সূর্যাস্তের মাঝেই লুকিয়ে থাকে সূর্যোদয়ের আভাস। এটাই প্রকৃতির অমোঘ নীতি। এই নিয়মটাই যেন বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে বাঙালির ভাগ্যে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে বাঙালি জাতিকে বরণ করতে হয়েছিল বৃটিশ ও পাকিস্তানীদের দীর্ঘ শাসন-শোষণ-নির্যাতনের শৃঙ্খল।
তবে স্বাধীনতার সূর্যাস্তের ২১৪ বছর পর ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল পলাশীর আম্রকানন থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে মেহেরপুরের ভবের পাড়ার বৈদ্রনাথতলার আরেক আম্রকাননে বাংলার লাল সূর্যটি উদিত হয়েছিল। সেদিন এখানেই গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার। পাঠ করা হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র।
দিনটি ছিল শনিবার। সীমান্তবর্তী বৈদ্যনাথতলার গ্রামের আমবাগানের চারদিক রাইফেল হাতে কড়া পাহারায় ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের ভিড় জমেছিল সেদিন। ঐতিহাসিক স্বাধীনতার মুহূর্তটি ধারণ করতে দেশি-বিদেশি ১২৭ জন সাংবাদিকও হাজির হয়েছিলেন।
আপামর জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ১৬ এপ্রিল সকাল থেকে সারারাত ধরে মঞ্চ তৈরি করা হয়। বেস্টনি নির্মাণ করা হয় বাঁশের বাতা দিয়ে। স্থানীয়ভাবে ভাঙা টেবিল-চেয়ার দিয়েই বাকি আয়োজন সম্পন্ন করে। অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রবেশ পথে বাংলায় লেখা ছিল ‘স্বাগতম’।
১৭ এপ্রিল স্থানীয় সময় ১১টা ৫০ মিনিটে একের পর এক মঞ্চে আগমন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনছুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান, খোন্দকার মোস্তাক আহমেদ ও প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানী।
মাত্র ৪৫ মিনিটের ওই শপথ অনুষ্ঠানের সূচনা হয় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে। এরপর গীতা ও বাইবেল পাঠ শেষে হাজারো কণ্ঠে গাওয়া হয় বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত- ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।’
এর পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম উত্তোলন করেন মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। পরে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের চিফ হুইফ অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকায় এর পর তিনি নতুন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রিবর্গ ও সেনাবাহিনী প্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণের পর পরই তেজোদীপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা ও ১২ জন আনসার সদস্য নতুন সরকারের এ মন্ত্রিপরিষদকে রাষ্ট্রীয় কায়দায় গার্ড অব অনার প্রদান করে।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের। তবে এর আগে ২৫ মার্চ পাকিস্তানিদের হাতে শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ায় সেদিন তার অবর্তমানে নতুন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
সরকারের মন্ত্রিসভায় ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে অর্থমন্ত্রী, এএইচএম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও খোন্দকার মোস্তাক আহমেদকে আইন, বিচার ও পররাষ্ট্র দফতরের মন্ত্রী করা হয়। মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে কর্নেল এম এ জি ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ পদে কর্নেল আব্দুর রবের নাম ঘোষণা করা হয়।
এরপর প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দীন আহমেদ উপস্থিত সকলের সামনে ৩০ মিনিটের এক উদ্দীপনাময় ভাষণ দেন। তিনি বলেন, 'আজ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হবে এ বৈদ্যনাথতলা এবং এর নতুন নাম হবে মুজিবনগর।' তিনি বিশ্ববাসীর কাছে নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিদান ও সামরিক সাহায্যের আবেদন জানান।
এই সরকার গঠনের ফলে বিশ্ববাসী স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামরত বাঙালিদের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন। এরও আগে ১০ এপ্রিল এমএনএ ও এমপিদের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়।
পরবর্তীতে এই মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে ও দক্ষ পরিচালনায় মুক্তিপাগল বাঙালি জাতি ৯ মাস মরণপণ লড়াই করে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার লাল সূর্যটি। লাখো শহীদের রক্ত আর হাজারো মা-বোনের ইজ্জত, বীর বাঙালির আত্মত্যাগে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পায় স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র- বাংলাদেশ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই এই আমবাগানকে 'মুজিবনগর' নামকরণ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকেই যথাযোগ্য মার্যাদা ও নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে ১৭ এপ্রিল তথা ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে। দিনটিকে বাংলাদেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিকা হিসেবে এবং জাতির চেতনাবোধ জাগ্রতের দিন হিসেবে পালন করে থাকে।
[b]ঢাকা, ১৭ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি [/b]
শ্রেণীহীন
যেখানে স্বাধীনতার সূর্যোদয়
সূর্যাস্তের মাঝেই লুকিয়ে থাকে সূর্যোদয়ের আভাস। এটাই প্রকৃতির অমোঘ নীতি। এই নিয়মটাই যেন বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে বাঙালির ভাগ্যে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল





