রাজধানীসহ সারাদেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দীর্ঘ হচ্ছে বেওয়ারিশ লাশের মিছিল। শুধু রাজধানী ও আশপাশের এলাকা থেকেই প্রতিমাসে উদ্ধার হচ্ছে গড়ে ১০০ এর বেশি বেওয়ারিশ লাশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৫ মাসে রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া নারী-পুরুষ ও শিশুর ১৫১১ টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এ হিসাবে গড়ে প্রতিদিন ৩টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। তবে শুধু গত দেড় বছরে অন্তত ১১৫টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা সম্ভব হয়নি। এসব লাশের হদিসও মেলাতে পারে নি লাশ দাফনকারী স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম।
গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর মিডিয়া রিসার্স এন্ড ট্রেনিং এর জরিপেও এর বিস্তর প্রমাণ মিলছে। উদ্বেগজনক এ পরিস্থিতিতে মানবাধিকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর দাবি, লাশ সনাক্তে পুলিশের যথাযথ পদক্ষেপ না থাকায় বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বাড়ছে। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে দুর্বৃত্তরা।
মেট্রোপলিটন পুলিশের হিসাব মতে, গত বছর রাজধানীতে উদ্ধার হয়েছে ৭শ’ ৮৬টি বেওয়ারিশ লাশ। এর বাইরে পুলিশের কাছে লাশের পরিচয়, ছবি সক্রান্ত তথ্যাবলীর বিস্তর অভাব যা মেট্রোপলিটন পুলিশের ওয়েবসাইটেও লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে দেখা গেছে, কিছু সংখ্যক বেওয়ারিশ লাশের ছবি স্বলিত তথ্যাবলী দেয়া আছে মাত্র।
অন্যদিকে বেওয়ারিশ লাশ সঠিকভাবে দাফন করা হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারেও পুলিশের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। সে হিসেবে বলা যায়, পুলিশ এ প্রসঙ্গে তদারকির বিষয়টি গুরুত্বসহ দেখছে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নৃশংসভাবে হত্যার পর ঘাতকরা নির্জন স্থানে একের পর এক লাশ ফেলে যায়। হত্যার পর শরীরের বিভিন্ন অংশ খন্ড-বিখন্ড করে কিংবা এসিডে ঝলসে দেয়ায় বেশির ভাগ লাশেরই পরিচয় মিলছে না। তদন্ত করা হয়। কিন্তু তদন্তে পরিচয় না মিললে পুলিশের তেমন কিছু করার থাকে না।
তবে পুলিশ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বেওয়ালিশ লাশ দাফন ও এ সংক্রান্ত দায়ের করা মামলা তদন্তে অল্প বরাদ্দ থাকায় মামলার তদন্তে পুলিশের পক্ষ থেকে খুব বেশি আগ্রহ দেখানো হয় না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের হাসপাতাল, কবরস্থান ও পুলিশের খাতায় বেওয়ারিশ লাশের হিসাবেও গরমিল।
জানা গেছে, বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধারের পর থানায় একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়। ময়না তদন্ত শেষে লাশ দিয়ে দেওয়া হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে। প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্বের সাথে লাশের আনুষ্ঠানিক সকল প্রকার কাজ সম্পন্ন করে আজিমপুর বা জুরাইন কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করতে পাঠায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কবরস্থানে লাশ পাঠানোর পর আদৌ লাশ দাফন করা হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে কেউ তদারকি করে না।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য মতে, ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ৯২, ফেব্রুয়ারিতে ৮৫, মার্চে ৯০, এপ্রিলে ৭২, মে ৩৬৭ (রানা প্লাজার-২৯১ জনসহ) ও জুন মাসে ৮৮টিসহ মোট লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় ৭৯৪টি লাশ।
২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত গত ৯ মাসে ৯১৭ টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। রেকর্ড সংখ্যক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয় ২০১৩ সালের অক্টোবরে ১৩৮ জনকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৩ সালের জুলাইতে ১১৩, আগস্টে ৯৯, সেপ্টেম্বরে ৮৯, অক্টোবরে ১৩৮, নভেম্বরে ১০২, ডিসেম্বরে ৯৫ টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ১০৩টি, ফেব্রুয়ারিতে ৯৯ টি ও সর্বশেষ মার্চের ২০ তারিখ পর্যন্ত ৭৯টি লাশ আজিমপুর ও জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
জানা গেছে, বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া লাশের মধ্যে ট্রেনে কাটা, সড়ক দুর্ঘটনা, হত্যা ও অস্বাভাবিক মৃত্যু হওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি।
বেওয়ারিশ লাশ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধারের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। সেখানে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরির পর এক সপ্তাহ লাশ সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল মর্গে সংরক্ষণ করা হয়। পরে সেখানেও সংশ্লিষ্ট থানায় পরিচয় শনাক্ত না হলে পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষে বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পর নির্জন এলাকায় ফেলে যাওয়া বেশিরভাগ লাশের চেহারা বিকৃত থাকায় লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। রাজধানীর অন্তত ১০টি এলাকায় এ ধরনের লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেশি ঘটছে যা কিলিং জোন বলে ইতোমধ্যে পরিচিতি লাভ করেছে।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহকারী পরিচালক (সার্ভিসেস) মো. আব্দুল হালিম জানান, গত ১৫ মাসে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া সবার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বেশিরভাগ লাশই হস্তান্তর করা হয় গলিত অবস্থায়।
তিনি বলেন, লাশের পরিচয় শনাক্তকরণ, নমুনা ও ছবি সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদের নয় তা পুলিশের। পুলিশ বেওয়ারিশ ঘোষণা করলে আঞ্জুমান সে লাশ দাফন করার দায়িত্ব নেয় মাত্র।
ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বেওয়ারিশ লাশের জন্য খুব বেশি সরকারি বরাদ্দ নেই। কোনো বেওয়ারিশ ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেলে সরকারের বরাদ্দ একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে লাশটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো।
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, বেওয়ারিশ কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করা হলে মামলার তদন্তের জন্য মোট ৩ হাজার টাকা সরকার দিয়ে থাকে। তদন্ত কর্মকর্তাকে দেড় হাজার টাকা মামলার তদন্তের পূর্বে এবং আরও দেড় হাজার টাকা দেয়া হয় মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার পরে।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (গোয়েন্দা) মনিরুল ইসলাম টাইম নিউজবিডি’কে বলেন, লাশ উদ্ধারের পর সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়রি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যা ও ইউডি মামলা হয়। সংরক্ষণ করা হয় লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও। পরে ওইসব আলামত অনুযায়ী তদন্ত করে পুলিশ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। প্রচলিত আইন মোতাবেক ঘটনার তদন্ত হয়।
তদন্তে কারো পরিচয় নিশ্চিত হওয়া না গেলেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের কারণে কোনো ব্যক্তি নিহত হয়েছেন কিনা তাও খতিয়ে দেখা হয় দাবি করে তিনি বলেন, তদন্তে পরিচয় না মিললে পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু করার থাকে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
[b]ঢাকা, জেইউ, ৩০ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি[/b]
শ্রেণীহীন
১৫ মাসে দাফন ১৭১১, বেশিরভাগই হত্যার শিকার
রাজধানীসহ সারাদেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। দীর্ঘ হচ্ছে বেওয়ারিশ লাশের মিছিল। শুধু রাজধানী ও আশপাশের এলাকা থেকেই প্রতিমাসে উদ্ধার হচ্ছে গড়ে ১০০ এর বেশি বেওয়ারিশ লাশ।





