ভাষা সৈনিক আহমদ রফিক বলেছেন, অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। ভারতের সঙ্গে দরকশাকশি না করে অধিকার আদায়ের জন্য জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কনভেনশনে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি এবং নিজ দেশে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে কনভেনশন কমিটি করে জনগণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করাতে হবে এবং আমাদের পানির ন্যায্য অধিকার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের নজরে আনতে পারলেই সহজে ন্যায্য অধিকার আদায় সম্ভব হবে।
শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা আয়োজিত জাতীয় কনভেনশনে উদ্ধোধনী বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
প্রবীণ এই ভাষা সৈনিক ও গবেষক বলেন, বাংলাদেশ নদী মাতৃক দেশ, নদীর উপর নির্ভর করে বাংলাদেশের সু¯’তা। নদীর প্রভাহ না থাকলে দেশের অর্থনীতি কখনও অগ্রগতি হবে না। তিস্তাসহ আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার প্রতি আহ্বান জানান।
বর্তমানে রাজনীতি অর্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, টাকা থাকলে এখন ভোট কেনা যায়। সকল কিছু দলীয়করণ হয়ে গেছে। যার ফলে জনগণের অধিকার আদায়ে আন্দোলন সংগ্রাম হচ্ছে না। তাই নদীর পানি নিয়ে শুধু ভারত বিরোধী আন্দোলন করলেই হবে না, নিজের দেশে ভুমিদস্যু দখলদার বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে।  
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, আমাদের দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দল ভারতে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে খুশি করার জন্য প্রতিযোগীতা শুরু করেছে। তারা মনে করছে মুদির সঙ্গে কোনো রকম তিস্তার চুক্তি করতে পারলেই আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায় হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু চুক্তি হলে আমাদের অধিকার আদায় হবে না। চুক্তি করার আগে চুক্তির বিস্তারিত জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। জনগণ অবহিত না হলে দেশের অধিকার আদায় হবে না।
পদ্মা মেঘনা যমুনা ও তিস্তা এই চারটি নদী ভারতে আগ্রাসনে হুমকির মুখে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি করার আগে আমাদের দেশের নদীর ক্ষয় ক্ষতির হিসাব করতে হবে। এবং পরবর্তী করণীয় কি তা নিয়েও ভাবতে হবে। এখন এটি কে করবে প্রশ্ন করে তিনি বলেন, জনগনের দায়িত্ব যারা নিয়েছে তাদের করার কথা। কিন্তু ফারাক্কা বাদের কারণে কি পরিমাণ আমাদের ক্ষতি হয়েছে এই হিসাব সরকারের কাছে নেই। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার আগে ভারত আমাদের উজানে অভিন্ন ৫৪টি অভিন্ন নদীতে বাধ দিয়ে কি পরিমান ক্ষতি হয়েছে ও হবে এর হিসাব ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে আগে আমাদের ভাবতে হবে।
প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে ভাঁটির দেশ তাই ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ‘‘ল’’ অনুযায়ী দেশের যদি কোন ক্ষতি হয় তাহলে আগে থেকে জানাতে হবে যে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে। তাহলে তারা আর নিজের মত করে আর ইচ্ছা করে নদীর বুকে বাঁধ তৈরি করতে পারবে না। তাই চুক্তির মাধ্যমে সকল আইন জনসম্মুখে  প্রচার করতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশ কোন দিন পানির ন্যায্য হিস্যা পাবে না।
তিনি আরো বলেন, দুই দেশের পররাষ্ট্র নীতির মাধ্যমে সকল সমস্যা সমাধান করতে পারে দেশের সরকার। সরকার যদি আন্তরিক হয় এবং গণতান্ত্রিক নিয়ম নীতি মেনে চলে তাহলে ভারত কোন দিন আমাদের এই হিসাব থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না।
তিনি আরো বলেন, যদি দুই দেশের মধ্যে কোন চুক্তি হয় তাহলে ইন্টারন্যাশনাল আইন অনুযায়ী সেই চুক্তি ক্ষতিকর হলেও তা ক্ষতি পূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারতের সাথে আমাদের আরো ৩০ বছরের চুক্তি আছে। এই চুক্তিতে বাংলাদেশের ক্ষতি হচ্ছে। তাই এই চুক্তির মধ্যে কি ছিল তা সবার সামনে নিয়ে আসতে হবে সরকারকে।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক অভিন্ন নদীর পানি চুক্তির জনগুত্বপূর্ন বিষয়টি শুধুমাত্র দুটি দেশের সরকারী মহলের উপর ছেড়ে দেয়া যায় না। কারণ ভারতের শাসক গোষ্টি নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে কখনো আধিপত্যবাদী রাজনীতির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে। তারা কখনো সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার নামে পানির বিনিময়ে নানা সুবিধা নিয়েছে। বাংলাদেশের  এ যাবত  যারা ক্ষমতায় এসেছে সবাই নতজানু নীতি অনুসরণ করে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে। আবার কখনো তারা ভারত বিরোধীতার নামে সাম্প্রদায়িক উস্কানির আড়ালে বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে পরিণত করছে।
নদী গবেষক ও কলাম লেখক নুর মোহাম্মদ বলেন, তিস্তা চুক্তি নিয়ে এই সরকার কোন কথা বলতে পারবে না, কারণ এই সরকার জনগনের ভোটে নির্বাচিত নয়।
কমিনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ বলেন, ভারতের বাম রাজনীতি ক্ষতায় এসেছে শুধু মাত্র তাদের নীতি নৈতিকতার কারণে। আমাদের এই দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থান দেশের জন্য ভাল না। তাই আমাদের গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার ঐক্য বদ্ধ হয়ে সরকারের কাছে চাঁপ সৃষ্টি করে দেশের মানুষের অধিকার আদায় করতে হবে।
কনভেনশনের প্রথম অধিবেশনে আরো বক্তব্য ও রাখেন- অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আহমেদ কামাল, অধ্যাপক আকমল হোসেন প্রমুখ। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন, প্রকৌশলী বিডি রহমতুল্ল্হা, ডঃ স্বপন আদনান, ডাঃ আবদুল মতিন, অধ্যাপক নাসিম আকতার হোসাইন, ডঃ তানজিমউদ্দীন খান প্রমুখ। কনভেনশনের শেষ অধিবেশনে সারাদিন ব্যাপী চলবে এতে বিশিষ্টজন বক্তব্যে রাখবেন।
[b]ঢাকা,এএ ২৩ মে (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসএইচ[/b]