মহাসড়কে যত্রতত্র বসানো ঝুঁকিপূর্ণ স্পিডব্রেকার (গতিরোধক) সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত ১০ বছরেও কার্যকর হয়নি। এছাড়া সড়ক-মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ ২২৯টি বাঁকে স্বয়ংক্রিয় গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র বসানোর কাজেরও কোনো গতি নেই। মহাসড়কে যত্রতত্র স্পিডব্রেকারের কারণে একদিকে যেমন ঘটছে দুর্ঘটনা অন্যদিকে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে নাইটকোচসহ দূরপাল্লার যানবাহন।
সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রকৌশলীদের দায়িত্বে অবহেলার কারণেই এসব স্পিডব্রেকার সরানোর কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ এসবের কারণে দিন দিন দুর্ঘটনা বাড়ছে, বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যাও। মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নারী ও শিশুসহ সব বয়সের মানুষ।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্পিডব্রেকার অপসারণ করার তাগিদ দিয়ে দেশের সব তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ে চিঠি দেয়া হয় প্রায় ১০ বছর আগে।
কিন্তু আজ অবধি স্পিডব্রেকারগুলো অপসারণ করা হয়নি। মহাজোট সরকারের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে ২১৯টি বাঁকে বিশেষ যন্ত্র বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপও নেয়া হয়। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের মধ্যে রাস্তার বাঁকে গাছ ছেঁটে দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা দূর করার ব্যবস্থা। কিন্তু পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদে গাছ কাটা সম্ভব হয়নি বলে সওজ সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের ২৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের এক সভায় মহাসড়ক থেকে গতিরোধক অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সওজ  প্রকৌশলীদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। আদেশে নিরাপত্তার সঙ্গে মহাসড়কে নিরবচ্ছিন্ন যানবাহন চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ, কালভার্ট ও রেলক্রসিং ছাড়া অন্য কোথাও গতিরোধক স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।
সওজের সাবেক  প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তাফা স্বাক্ষরিত চিঠিতে মহাসড়কে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচলে সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সব স্পিডব্রেকার সরিয়ে ফেলতে বলা হয়। কিন্তু প্রায় ১০ বছরেও এ সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই।
সূত্র জানায়, যানবাহনের বেপরোয়া গতি কমাতে মহাসড়কে স্পিডব্রেকারের পরিবর্তে স্পিড লিমিট মার্কিংসহ সাইন সিগন্যাল ও রাম্বল স্ট্রিপ বসানোসহ সব ক্ষেত্রে রিফ্লেটিভ পেইন্ট দিয়ে রং করার নির্দেশ দেয়া হয়। এ আদেশ পাঠানোর ১০ বছর পরেও সওজ বিভাগ অপ্রয়োজনীয় গতিরোধক অপসারণ করে সাইন সিগন্যাল বা পেইন্টিং করেনি।
অপরিকল্পিত এসব গতিরোধকের কারণে নৈশকোচ  প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ছে। এছাড়া অস্থানে গাড়ির গতি কমানোর কারণে চুরি, ডাকাতি ও যাত্রী হয়রানি বেড়েছে। জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়কে গাড়ির গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার ও অন্য স্থানগুলোতে ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা আছে।
বেপরোয়া চালকরা নির্ধারিত গতিসীমা উপেক্ষা করে ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চালিয়ে হঠাৎ গতিরোধকে এসে গাড়ির গতি কমাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ছে।
সারা দেশে আড়াইশ’র মতো অনুমোদিত স্পিডব্রেকার রয়েছে। অননুমোদিত আছে আরও কয়েকশ’। ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার মহাসড়কে ৪২টি এবং ঢাকা-দৌলতদিয়া মহাসড়কে শতাধিক স্পিডব্রেকার রয়েছে। এসব স্পিডব্রেকারের কারণে অনেক পরিবহনের পাত ভেঙে দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। তবে সওজ সূত্র জানিয়েছে, এ দুটি মহাসড়ক থেকে বেশ কয়েকটি স্পিডব্রেকার অপসারণ করা হয়েছে।
জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহাসড়কে নসিমন-করিমন-ভটভটি বন্ধে আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে হাইওয়ে পুলিশকে আরও কার্যকর ভ‚মিকা পালনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদকে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে।
কিন্তু ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-মাওয়া, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সরেজমিন দেখা গেছে, স্পিডব্রেকার অপসারণ তো হয়ইনি বরং নসিমন, করিমন ও ভটভটি চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্পিডব্রেকার সরানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে সওজের এক কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের চাপে এসব স্পিডব্রেকার দেয়া হয়। ফলে অপসারণে সমস্যা হচ্ছে। তবে পর্যায়ক্রমে রেলক্রসিং ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ-কালভার্ট ছাড়া সব অবৈধ গতিরোধক তুলে দেয়া হবে।
ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু হয়ে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা হাইওয়ের সিরাজগঞ্জের নলকা ব্রিজ, বগুড়া শেরপুরের ঘোঘা ব্রিজ, শাজাহানপুরের ফটকী ব্রিজ, শিবগঞ্জের চণ্ডীহারা, রংপুরের বড় দরগাসহ পশ্চিম-দক্ষিণ অঞ্চলের হাইওয়েতে ফরিদপুরের করিমপুর, মাগুরার রামনগরসহ বেশ কয়েকটি স্পটই দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। হাইওয়ে পুলিশের হিসাবে, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ৩৭টির মধ্যে হাইওয়ে অতিক্রমকারী ২৫টি জেলার প্রায় ৭শ’ কিলোমিটার মহাসড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে পড়েছে। এ অঞ্চলের মহাসড়কের মধ্যে রয়েছে বগুড়া থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নগরবাড়ী থেকে নাটোর ও সিরাজগঞ্জ, পাকশী থেকে বাগেরহাট, মাওয়া থেকে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর থেকে কুয়াকাটা ও যশোর। এসব হাইওয়ে ও সংলগ্ন আঞ্চলিক সড়কগুলোর প্রায় ৫শ’ কিলোমিটারে দুর্ঘটনার হার বেড়েছে।
এ ব্যাপারে সম্প্রতি যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, সড়ক-মহাসড়কে অবৈধভাবে স্থাপিত স্পিডব্রেকার থাকবে না। কারও অবৈধ চাপে এসব অবৈধ স্পিডব্রেকার অপসারণ বন্ধ হবে না। তিনি বলেন, বিপজ্জনক মোড়, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্পটে স্পিডব্রেকারের পরিবর্তে স্থাপন করা হবে রাম্বল স্ট্রিপ। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে গতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন নির্দেশনাসহ স্থাপন করা হবে সড়ক সাইন।
ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডিডটকম) // ইএইচ