আজ মঙ্গলবার নিমতলী ট্র্যাজেডির চতুর্থ বর্ষপূর্তি হলো। ২০১০ সালের ৩ জুন লিমতলীতে ভয়াবহ আগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১২৩ জন জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়। এরপর চারটি বছর পার হয়ে গেলেও ওই ঘটনার জন্য দায়ী কাউকে আইনের আওতায় আনতে পারেনি প্রশাসন। কাউকে আটকও করা হয়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট থানায় কোনো মামলা পর্যন্ত হয়নি। নিহতদের স্বজনদের এখন একটাই দাবি, ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং নীমতলী থেকে ক্যামিকেলের গোডাউন ও প্লাস্টিক কারখানা সরিয়ে নেয়া।
২০১০ সালের পর থেকে প্রতিবছর ৩ জুন নিস্তব্ধতা নেমে আসে নিমতলীতে। এদিন সকাল থেকেই নিহতদের স্বজনদের বাসা থেকে ভেসে আসে কান্নার আওয়াজ। মিলাদ মাহফিল, কোরআন তেলাওয়াত আর স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে প্রতিবছর এই দিনটি ভারী হয়ে থাকে নিমতলীর পরিবেশ।
তবে এখনো এই নিমতলীতে অসংখ্য কেমিক্যালের গোডাউন রয়েছে। রয়েছে অনেক পরনো কাগজের দোকান। সরেজমিনে দেখা যায়, দুর্ঘটনাস্থলের একটু সামনেই গলিরে ভেতর পরপর দুটি প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কারখানা রয়েছে। এই এলকায় রয়েছে জুতা তৈরির অসংখ্য ছোট-বড় কারখানা। এসব কারখানায় মজুদ করে রাখা হয় সলিউশনের (আঠা) মতো দাহ্য পদার্থ।
এ বিষয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অ্যানফোর্সমেন্ট) মোহাম্মদ আলমগীর জানান, রাসায়নিক পদার্থ আমদানির অনুমতি দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। আর কারখানা পরিচালনার অনুমতি দেয় সিটি করপোরেশন। কারখানা অপরসারণের জন্য আমাদের কাছে কোনো পরামর্শ কিংবা লিখিত অভিযোগ নেই। তাই আমাদের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
বংশাল থানার ওসি কুদ্দুস ফকির বলেন, ‘পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা অপসারণের দায়িত্ব পুলিশের নয়। এ দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি)।’
ফায়ার সার্ভিসের দেয়া তথ্য মতে, পুরান ঢাকার ৮০ শতাংশ বসতবাড়ির নিচতলায় বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক দাহ্য রাসায়নিক কারখানা ও গোডাউন রয়েছে। এতে ওই এলাকার জনজীবন আগুনের ঝুঁকিতে। প্রায় প্রতিটি বাড়ির নিচে রাসায়নিক দ্রব্যের ছোট-বড় দোকান অথবা প্লাস্টিক কারখানা রয়েছে। গত কয়েক বছরে ওই এলাকায় ছোট-বড় কমপেক্ষ ১৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
সেই নিমতলীর ভয়াবহতার এতটা বছর পার হয়ে গেলেও এখনো কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে বংশাল থানার ওসি কুদ্দুস ফকির জানান, নিমতলীর ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি। তবে পুলিশ একটি জিডি করেছিল। এ ঘটনায় কাউকে আটকও করা হয়নি বলে জানান তিনি।
৪৩নং নবাবকাটরা, নিমতলীর যে কেমিক্যাল গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত সেই ভবন মালিক হাজি গুলজার জানান, এ ঘটনায় তাদের ১৪ সদস্যের পরিবারের ১১ জনই মারা যায়। এর মধ্যে তাদের তিন ভাইয়ের ৬ শিশু সন্তান রয়েছে।
তিনি জানান, যে লোক গোডাউনটি ভাড়া নিয়েছিল তার সাথে দুই বছরের চুক্তি হয়। প্রথম বছরেই এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। ভাড়া নেয়ার সময় বলা হয়েছিল সেখানে প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কাঁচামাল (প্লাস্টিক দানা) রাখা হবে। দুর্ঘটনার পর থেকে সেই লোক এখানে আর আসেননি। তার নামও বলতে পারেননি তিনি। তবে তার সাথে গুলজারের একটি চুক্তিপত্র হয়েছিল এবং দুর্ঘটনার পর সেই চুক্তিপত্রটি তিনি তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে দিয়েছিলেন বলে জানান।
ঘটনার পর কেন তিনি আইনগত পদক্ষেপ নিলেন না এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে।
তবে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন জানান, তার কাছে এরকম কোনো কাগজ দেয়া হয়নি।
এদিকে নিহতদের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আরো একটি অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনরা। তবে এ বিষয়ে নিজের নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানান সবাই। তাদের অভিযোগ, ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের মাথা পিছু এক লাখ টাকা করে দেয়ার কথা বলা হলেও দেয়া হয়েছে পরিবার প্রতি এক লাখ টাকা। যে পরিবারের এক জন মারা গেছে তারাও যেমন এক লাখ টাকা পেয়েছে, তেমনি যে পরিবারের একসঙ্গে ১৭ জন মারা গেছে সেই পরিবারকেও এক লাখ টাকাই দেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘সরকার কখনো মাথাপিছু ক্ষতিপূরণ দেয় না, ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় পরিবার প্রতি।’
এই দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বজন হারানো তিনটি মেয়েকে নিজের তত্ত্বাবধানে বিয়ে দেন। তারা এখন সুখে সংসার করছেন। শুধু বিয়েই নয় তাদের স্বামীদেরকে চাকরির ব্যবস্থাও করে দেন তিনি। ইতিমধ্যে তিনজনই মা হয়েছেন। এরমধ্যে রত্নার এক মেয়ে শ্রদ্ধা, তার বোন রুনার দুই বছর বয়সী এক ছেলে আযান এবং আসমার তিন বছর বয়সী এক ছেলে রমজান। রত্নার স্বামীকে বেসিক ব্যাংকে, রুনার স্বমীকে নৌ-বাহিনীতে এবং তাদের ভাই ফয়সাল আলভীকেও বেসকি ব্যাংকে চাকরি দেয়া হয়।

রুনা জানান, তারা তিন বোন সুখেই আছেন। তিনজনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয় নিয়মিত। প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ততার কারণে তাদের খুব একটা খোঁজ নিতে না পারলেও তাদের উকিল বাবারা নিয়মিত খোঁজ নেন বলে জানান।
রুনার উকিল বাবা সংসদ সদস্য হাজী সেলিম নিয়মিত তার খোঁজ নেন। তিনিও ফোনে নিয়মিত হাজী সেলিমের খোঁজ খবর রাখেন।
রত্নার উকিল বাবা নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ আজিজ ও আসমার উকিল বাবা সাবেক সংসদ সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনও তাদের খোঁজ খবর রাখেন বলে জানান তারা।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের দাবি, নিমতলী থেকে অবিলম্বে সব ধরনের গোডাউন ও কারখানা সরিয়ে ফেলা ও নিহতদের স্বজনদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া।
ঢাকা, ৩জুন (টাইমনিউজবিডি) //জেডআই