সৌদি আরব,মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছেই। চলছে ধরপাকড়। এ অবস্থায় শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের টিকিয়ে রাখতে ব্যয় করতে হয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ। এ সময়গুলোতে তাদের আয়ও হয়েছে কম। এসব কারণে কমে এসেছে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)।
স্বাধীনতার পর থেকে এবারই প্রথম ২০১৩ সালে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স কমেছে। অথচ এর আগে প্রতি বছরই আয় ঊর্ধ্বমুখী ছিল। গত বছর এর আগের বছরের তুলনায় প্রবাসী আয় কমেছে সাত হাজার ৬০৭ কোটি টাকা।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়া, পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব, দক্ষ কর্মী না পাঠানো, বাংলাদেশি অভিবাসীদের অপরাধ কর্মে জড়িয়ে যাওয়াও রেমিট্যান্স কমার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এসব তথ্য জানিয়েছে।
বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশ। এসব দেশে এ দেশের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মরত আছেন। কিন্তু মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবে গত দু’বছর ধরে অবৈধ কর্মীদের বৈধ হওয়ার সুযোগ দেয় দেশগুলোর সরকার। আর বৈধ হতে তাদের বেশ বড় খরচের ধাক্কা পোহাতে হয়। এ কারণে তারা আয় করলেও বৈধ হওয়া বা টিকে থাকার জন্য দেশে টাকা পাঠাতে পারেননি।
আবার অনেক শ্রমিক বৈধ হতে না পেরে আটক অভিযান চলাকালে পালিয়ে থেকেছেন। এসব সময়ে আয় করতে পারেনি তারা।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ আছে অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার আরব আমিরাত ও কুয়েত। গত কয়েক বছর ধরে এসব বাজারে নতুন কোনো শ্রমিক যুক্ত হতে পারেননি। অন্যান্য দেশেও শ্রমিক যাওয়ার হার বাড়েনি। আর জি টু জি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক গেলেও তা ছিল নামমাত্র। প্রতি মাসে ১০ হাজার করে কয়েক বছরে পাঁচ লাখ কর্মী নেওয়ার কথা থাকলেও গত এক বছরে মালয়েশিয়ায় গেছেন মাত্র দুই হাজার কর্মী।
সৌদি আরবে বৈধ হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হলে দেশটির বাজারটি খোলার কথা। কিন্তু তেমন কোনো আভাস আজও মেলেনি। লিবিয়া ও ইরানে যুদ্ধাবস্থা শেষ হলেও এসব দেশের শ্রমবাজার আজও চাঙ্গা হয়নি। এভাবে বড় বড় শ্রমবাজারগুলো কোনো না কোনোভাবে বন্ধ হয়ে আছে। আর নতুন শ্রমবাজারগুলোও সেভাবে শ্রমিক টানতে পারছে না। এসব কারণেই জনশক্তি রফতানি এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর হার কমে আসছে।
অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী রেমিট্যান্স কমার কারণ হিসেবে জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়া ও অদক্ষ অভিবাসনকে দায়ী করেছেন।
তিনি টাইম নিউজ বিডিকে জানান, গত তিন বছর ধরে অভিবাসন কমছে। তারই ফল এই প্রবাসী আয় কমে আসা।
অভিবাসনের ক্ষেত্রে গত দুই বছর ধরে দক্ষ শ্রমিক অভিবাসন হচ্ছে না। অদক্ষ শ্রমিকরা বিদেশে গেলেও বেশি বেতন পাওয়ার কথা নয়। এটিও রেমিট্যান্স কম হওয়ার কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগেও হুন্ডির মাধ্যমে টাকা আসার পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। কিন্তু এ কারণে কখনোই দেশে রেমিট্যান্স আসা কমেনি। আর এখন টাকা পাঠানোর অনেক নিয়ম মাফিক উপায় আছে। হুন্ডির পরিমাণও কমে এসেছে।
এ বিষয়ে জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী টাইম নিউজবিডিকে বলেন, বিভিন্ন দেশে অবৈধদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। অনেকে টাকা আয় করলেও সে টাকা হাতে রেখে দিচ্ছেন উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলানোর জন্য। এই বৈধ হওয়ার জন্য তাদেরকে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। এসব কারণেই রেমিট্যান্স কমতে পারে।
এসব বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর আহমেদ খান টাইম নিউজবিডিকে জানান, জনশক্তি রফতানি কমার সঙ্গে রেমিট্যান্স কমার কোনো সম্পর্ক নেই। বছরজুড়ে দেশের অস্থির রাজনৈতিক অবস্থার কারণে প্রবাসীরা টাকা পাঠাননি। এছাড়া বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা, হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো এবং বিভিন্ন দেশে অবৈধ শ্রমিকদের আটক অভিযানের ফলেই রেমিট্যান্স কমেছে।
তবে এতে হতাশ হওয়ার কারণ নেই উল্লেখ করে প্রবাসীকল্যাণ সচিব বলেন, দেশের পরিস্থিতি ভালো হচ্ছে। ধীরে ধীরে প্রবাসীরা আবারও টাকা পাঠানো শুরু করবেন।
[b]ঢাকা, জানুয়ারি ৩০ (টাইমনিউজবিডি.কম)//জে ইউ/জিই

[/b]