আমরা যখন ‘ওদের’ হত্যার রহস্য উদঘাটনের দায়িত্বপ্রাপ্ত র‌্যাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি তখন তাদের কাছ থেকে তদন্তের অগ্রগতির ব্যাপারে কোনো আশার বানী শুনতে পাই না। তাছাড়া আমরা নিজের থেকে যোগাযোগ না করলে হত্যার ঘটনার তদন্তের ব্যাপারে র‌্যাব কর্মকর্তারা আমাদের কিছুই জানায় না। হত্যার ঘটনার দুই বছর অতিবাহিত হলেও র‌্যাব এখনও পর্যন্ত আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানাতে পারে নি।
রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭-এ দৃক গ্যালারীতে নিজ বাড়িতে খুন হওয়া সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির পরিবারের উদ্যোগে আয়োজিত তিনদিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে কথা হয় নওশের আলম রোমানের সঙ্গে। নওশের আলম নিহত সাংবাদিক মেহেরুন রুনির ভাই। সোমবার তিনি টাইমনিউজের এই প্রতিবেদককে এসব কথা বলেন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392058853.JPG[/img]
নিহত মেহেরুন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান এই প্রতিবেদককে আরও জানান, “পিতা মাতা হারা মেঘ ইন্দিরা রোডের একটি বাসায় নানি নুরুননাহার মীর্জার সঙ্গে গত একবছর যাবত থেকে আসছে।
“ভাগ্নে মেঘ এখন একটু একটু বুঝতে শিখেছে। মাঝে মাঝে মেঘের কিছু প্রশ্রের উত্তর খুঁজে পাই না। এসব প্রশ্নের উত্তর এতোদিন পেয়ে যেতো মেঘ। কিন্তু মেঘের পিতামাতার হত্যাকারীদের সনাক্ত করতে না পারায় আমাকেও নিরুত্তর থাকতে হচ্ছে যা সত্যিই হতাশাব্যঞ্জক, বললেন নওশের আলম।
গত দুই বছর আগে ‘নৃশংস’ভাবে পরিবারের দুই সদস্যকে হত্যা করা হলেও আইনশৃঙ্থলা বাহিনীর সদস্যরা এখন পর্যন্ত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে না পারায় চরম হতাশ তিনি। তার(নওশের আলম) চোখমুখে গভীর হতাশার ছায়া থাকলেও কন্ঠে ছিল দৃঢ়ঢ়তার আভাস।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392058890.JPG[/img]
তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস এখনো হত্যাকারীদের খুঁজে বের করার সময় শেষ হয়ে যায়নি। হত্যা রহস্য উন্মোচনে জড়িত সবাই যদি ‘আরেকটু দায়িত্বশীল’ মন নিয়ে কাজ করতেন তবে এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এজন্য তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ও সরকার প্রধানের সুদৃষ্টি আশা করেন। পাশাপাশি তিনি বোন-দুলাইভাইয়ের হত্যার রহস্য উদঘাটনে দায়িত্বপ্রাপ্ত র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নের(র‌্যাব)কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাদের কিছু জানানো হয়।
গত দুই বছর আগে নিজেদের ভাড়া করা বাড়িতে খুন হন সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি। নওশের আলম রোমান অভিযোগ করে বলেন, দুই বছর পার হতে চললেও হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্বে থাকা র‌্যাব উদ্যোগী হয়ে নিহতের পরিবারকে হত্যা রহস্য উন্মোচনের ব্যাপারে কিছুই জানায়নি।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392058783.jpg[/img]
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। গত দুই বছরে এ হত্যা রহস্যের কোনো কিনারা করতে পারেনি পুলিশ বা র‌্যাব কোনো পক্ষই।
হত্যাকাণ্ডের দিন তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘দোষীদের’ খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলেও খুনিরা আজও রয়ে গেছে আড়ালে।
ঘটনার পরদিনও সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেভাবে হোক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার হোতাকে ধরা হবে। আশা করি, তাদের ধরা পড়তেই হবে।”
হত্যার ঘটনার পর ১৩ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার দাবি করেন, তদন্তে ‘প্রণিধানযোগ্য’ অগ্রগতি হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি দেশবাসীকে ‘ইতিবাচক’ খবর দেয়ারও আশাও দিয়েছিলেন তিনি।
এরপর ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র উপ-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, তাদের সন্দেহের তালিকায় কয়েকটি পেশাদার কিলারের লোক রয়েছে। তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হলেই গ্রেপ্তার তরা হবে খুনিদের।
কিন্তু তদন্ত শুরুর দুই মাসেও তদন্তের আশাব্যঞ্জক কোনো অগ্রগতি দেখাতে না পারায় বিজ্ঞ আদালতে ব্যর্থতা দায় স্বীকার করতে বাধ্য হয় গোয়েন্দা পুলিশ। এরপরেই উচ্চ আদালতের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব কাঁধে নেয় র‌্যাব।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392059052.jpg[/img]
২০১৩ সালের গত অক্টোবরে হত্যাকাণ্ডে ‘জড়িত’ আটজনকে চিহ্নিত করে সাতজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানান তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। গ্রেপ্তারকৃত পাঁচজনই ছিলেন চিকিৎসক নেতা ডা. নারায়ণ চন্দ্র দত্ত নিতাই হত্যা মামলার আসামি। গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে রুনির ‘কথিত’ বন্ধু তানভীর রহমান ছিল।
সেসময় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নিহত সাংবাদিক রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বলেন, তানভীর তাদের পারিবারিক বন্ধু নয়। তানভীরকে আগে কখনও দেখিনি। তার নাম কখনও আপার কাছ থেকে শুনিনি।”
‘চিহ্নিত’ আটককৃতদের মধ্যে বাকি একজন অর্থাৎ সাগর-রুনির বাড়ির পাহারাদার হুমায়ুন ওরফে এনামুলকে গ্রেপ্তার করা হয় হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হওয়ার দুই দিন আগে, ২০১৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392059113.jpg[/img]
র‌্যাব তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার পর সন্দেহভাজন ১৬ জনের ডিএনএন নমুনা পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায় র‌্যাব। সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মেঘের নমুনাও পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়া আলামত হিসেবে জব্দকৃত ছুরি ও পোশাকের নমুনাও পাঠানো হয়। তবে এখনো কিছু প্রতিবেদন তৈরি বাকি রয়েছে  বলে র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে।
এব্যাপারে র‌্যাবের মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান সোমবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান, সাগর-রুনির বিষয়টি বেদনাদায়ক ও স্পর্শকাতর। এখনো বেশি কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না। কেন বলা সম্ভব হচ্ছে না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্রে তিনি জানান, র‌্যাব সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। তবে বিষয়টি যেহেতু এখনও তদন্তাধীন তাই আগাম কিছুই বলা যাচ্ছেনা।
উল্লেখ্য, সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকান্ডের ঘটনার তদন্তে এ পর্যন্ত ১২৭ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে র‌্যাব জানিয়েছে।
[b]ঢাকা, জেইউ, ১১ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // কে বি [/b]