলটিতে বার্ষিক প্রায় ১৮ হাজার মেট্রিক টন মাছের উৎপাদন কমেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এ উৎপাদন কমেছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। এভাবে উৎপাদন কমতে থাকলে এক সময় বেকার হয়ে পড়বেন এ পেশায় জড়িত হাজার হাজার জেলে, মৎস্যচাষী ও এ ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত লক্ষাধিক মানুষ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলার ৭ টি উপকূলীয় ইউনিয়নের প্রায় ২ হাজার হেক্টর আয়তনের মৎস্য প্রকল্পে বছরে ২০ হাজার ৩শ ৩২ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়, যা দিয়ে জেলার আমিষের মোট চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়।
মিরসরাইয়ে মোট মাছের চাহিদা ৮ হাজার ৮শ ৯ মেট্রিক টন। চাহিদার দ্বিগুণের চেয়েও বেশি মাছ উৎপাদন করে এই এলাকার ৩ হাজার ৬ শ ৮৫ জন জেলে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হয়।
এসব অঞ্চলে রয়েছে ২৯ টি জেলেপাড়া। ৫টি সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ কেন্দ্রে মৎস্যচাষীরা মাছের বিশাল প্রকল্প গড়ে তুললেও বর্তমান বিশ্বের সর্বাপেক্ষা আলোচিত আতঙ্ক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সব হিসাব পাল্টে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
উপজেলার প্রধান মৎস্য উৎপাদন অঞ্চল মুহুরি প্রজেক্ট এলাকা। সাহেরখালী, হাইতকান্দি, চরশরৎ, ইছাখালীসহ অন্যান্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোতে রয়েছে ২৯ টি জেলেপাড়া। চট্টগ্রামের মাছের মোট চাহিদার শতকরা ৮০ ভাগই মেটে মিরসরাইয়ের মুহুরি প্রজেক্ট এলাকায় উৎপাদিত মৎস্য দিয়ে। এ অঞ্চলের প্রায় ৪০ হাজার ৮০ হেক্টর এলাকায় মৎস্য প্রকল্প গড়ে তুলেছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন কয়েক হাজার মৎস্যজীবী। উপজেলার ২৫ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকার মৎস্য আহরণের বেশিরভাগ স্থান বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সংযোজিত।
দিনকে দিন বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি বিভিন্ন খাল ও নদী দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে মৎস্য প্রকল্পগুলোতে। লবণাক্ত পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ক্রমবর্ধমান হারে মাছের উৎপাদনও কমতে শুরু করেছে। ফলে, কেবল চট্টগ্রামের একটি বিশাল মৎস্য প্রকল্প এলাকাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং বেকার হচ্ছেন এ ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত লক্ষাধিক মানুষও।
মিরসরাই উপকূলে বঙ্গোপসাগরের মোহনা উপজেলার সাহেরখালী-হাইতকান্দি পয়েন্টটি ইলিশের অন্যতম অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত। প্রতি মৌসুমে এই পয়েন্টের কাছে সাগরে প্রচুর বড় ইলিশ ধরা পড়তো। কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেলেদের জালে পর্যাপ্ত সংখ্যক ইলিশ ধরা না পড়ায় প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টন ইলিশের উৎপাদন কমেছে বলে জানা যায়। একইভাবে কমেছে চিংড়ি উৎপাদনও। উপকূলে অপরিকল্পিত চিংড়ি পোনা ও মা মাছ নিধনই উৎপাদন হ্রাসের অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে সাগরে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে লোনা পানির আগ্রাসনে মিঠা পানির মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে বিলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন জাতের দেশীয় মাছের প্রজাতি।
অপরদিকে, বছরের পর বছর মুহুরি নদীতে কোনো ড্রেজিং না করায় গত কয়েক বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমে স্লুইচ গেটের উভয় পাশে চর জাগতে শুরু করেছে। এতে করে নদীর নাব্যতা হারানোর পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছের উৎপাদনও শুন্যের কোটায় নেমে এসেছে।
মিরসরাই মৎস্য অফিস সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, উপজেলায় ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উপজেলাতে বার্ষিক মাছের উৎপাদন কমেছে ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এছাড়া সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফিশিং গ্রাউন্ড ও জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। ক্ষতি হচ্ছে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ও খাদ্য চক্রের।
এদিকে, কাপ্তাই লেকের মতো মহামায়া প্রকল্পের ৪০ কিলোমিটার লেক এলাকাকেও মৎস্য ভান্ডারে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হলেও প্রাকৃতিক বিরূপ প্রভাবে এটি বাস্তবায়নেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে আশানুরূপ পানি সংরক্ষণ করতে না পারায় শুষ্ক মৌসুমে স্বাভাবিকভাবে লেকের মৎস্য চারণভূমি সংকুচিত হয়ে আসছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে চট্টগ্রামের ৩য় বৃহত্তম মৎস্য উৎপাদন অঞ্চল হতো এটি।
মিরসরাইয়ের সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, মিরসরাই চাহিদার চেয়েও বেশি পরিমাণে মৎস্য উৎপাদন করে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপজেলার মৎস্য উৎপাদনের চলমান প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হতে পারে। তিনি আরো জানান, সাম্প্রতিক বছরে উপজেলায় প্রায় ৯ হাজার মেট্রিক টন মাছের উৎপাদন কমে গেছে। ভবিষ্যতে এই উৎপাদনের পরিমাণ ১৮ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
[b]ঢাকা, ২ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেআই[/b]
শ্রেণীহীন
লোনা পানির আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ
চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ মৎস্য উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত মিরসরাই উপজেলা। মিরসরাইয়ে উৎপাদিত মৎস্য দিয়ে চট্টগ্রামের মাছের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করা হলেও গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চলটিতে বার্ষিক প্রায় ১৮ হাজার মেট্রিক টন মাছের উৎপাদন কমেছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।





