সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধসের আজ এক বছর। গত বছরের এই দিনে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভবন ধসে সহস্রাধিক গার্মেন্টস শ্রমিক প্রাণ হারান। আহতের অনেকেই সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্বের অভিশাপ ভোগ করছেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি শুধু নয়, বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তিও মারাত্মক বাধাগ্রস্থ হয়েছে। একই কারণে জিএসপি সুবিধাও আজ স্থগিত।
সব মিলে একটা কঠিন সময় পার করছে বাংলাদেশের পোশাক খাত। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও অভিযুক্তদের বিচার প্রক্রিয়া। এক বছর পেরিয়ে গেলেও এর কোনোটিই সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি।
[b]শ্রমিকদের পুনর্বাসন[/b]
রানা প্লাজার ভবন ধসের এক বছর শেষে জনমনে বড় প্রশ্ন, হতভাগ্য শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের ইস্যুটি। নিহতদের পরিবার, আহত বা কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর সুরাহা করা গেল না। বিক্ষিপ্ত কিছু অনুদান ছাড়া এই সময়ে প্রকৃত অর্থে ক্ষতিপূরণ তারা পায়নি। শ্রমিক অধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মনে করছে, ক্ষতিপূরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট। লক্ষ্য করা যাচ্ছে ক্ষতিপূরণের দায় এড়ানোর চেষ্টাও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলসহ বিভিন্ন উৎসব থেকে ২২ কোটি ৩১ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্থ ও নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে দেয়া হয়েছে।
শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানায় দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ১ লাখ টাকা। তবে রানা প্লাজা ধসের সময় এ অঙ্ক নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী একটি প্রতিবেদন প্রদান করেন। তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি নিহত, নিখোঁজ ও গুরুতর আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ সাড়ে ১৪ লাখ টাকা, আর আহত শ্রমিকদের জন্য ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেন। তবে আজ অবধি এই প্রতিবেদনের চূড়ান্ত সুরাহা হয়নি। ফলে এসব ঘটনায় কত টাকা দেয়া হবে তা নিশ্চিত করা যায় নি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনের ১২১ ধারায় বলা হয়েছে, নিহত বা আহত শ্রমিকের পরিবারে তার উপর যতজন নির্ভরশীল ছিল তার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর লেবার স্টাডিজের (বিলস) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সুলতান উদ্দিন আহমদ বলেন, আইএলও কনভেনশনে যে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে তার সঙ্গে যুক্ত করে আরও ৫ লাখ টাকা করে থোক বরাদ্দ দিতে হবে। সেই হিসেবে নিহতদের পরিবারকে কমপক্ষে সাড়ে ১৯ লাখ টাকা করে দিতে হবে।
এ ব্যাপারে শ্রম সচিব মিকাইল শিপার জানান, যাদের মরদেহ শনাক্ত করা গেছে তাদের সবাই ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। এর বাইরে গুরুতর আহত ৩৬ শ্রমিককে ১০ লাখ টাকা থেকে ১৫ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে।
[b]অভিযুক্তদের বিচার[/b]
রানাপ্লাজার ধসের ঘটনায় ইমারত আইন, নিহত ও সরাসরি খুনের অভিযোগে দায়ের করা হয় তিনটি মামলা। এসব মামলায় সব অভিযুক্ত আসামীকে যেমন আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি, তেমনি যারা গ্রেফতার রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও এক বছরে শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।
দায়েরকৃত তিন মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় চার্জশিটে মূল অভিযুক্ত হিসেবে থাকছে ভবন মালিক সাভারের যুবলীগ নেতা সোহেল রানার নাম। তিন মামলায় ৬ শতাধিক পোশাক শ্রমিকসহ দেড় হাজারেরও বেশি লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, মামলায় রানা প্লাজার পাঁচ পোশাক কারখানা নিউ ওয়েভ বটমস, নিউ ওয়েভ স্টাইল, ফ্যান্টম টেক্স, ফ্যান্টম অ্যাপারেল ও ইথার টেক্স লিমিটেডের মালিক ও কর্মকর্তাসহ ১৮ জনকে আসামী করা হচ্ছে।
তবে চার্জশীটে তাদের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক ভবনে অবৈধভাবে কারখানা স্থাপন, কারখানা অনুমোদনের জন্য ভবনের ভুয়া নকশা দাখিল, অবৈধভাবে লাইসেন্স সংগ্রহ, বিধি বহির্ভূতভাবে ভারী যন্ত্রপাতি ও জেনারেটর বসানো এবং ফাটল দেখার পরও কারখানা সিলগালা না করার অভিযোগ আনা হচ্ছে।
সূত্রটি জানায়, কারখানার মালিক ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক জন কর্মচারীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হচ্ছে।
রানাপ্লাজার ধসের ঘটনায় দায়ের করা তিনটি মামলা তদন্ত করছেন সিআইডি সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর। তিনি জানান, তিনটি মামলার মধ্যে সরাসরি হত্যা মামলা বাদে বাকি দুইটি মামলার চার্জশিট প্রায় চুড়ান্ত।  আগামী মে মাসের মধ্যে এই দুই মামলার চার্জশিট দেয়া হবে।
[b]অভিযুক্তের তালিকায় সরকারি কর্মচারী[/b]
অন্যদিকে ভয়াবহ এই ভবন ধসের ঘটনায় সরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকেও দায়ী করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদফতর, সাভার পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসন। সময়মতো নজরদারি না করার অভিযোগ আনা হচ্ছে রাজউকের প্রধান ইমারত পরিদর্শক রাহেলা খাতুন ও ইমারত পরিদর্শক আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। ভুয়া নকশার ওপর ভিত্তি করে কারখানার অনুমোদন দেয়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে শিল্প-সম্পর্ক শিক্ষায়তনের প্রকল্প পরিচালক বেলায়েত হোসেনসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ধসের আগের দিন রানা প্লাজায় ফাটল দেখা দেয়ার পর স্থানীয় প্রশাসক হিসেবে সাভারের ইউএনও কবির উদ্দিন সরকার ভবনটি সিলগালা না করে চালু রাখার বিষয়ে মালিক পক্ষকে উৎসাহ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
[b]শ্রমিকের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন[/b]
রানা প্লাজার ৫টি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করা ৩ হাজার ৬৩৯ শ্রমিকের মধ্যে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১৩৫ জন। এর মধ্যে ২৯১ জনের লাশ বেওয়ারিশ। এসব লাশের মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। অন্যদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
ধসে পড়া ওই ভবন থেকে জীবিত উদ্ধার ২ হাজার ৪৩৮ জন যার মধ্যে কমপক্ষে এক হাজার শ্রমিক আহত ছিলেন। এর মধ্যে এক বা একাধিক অঙ্গহানি হয়েছে এমন গুরুতর আহত রয়েছেন ৩৬ জন। এ ছাড়া এখনো ৯৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে বিভিন্ন সংগঠনের দাবি।
আহতদের চিকিৎসা সহায়তা, বেতন ও অন্যান্য সুবিধা, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান উদ্ধার কাজ ও পুনর্বাসনে বিজিএমইএ- এর পক্ষ থেকে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
তবে অন্য শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, অনুদান আর ক্ষতিপূরণ এক নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশ চন্দ্র বলেন, এখন পর্যন্ত যে টাকা নিহতদের পরিবার বা আতহদের দেয়া হয়েছে তা অনুদান। এর এক টাকাও ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হওয়া ঠিক হবে না।
গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, কোন কোন শ্রমিক পরিবার একাধিকবার পাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ একবারও পাচ্ছেন না।
[b]কে দেবে ক্ষতিপূরণের টাকা[/b]
ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ঠিক না হওয়ার পাশাপাশি এই টাকা কোন উৎস থেকে আসবে তা চূড়ান্ত হয়নি। তাই সর্বমহলে প্রশ্ন এর দায় কার আর ক্ষতিপূরণ আসবে কোথা থেকে?
সরকার ও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্বল দায়বদ্ধতার কারণে এ ধরণের ভবন ধসের ঘটনা একের পর এক ঘটে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে সরকারি সহযোগীতা আবশ্যক বলে মনে করছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।
আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিাল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশ চন্দ্র বলেন, প্রধান দায়টা কারখানার মালিকের হলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কম দায়ী নন। সরকার সংশ্লিষ্টদের বাইরে পোশাক ক্রেতা আন্তর্জাতিক ব্র্র্যান্ডগুলোও এর দায় এড়াতে পারে না। তাই এসব পক্ষকে সম্মিলিতভাবেই দায় নিতে হবে।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরও মালিকদের স্বার্থ বাস্তবায়িত হয়েছে, শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত রয়েছে।
তিনি মনে করেন, ক্ষতিপূরণ প্রদানে সমন্বয়হীনতার কারণে দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ বিক্ষিপ্তভাবে কিছু টাকা পাচ্ছেন। একসাথে না পাওয়ায় সেই টাকা তারা টেকসই কাজে লাগাতে পারছেন না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ(টিআইবি) বলছে, ৬০ শতাংশ উদ্যোগের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে এবং বাকি ৯ শতাংশের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি নেই। শ্রমিকের স্বার্থরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগগুলোর ক্ষেত্রে খুব বেশি অগ্রগতি নেই বলে দাবি টিআইবি’র।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাবে কিনা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে এ জাতীয় সুবিধা বহাল থাকবে কিনা তাও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। আরোপিত শর্ত পূরণের ওপর বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে।
[b]দুই যুগেও হয়নি শ্রমিক ডাটাবেইজ[/b]
সারাকা গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে শুরু হয় পোশাক শিল্পের দুর্ঘটনা, ধস ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। তারপর কেটে গেছে দুই যুগ। কিন্তু তৈরি হয়নি শ্রমিকদের ডাটাবেইজ। এ ডাটাবেইজের অভাবেই ভবন ধসের এক বছর পরেও রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে তৈরি হচ্ছে জটিলতা। বঞ্চিত হচ্ছেন অসংখ্য শ্রমিক।
গত বছরের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের সময় ওই ভবনের পোশাক কারখানাগুলোতে কতোজন শ্রমিক কাজ করছিলেন, তার প্রকৃত সংখ্যা আজও বের করা সম্ভব হয়নি।
১৯৯০ সালে মিরপুরের সারাকা গার্মেণ্টসে এক অগ্নিকাণ্ডে ২৭ জন নিহত হন। ওই ঘটনার পর শ্রমিকদের ডাটাবেইজ তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু গত ২৪ বছরেও শ্রমিকদের ডাটাবেইজ তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়নি। এ বিষয়ে শুধু অনেক আলোচনাই হয়েছে, বাস্তবায়িত হয়নি।
গার্মেন্টস মালিকদের গাফিলতি এজন্য মূলত দায়ী। তবে গত বছরের ২০ মে বিজিএমইএ সভাপতি মো: আতিকুল ইসলাম ঘোষণা দেন, আগস্ট মাসের মধ্যে গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের ডাটাবেইজ তৈরি ও সার্ভিস বুক চালু না করলে তাদের সব সেবা দেওয়া বন্ধ করে দেবে বিজিএমইএ। বিজিএমইএ’র ঘোষণা দেওয়ার পরও প্রায় তিন হাজার কারখানা ডাটাবেইজের অন্তর্ভূক্ত হয়নি। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সংগঠনটি থেকে।
দুর্ঘটনার পর যদি শ্রমিকদের সংখ্যা জানা যেতো শ্রমিকদের পরিচয় বের করতে কোনো সমস্যা হতো না বলে জানান রেডিমেট গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারশনের সভাপতি লাভলী ইয়াসমিন। সরকারি কঠোরতা, সংশ্লিষ্টদের দায়বদ্ধতা আর কারখানা থেকে শ্রমিক ডাটাবেইজ ফলো করা হলে এ ধরণের দূর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
[b]ঢাকা, ২৪ এপ্রিল(টাইমনিউজবিডি.কম)//কেবি[/b]