[b]ঢাকা:[/b] সম্প্রতি বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশ একটি বহুল সমালোচিত দেশ। গত ৫ জানুয়ারি বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার সৃষ্টি হয়। তাতে সংখ্যালঘুদের উপর বিভিন্ন কুচক্রী মহলের হামলা আরও বেশি সমালোচিত করেছে বাংলাদেশকে। কিন্তু প্রতি ৫ বছর পর পর ক্ষমতার পালাবদলের সময় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা বেশি ঘটে বলে অতীত থেকে জানা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন এবং বাম ধারার দলগুলো, বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও ভুক্তোভোগিদের বরাতে উঠে এসেছে ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে সারাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর ৫ শতাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389534144.jpg[/img]
গত কয়েক বছরে এবং সম্প্রতি নির্বাচনকে ঘিরে সংখ্যালঘুদের উপর যেসব হামলা ও নির্যাতনের খবর বেড়িয়েছে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ঘটনার অভিযোগ যাদের দিকে তা অধিকাংশরাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। কিন্তু একপেশেভাবে জামায়াত-বিএনপিকে দায়ী করছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার।
সম্প্রতি যশোর, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, পাবনা, জয়পুরহাট, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, ঠাকুরগাঁওসহ প্রায় বিশ জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সব ঘটনার বেশির ভাগের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনই জড়িত বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি যশোরে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগের সাবেক হুইপ ও এমপি এবং নির্বাচনে পরাজিত আবদুল ওহাব। ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে বিজয়ী এমপি আওয়ামী লীগ নেতা রণজিৎ কুমার রায় বলেছেন, সংখ্যালঘুদের উপর হামলা চালিয়েছে তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আব্দুল ওহাবের ক্যাডাররা।
তবে সরকার প্রধান ও আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ এ ঘটনায় জামায়াত-শিবির ঘটিয়েছে বলে প্রচার করছেন।
অন্যদিকে নোয়াখালীর কৃষ্ণপুরে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ ক্যাডাররা হিন্দুদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা চালায়। এ ঘটনায় স্থানীয় পূজা কমিটি আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ১০ ক্যাডারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
ভুক্তভোগীরা খোলা চিঠি দিয়ে স্বরাষ্ট মন্ত্রনালয়কে জানিয়েছেন, সাতক্ষীরাতেও তাণ্ডব চালাচ্ছে সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা। এখানে ক্ষমতাসীনদের হাতে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় নির্যাতিত হওয়ার পিছনে মূল কারণ তাদের জায়গা-জমি।
সম্প্রতি সাতক্ষীরায় সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করতে গিয়ে যুবলীগ কর্মী হাতেনাতে ধরা পড়ে। এঘটনায় আদালত তাকে ১ বছর কারাদণ্ড দেয়।
টাঙ্গাইলে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা হামলা করে। এর প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের হয়। হাইকোর্ট ঘটনার জন্য দায়ী আওয়ামী নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন।
সস্প্রতি পাবনার সাঁথিয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা ও ভাংচুর করতে গিয়ে ধরা পড়ে যুবলীগের ক্যাডাররা। ঘটনার পর আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেছেন, এ ঘটনা ঘটিয়েছে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ক্যাডাররা। তিনি সাক্ষী প্রমাণও তুলে ধরেন। ঘটনার প্রধান হোতাকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ঘুরতে দেখেছেন বলে ভুক্তোভোগীরা মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে জানিয়েছেন বলেও তিনি জানান।
একই অভিযোগ করেছে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, সিপিবি, বাসদ, সুজন, নারী সংগঠন, গণফোরামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
বগুড়ায় মন্দিরে আগুন দেয়ার সময় ছাত্রলীগের নেতাকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হলেও পরে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ছেড়ে দেয়া হয়। বগুড়ার শাজাহানপুরে যুবলীগের অত্যাচারে অতিষ্ট বেশ কযেকটি হিন্দু পরিবার ডিসির নিকট স্মারকলিপি দিযেও কোনো সহায়তা না পেয়ে তারা এলাকা ছেড়ে গেছেন।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389534193.jpg[/img]
অন্যদিকে ময়মনসিংহে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে শিব মূর্তি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যুবলীগের কর্মী।
২০১১ সালে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বৌদ্ধবিহার এবং বৌদ্ধপল্লীতে হামলার ঘটনা নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় হয়। সে সময় বড় দুই দল একে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করে। দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, সামাজিক সংস্থা, রাজনৈতিক দল এবং বিশিষ্টজনের তদন্তে উঠে আসে এঘটনায় নেতৃত্ব দেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ। এরপর সেখানে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতাকর্মীদেরও অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।
এধরনের একের পর এক সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনায় গত ক’দিন ধরে মিছিল-মিটিং চলছে। কিন্তু বাস্তবে কোন ফল হচ্ছে না।
ইতোমধ্যে সংখ্যালঘুদের ওপর বার বার নির্যাতনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসে অতীতের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়ার বিষয়টি।
এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার এর দায় এড়াতে পারে না বলে মনে করছে সুশীল সমাজ, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো।
সংখ্যালঘুদের উপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে নিউএইজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির বলেন, যশোরে সংখ্যালঘুদের ওপর কারা হামলা করেছে তা পত্রপত্রিকায় বের হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ইচ্ছা করলেও এর দায় এড়াতে পারে না।
সংখ্যালঘুদের উপর হামলায় আওয়ামী লীগের সুবিধা বেশি বলে মন্তব্য করেছেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা প্রতিরোধে বিক্ষুব্ধ জনতা’শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের উপর হামলাসহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলো বেশি সুবিধা ভোগ করে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ এ সকল ঘটনার সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করে থাকে। নিজেদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চরিত্র রেখে সাম্প্রদায়িকতা রোধ করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে হিন্দু সম্প্রদায়কে নিয়ে ‘রাজনীতি’না করে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন সংগঠনের সভাপতি দ্বীনবন্ধু রায়।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেতা সি আর দত্ত বীরউত্তম বলেছেন, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী কর্তৃক সংঘ্যালঘুদের উপর হামলা চালানোর ঘটনা সত্য। আমরা আওয়ামী লীগকে এর মধ্যেই অবহিত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জানিয়েছি।
হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, জামায়াত-শিবির সংখ্যালঘু নির্যাতন করেছে ব্যাপারটা এখন একটা শ্লোগান হয়ে গেছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের লোকজনও জড়িত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি জামায়াত-শিবিরই হামলা করে থাকে তবে সরকার কেন তাদের বিচার করছে না?
সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্য সরকারি দলের তিনজন এমপিকে সরাসরি দায়ী করেছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা। তারা বলছেন, এদের প্রশ্রয়েই তাদের অনুসারীরা সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করেছেন।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতা যেন প্রলম্বিত না হয়। ব্যর্থতা প্রলম্বিত হলে দেশ বিপন্ন হয়ে যাবে। এখনই এই সহিংসতা রুখতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389534326.jpg[/img]
সম্প্রতি সাধারণ নাগরিকগণও খোলা চিঠির মাধ্যমে বর্তমান সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিকভাবে আপনারা এক না হতে পারলে ও অন্তত সংখ্যালঘু ইস্যুতে সবাই একমত হোন।
এবিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনায় সরকার জিরো টলারেন্স বা কোনো ছাড় না দেয়ার নীতি অনুসরণ করবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামালউদ্দিন আহমেদ জানান, হিন্দুদের ওপর হামলাগুলোর বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য বিভিন্ন জেলার পুলিশকে এরই মধ্যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলা প্রশাসক তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনায় আওয়ামীলীগের লোকজন জড়িত বলে উঠে এসেছে ডিসিদের এসব প্রতিবেদনে।
এব্যাপারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলার সঙ্গে আওয়ামী লীগ জড়িত। আওয়ামী লীগ সরকার এসব ঘটনা ঘটিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচারের দাবিও জানান।
সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, আমরা দলের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্ত টিম গঠনসহ ৫ দফা সুপারিশমালা পেশ করেছি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী ড. শফিকুর রহমান জানান, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে জামায়াতকে হেয় প্রতিপন্ন করতে সবসময় মিথ্যাচার করে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি মিডিয়ার মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েছে সত্যিকার অর্থে কারা সংখ্যালঘুদের উপর হামলা ও নির্যাতন চালায়। জামায়াতের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের মাধ্যমে তদন্ত টিম গঠন করে সংখ্যালঘু নির্যাতনের তদন্তের পর বিচারের দাবি জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকারীদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী যে দলেরই হোক না কেন তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি ভূমিকা যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389534397.jpg[/img]