চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা, ভোট জালিয়াতির মধ্য দিয়ে পঞ্চম দফা নির্বাচন শেষ হয়েছে।  প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় বিএনপির চেয়ে পিছিয়ে  ছিল আওয়ামী লীগ। আর তাই বেপরোয়া হয়ে ব্যাপক সহিংসতা  ও ভোট কেন্দ্র দখলের উৎসবে মেতে উঠে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম দফায়  বিজয় নিশ্চিত করে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে আওয়ামী লীগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম দফা থেকে পঞ্চম দফা উপজেলা নির্বাচন পর্যন্ত ৪৫৫টি উপজেলায় মধ্যে  ২২২টি উপজেলায় জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী। আর বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা ১৫৬ টি উপজেলায় বিজয়ী হয়ে হয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে । এরপরই রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান। এ দলটির ৩৫ জন প্রার্থী এবার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থীরা জয় পেয়েছে মাত্র ৩ উপজেলায়।
এছাড়া  আওয়ামী লীগের ১৩ জন ও বিএনপির ৭ জন বিদ্রোহী প্রার্থী এ নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তেমন সাফল্য দেখাতে পারেনি। বড় দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী লড়াইয়ে আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস ও ইউপিডিএফ পার্বত্য অঞ্চলে ভালো করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাচনের  প্রথম ও দ্বিতীয় দফা মোটামুটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল, কিন্তু যতই উপজেলা নির্বাচনের দফা বাড়তে (তৃতীয় থেকে -পঞ্চম দফা) থাকে ততই সহিংসতা ও ভোটকেন্দ্র দখলের ঘটনা বৃদ্ধিপায় । আর সহিংসতা ও ভোটকেন্দ্র  দখলের সাথে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রাথীদের বিজয় বাড়তে থাকে।  সর্বশেষ পঞ্চম ধাপের নির্বাচনেও ভোটকেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারার 'উৎসব' ছিল  ।
তবে পঞ্চম দফায় সহিংসতা কম হলেও পাঁচ হাজার ৪৩৪ কেন্দ্রের মধ্যে  ৩ হাজার ৪০০ বেশি কেন্দ্র দখল করে  ব্যালট পেপারে সিল মেরে ক্ষমতাসীনদের প্রার্থীদের বিজয়ী করা হয়েছে। এ কারনে  গত ৩১ মার্চ ৭৩ টি উপজেলার মধ্যে কেন্দ্র দখলের মাধ্যমে ৫৪ জন প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করে আওয়ামী লীগ ।  আর   বিএনপির ১৩, জামায়াতের ৩  এবং   অন্যান্য ৩ জন  প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।  
এর আগে চার ধাপে ৩৮৫ উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ৩৮২টির ফল ঘোষিত হয়েছে। এতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ১৭৮, বিএনপি সমর্থিত ১৪৯ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩২ জন এবং অন্যান্য ২৩ জন বিজয়ী হয়েছেন।
প্রথম ধাপে ৬৫ কেন্দ্র, দ্বিতীয় ধাপে ১০০ কেন্দ্র, তৃতীয় ধাপে ২০০ কেন্দ্র এবং চতুর্থ ধাপে চার শতাধিক কেন্দ্র দখল ও অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এ পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় ১২জন মারা গেছেন।  
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় সহিংসতা, ভোটকেন্দ্র দখলসহ  অনিয়ম  কম হওয়ায়  জনগণ  ভোট দিতে পেরেছে। আর এ কারনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা  আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের চেয়ে বিজয়ী বেশি হয়েছে ।
সর্বশেষ তিন দফায় সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয়েছে।  আর  ক্ষমতাসীন দলের সমর্থিতরা বেশি বিজয়ী  হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, পঞ্চম দফায় সহিংসতা কম হলেও পাঁচ হাজার ৪৩৪ কেন্দ্রের মধ্যে  ৩ হাজার ৪০০ বেশির কেন্দ্র দখল করে  ব্যালট পেপারে সিল মেরে ক্ষমতাসীন প্রার্থীদের বিজয়ী করা হয়েছে।  আর একারণে ৭৩টি উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা  ৫৪  উপজেলায় নির্বাচিত হয়েছে। আর  বিএনপি১৩ ও   অন্যান্যরা ৬টি পেয়েছে।  বিদ্রোহীরাও বিজয়ী হয়েছেন
এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন,  উপজেলা নির্বাচনের প্রথম-দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে হলেও  তৃতীয় দফা থেকে পঞ্চম দফা পর্যন্ত ব্যাপক সহিংসতাসহ ভোট জালিয়াতি হয়েছে। তৃতীয় দফা নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন  এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে শেষ দুই দফায় (চতুর্থ-পঞ্চম) ব্যাপক  কেন্দ্র দখলসহ বিভিন্ন অনিয়ম হতোনা।  
তিনি আরো বলেন, চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপের উপজেলা নির্বাচনের সহিংসতা দেখে মনে হয়েছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্বে কোথাও যেন বাধা রয়েছে। নির্বাচনী আচরণ বিধিমালাগুলো শক্তিশালী হলেও তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি ইসি। এ কারণে শেষ দুই দফায় ব্যাপক জালিয়াতি হয়েছে।    
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মোঃ শাহনেওয়াজ বলেন, পঞ্চম দফায় অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু হয়নি। ধাপে ধাপে নির্বাচন করায় অনিয়মগুলো বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। তবে এ নির্বাচনে খুব বেশি অনিয়ম হয়নি। বাংলাদেশের কখনও কোনো নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু হয়নি। এ নিয়ে আগের কমিশনারদেরও অতৃপ্তি ছিল। বর্তমান কমিশনেরও অতৃপ্তি রয়েছে।  
তিনি আরো বলেন, উপজেলা নির্বাচনে যেভাবে বলা হচ্ছে তত অনিয়ম হয়নি। প্রত্যেক ধাপে পাঁচ থেকে ছয় হাজার কেন্দ ছিল। কিছু কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে।  
তিনি বলেন, আইন পরিবর্তন করার সুপারিশ করবো। কারণ প্রচলিত আইনে বিকাল ৪টার সময় ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর কোনো অভিযোগ পেলেও আমাদের বেশি কিছু করার থাকে না। আমাদের নির্বাচনের পর গেজেট প্রকাশ করার আগ পর্যন্ত ক্ষমতা দেয়া হলে এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে। এতে নির্বাচন কমিশনের শক্তি আরো বাড়বে বলে জানান তিনি।
দেশের ৪৮৭ উপজেলার মধ্যে গত  সোমবার পঞ্চম দফায় ৭৩টিসহ ৪৫৮টির নির্বাচন শেষ হলো। আদালতের নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন কারণে বাকি রইল ২৯টির ভোট। এর মধ্যে চতুর্থ ধাপের তিনটি উপজেলার ফলাফল স্থগিত রয়েছে। আগামী ৩রা মে আরো ২১/২৩ টি উপজেলার নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে ইসি।
২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি তৃতীয় উপজেলা নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা করা হয় ৪৮১টির। এর মধ্যে ফল ঘোষিত হয় ৪৭৫টির। এ ৪৭৫ উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৯৭, বিএনপি ৮২, জামায়াত ২৬ এবং অন্যরা নির্বাচিত হয়েছিল ৭০টি উপজেলায়।
[b]ঢাকা, এএম // ৩ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেআই[/b]