ফের রাজধানীর মিরপুর এলাকার শীর্ষসন্ত্রাসী কিলার গ্রুপের হোতা শাহাদাত ও তার ভাই মহসিনের সন্ত্রাসী অপতৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার বেশিরভাগ চাঁদাবাজি আর খুনের ঘটনায় নেপথ্যের নায়ক হিসেবে সব সময়ই যাদের নাম শোনা যায় তাদের মধ্যে শাহাদাত-মহসিন অন্যতম।
রাজধানীর মিরপুর ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করেছে এ ভ্রাতৃদ্বয়। কিন্তু পুলিশের বক্তব্য শাহাদাত ও মহসিন কেউই দেশে নেই। দেশের বাইরে থেকে কলকাঠি নাড়ছে তারা। মহসিন ভারতে। অপর ভাই শাহাদাত দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। সন্ত্রাসী গ্রুপের সহযোগীদের মাধ্যমে লিস্টেট লোকের কাছে চাঁদা দাবি করছে তারা। দাবিকৃত চাঁদার টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। টাকা না পেলে খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছে।
দেশের বাইরে থেকে কিভাবে বাংলাদেশের রাজধানীতে একটার পর একটা খুনের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে আর চাঁদাবাজি করছে সে সম্পর্কে অনেকটাই নির্বিকার পুলিশ।
পুলিশের উর্ধ্বোতন কর্তৃপক্ষও সন্তোষজনক ব্যবস্থা না নেয়ার কথা অকপটে স্বীকার করতে নারাজ। সর্বশেষ চাঞ্চল্যকর কয়েকটি খুন ও চাঁদাবাজির ঘটনার সাথে শাহাদাত ও মহসিনের নাম উঠে আসলেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে নি পুলিশ।
সন্ত্রাসী ভ্রাতৃদ্বয় দেশের বাইরে এই বলে খুন ও চাঁদাবাজির ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া থেমে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের গ্রেফতারে নেই কোনো ব্যবস্থা। রাজধানীর মিরপুর এলাকায় সর্বশেষ চাঞ্চল্যকর কয়েকটি খুনের ঘটনায় এই সন্ত্রাসী ভ্রাতৃদ্বয়ের নাম উঠে আসে। শাহাদাত আর মহসিনকে শীর্ষসন্ত্রাসী বলে চাউর করেছে যে পুলিশ, সেই পুলিশই কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না।
রাজধানীর আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জাফরুল হক মুক্তার গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর দিন-দুপুরে মিরপুরে নিজের বাসায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নির্মমভাবে খুন হন। জাফরুল আবাসন প্রতিষ্ঠান হোমস টেকের চেয়ারম্যান ছিলেন। বাড়ি মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনের ট-ব্লকে ৫ নম্বর সড়কের ৮৭/৮৮ নম্বরে।
দুপুর আনুমানিক ১২টায় বাসায় এক মোটরসাইকেলে ৩ আরোহী আসে। এরমধ্যে একজন খোলা দরজা দিয়ে বাসার ড্রয়িং রুমে জাফরুল হককে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা হিসেবে পুলিশী তদন্তে উঠে আসে শাহাদাত ও মহসিন ভাতৃদ্বয়ের নাম। কিন্তু তাদের কাউকে এমনকি এদের সহযোগীদেরও গ্রেফতার করতে পারে নি পুলিশ।
অন্যদিকে দাবিকৃত চাঁদার টাকা না দেয়ায় গত বছরের ৬ ডিসেম্বর শুক্রবার রাত আনুমানিক সোয়া ৮টায় মিরপুরে-১১ এ নির্মাণাধীন ভবনের ভিতরেই আবাসন ব্যবসায়ীর ছেলে সুমনকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পল্লবী থানায় ৪ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের পিতা আবু তৈয়ব। সেই হত্যাকাণ্ডেরও মূলহোতা হিসেবে ডিবি পুলিশের তদন্তে উঠে আসে শাহাদাত ও মহসিন ভাতৃদ্বয়ের নাম।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকে শাহাদাত হোসেনের লোক পরিচয়ে হত্যাকারীরা নিহতের ভাই রাজন ও পিতা আবু তৈয়বকে অনবরত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে মামলা তুলে নেয়ার জন্য।
যদি মামলা তুলে না নেয়া হয় তবে তাদেরকেও একই পরিণতি বরণ করতে হবে বলে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এই ভয়ে এখন পরিবারটি ফেরারি জীবন যাপন করছে। নির্দিষ্ট কোনো স্থানে থাকতে পারছেন না তারা।
নিহতের পিতা আবু তৈয়ব পারিবারিকভাবে আবাসন ব্যবসার সাথে জড়িত। মিরপুর-১১ এ প্যারিস রোডে নিজস্ব জমিতে ৯ তলাবিশিষ্ট পাশাপাশি ৩ ফ্লাটের একটি বড় ভবন নির্মাণ করছিলেন তিনি। এরই সূত্র ধরে সন্ত্রাসীরা তাঁর কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। ৫ লাখ টাকা দেয়ার পর বাকি টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় খুন হন ছেলে সুমন।
আরও কয়েক বছর আগে মিরপুর ১১ নাম্বারে এক লবণ ব্যবসায়ী পরিবারের সাথে দ্বন্দ্ব হয় মোক্তার-মহসিন কিলার গ্রুপের। সে দ্বন্দ্বে চাঁন নামে স্থানীয় এক সন্ত্রাসীর মাধ্যমে ওই লবণ ব্যবসায়ী পরিবারের কর্তা ও ছেলেকে হত্যা করেন আন্ডারগ্রাউন্ড কিলার মহসিন। এরপর কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে মোক্তার টিকে গেলেও মহসিন ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
এরপর মিরপুর এলাকায় শাহাদাত ও মহসিনের অনুপস্থিতিতে তাদের নির্দেশে এখন সব আন্ডারগ্রাউন্ড কিলিং মিশন পরিচালনা করছে মোক্তার।
হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় পুলিশী তদন্তে হত্যাকারীর লিস্টে কিলার গ্যাং লিডার হিসেবে শাহাদাত, মহসিন ও মোক্তারের নাম উঠে আসলেও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে পুলিশ।
সর্বশেষ গত সোমবার ভোর ৬টার দিকে অর্ডারের মাল সাপ্লাই করার সময় মিরপুর ১১ নম্বরের ই-ব্লকে ‘মায়ের দোআ’ নামক বেকারির দোকানের ব্যবস্থাপক শিপনকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় শিপনকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বেকারির মালিক সোহেল টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, “সন্ত্রাসী শাহাদাতের ছোট ভাই মহসিনের পরিচয় দিয়ে মুঠোফোনে আমার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদার টাকা না দিলে খুন করবে বলে জানায়। কল আসা নাম্বার ছিল ভারতীয় ডিজিটের। চাঁদার টাকা দিতে না পারায় দোকানে আমাকে খুন করতে আসে সন্ত্রাসীরা। আমাকে না পেয়ে কর্মচারী শিপনকে গুলি করে। এঘটনায় পল্লবী থানার ওসি জিয়াউজ্জামানও স্বীকার করেছেন শাহাদাত-মহসিনের নির্দেশে এখন এসব করছে মোক্তার। কিন্তু আত্মগোপনে থাকায় মোক্তারকে ধরতে পারছে না পুলিশ।
এ ব্যাপারে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে মিরপুর জোন পুলিশের সহকারি কমিশনার (এসি) শাখাওয়াত হোসেন টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, অনেকদিন থেকেই শাদাহাত-মহসিন গ্রুপের নাম চাউর হয়েছে। তাদের গ্রেফতারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তবে দু’জনই দেশের বাইরে অবস্থান করায় গ্রেফতার করা যাচ্ছে না। ইন্টাপোল ও ভারতীয় পুলিশের সহায়তায় গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
[b]ঢাকা, জেইউ, ১৩ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // এসএইচ // এসআর   [/b]