ঢাকা: ক্ষমতায় থাকলে যে কারো আয় বাড়ে। দুনিয়ার ইতিহাস হচ্ছে, যাঁরা ক্ষমতায় থাকে, তাঁদের আয় বাড়ে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’ আদিম যুগেও গোষ্ঠীর নেতাদের সম্পদ বেশি থাকতো। সকল নেতাদের আয় বাড়ে, আর আমার কমে। বেড়েছে তবে সেটা তুলনায় অত বাড়েনি।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজের আয়কর রিটার্ন আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিলের পর সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে নির্বাচনকালীন সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এসব কথা বলেন।
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ও এমপিদের মধ্যে কারও কারও সম্পদ বেড়েছে অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর গতিতে। পাঁচ বছরে সম্পদ বেড়েছে ১০০ থেকে ৩০০ গুণ পর্যন্ত। স্ত্রীরাও পাল্লা দিয়ে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। ধারদেনা করে নির্বাচন করেছেন এমন এমপিরাও এখন কয়েকশ কোটি টাকার মালিক। সম্পদের তালিকায় যোগ হয়েছে বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যাংকে নগদ টাকা, জমি, শিল্প প্রতিষ্ঠান, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর ইত্যাদি।
জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার শর্ত হিসেবে নির্বাচন কমিশনে তাদের স্বেচ্ছায় দাখিল করা হলফনামায় ঘোষিত সম্পদের বিবরণী ও ২০০৮ সালের হলফনামায় ঘোষণা দেয়া সম্পদ বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা গেছে অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির চিত্র। বেড়েছে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ, বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগসহ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানা। ১৪ ডিসেম্বর এসব তথ্য সাধারণের জন্য কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে সারাদেশে তোড়পাড় চলছে।
এর আগে অর্থমন্ত্রী অন-লাইনে নিজের ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন জমা দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মঙ্গলবার সচিবালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ আয়কর রিটার্ন জমা দেন তিনি।
এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী জানান, তার করযোগ্য বাৎসরিক আয়ের পরিমাণ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা। এছাড়া কর রেয়াতযোগ্য বিভিন্ন উপখাত (সঞ্চয়পত্র, ডলার বন্ড, ওয়েজ আর্নার) থেকে তার আয় হচ্ছে ১৪ লাখ টাকার কিছু বেশি। এর বিপরীতে ২০১৩-১৪ কর বছরে ৮৪ হাজার ৪৩৬ টাকা আয়কর দেন তিনি।
তিনি আরো জানান, মহাজোট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকালে তার মোট সম্পদের মূল্য ছিল ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। গত পাঁচ বছরে এটা ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। বছরওয়ারি সম্পদের প্রবৃদ্ধির হার হচ্ছে ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
ক্ষমতায় থাকলে যে কারোরই আয়ের পরিমাণ বেড়ে যায় এমন সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, আপনারা দুনিয়ার ইতিহাস দেখেন।
মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের হলফনামা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে যেসব নেতা, মন্ত্রী এবং এমপিরা তাদের আয়কর জমা দিয়েছেন তাদের আয়ের, উৎসের ব্যাপারে তদারকি ও অনুসন্ধান শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআর-এর কাছে ২০১২-১৩ অর্থবছরের জন্য মোট ১ কোটি ৫৮ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫১ টাকার বিপরীতে ৮৪ হাজার ৪৩৬ টাকার আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
আট পৃষ্ঠার আয়কর রিটার্নের কাগজ দেখিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে সবারই উচিত প্রকাশ্যে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া। নানা কারণে এবার বেশি দেরি হয়ে গেছে। অনলাইনে আয়কর জমা দেওয়ার অনেক সুবিধা আছে। এখনই আমাকে এনবিআর আয়কর রিটার্নের সার্টিফিকেট দিয়ে দিবে।
আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকেরই আয় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, এজন্য এনবিআর বা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোনো ব্যবস্থা বা তদারকি করবে কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, দুদক ইজ কম্পিটলি ইনডিপেনডেন্ট। কারো আয় অস্বাভাবিক হলে দুদক যেকোনো ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে। আমার মনে হয়, এনবিআর ইতোমধ্যেই সমস্ত ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেওয়া শুরু করেছে।
মুহিত বলেন, অনেকেরই আয় বাড়তে পারে। এ ব্যাপারে নেতারা নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। অনেকেই বলছেন, তাদের ব্যবসা বেড়েছে।
আওয়ামী লীগ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে সকলেই তাদের সম্পদের ও আয়ের হিসাব জমা দিয়েছেন। যে কারো জানার ইচ্ছা থাকলে জানতে পারবেন।
আয়কর বিবরণীর হিসাব তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী জানান, আমার করযোগ্য আয়ের পরিমাণ হচ্ছে ১১ লাখ ৪১ হাজার ১৭৯ টাকা, করবহির্ভুত আয় ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৪ টাকা। আমার বেতনভাতা, সম্মানীও করযোগ্য। এছাড়া ৪৫ হাজার ডলারের কিছু বন্ড রয়েছে। আর বাৎসরিক পেনশন আছে ৭০ হাজার ১০ টাকার। গত বছরে আয় ছিলো ১ কোটি ৪৫ লাখ ৯৩ হাজার ৫০৫ টাকা। এবার সেটা বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫১ টাকা। আয় বাড়ার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে আমার ক্যাশ ইন হ্যান্ড (নগদ অর্থ) টাকা আছে মোট ৫০ লক্ষ টাকার মতো।
মহাজোট সরকারের সময় থেকে পাঁচ বছরে নিজের আয়ের হিসাব দিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আরো জানান, ক্ষমতায় আসার সময় অর্থাৎ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আমার আয় ছিলো ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এখন সেটা ৪৪ লাখ বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এ হিসোবে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
এনবিআর-এর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা এই সময়ে ১০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, লক্ষ্যমাত্রার নিচে অর্জিত হবে এটাই স্বাভাবিক। গত অর্থবছরে এনবিআর-এর গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছিলো ২৪ শতাংশ। এবার সেটা ১৬ শতাংশ হবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। তবে এই মাসের পর সেটা আরো বাড়বে।





