ছিলেন বাংলামটর এলাকার একটি পার্সের দোকানের কর্মচারি। এরপর লবিংয়ে রাতারাতি রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তারপর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে হয়ে উঠেন ভয়ঙ্কর ও পেশাদার ছিনতাইকারী। বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইয়ের ঘটনায় তার নাম আসলেও অজ্ঞাত কারণে রয়ে যান ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি রোববার। ওই দিন মগবাজারে ছিনতাইকালে অস্ত্রসহ হাতেনাতে পুলিশের কাছে ধরা পড়েন তিনি।
এ ঘটনায় খোদ সরকার দল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মধ্যেই শুরু হয়েছে তোলপাড়। কিভাবে একজন দোকানের কর্মচারি থেকে ছাত্রলীগ নেতা হলেন, তা নিয়ে চলছে তুমুল সমালোচনা। এমনকি ছিনতাইয়ের ঘট্নায় ধরা পড়ার পর তার সম্পদের পরিমাণ নিয়েও চলছে হিসাব-নিকাশ। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও রমনা থানা পুলিশ সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এই পেশাদার ছিনতাইকারী আর কেউ নন, রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ পারভেজ। রোববার দুপুরে রাজধানীর মগবাজার মোড়ে পূবালী ব্যাংকের সিঁড়িতে রাফা মটরস নামে একটি পার্সের দোকানের কর্মচারির কাছ থেকে টাকা ছিনতাই করার সময় অস্ত্রসহ হাতেনাতে ধরা পড়েন তিনি।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনায় ও অবৈধভাবে অস্ত্র ব্যবহারের দায়ে রামপুরা থানায় ২টি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল বলে জানিয়েছে রমনা থানা পুলিশ।
রোববার রাজধানীতে ছিনতাইয়ের সময় অস্ত্রসহ হাতেনাতে ধরা পড়ার পর বেরিয়ে আসতে থাকে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। পারভেজ দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইয়ের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলেও জানা গেছে।
যখন কর্মচারি ছিলেন পারভেজ
রামপুরা থানা ছাত্রলীগ, রমনা থানা ও বাংলামটরসহ বিভিন্ন এলাকার দোকানদারদের কাছ থেকে বেরিয়ে এসেছে নানান অভিযোগ। বাংলামটর এলাকার হোমটাউন এসি মার্কেটের 'মেঘনা মটরস' নামক একটি পার্সের দোকানে কর্মচারি হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন মাসুদ পারভেজ। সে এই মার্কেটের কর্মচারি থাকাকালেই ছিনতাই ও ছোটখাটো চুরির সাথে জড়িত ছিল।
এ ব্যাপারে হোমটাউন এসি মার্কেটের এক কর্মচারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কর্মচারি থাকাকালে মার্কেটের সামনে থেকে একটি মোটরসাইকেল খোয়া যায়। সেসময় সবার সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে পারভেজের দিকে। এরপর সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে লাপাত্তা যায়।
পারভেজ যেভাবে ছাত্রলীগ নেতা
হোমটাউন এসি মার্কেটের 'মেঘনা মটরস' পার্সের দোকানে কর্মচারী থাকাকালে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় চাকরি ছেড়ে কিছুদিন লাপাত্তা যান পারভেজ। এরপর হঠাৎ করেই নাম লেখান রাজনীতিতে। লবিং করে রাতারাতি রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ লুফে নেন। এ নিয়ে ছাত্রলীগের একাধিক ত্যাগী নেতা বিরোধীতা করলেও লবিংয়ে টিকে যায় পারভেজ।
রাজনৈতিক পরিচয়ে পেশাদার ছিনতাইকারী পারভেজ
রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে আসীন হবার পর বেপরোয়া হয়ে উঠেন পারভেজ। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগ নেতার পরিচয়ে এহেন কোনো অপকর্ম নেই যা সে করেনি।
রামপুরা থানা ছাত্রলীগ নেতা হলেও তার বিচরণ ছিল মগবাজার ও বাংলামটর এলাকায়। এ এলাকার ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের সাথে পারভেজের ছিল সখ্যতা। এই সুযোগ নিয়ে মগবাজার এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতো পারভেজ।
যেভাবে আটক হলেন পারভেজ
বাংলামটর এলাকার রাফা মটরস নামক একটি পার্টসের দোকানের কর্মচারি ইউসুফ পূবালী ব্যাংকে ৫ লাখ টাকা জমা দেয়ার জন্য মগবাজার মোড়ের দিকে রওনা হন। এ সময় তাকে অনুসরণ করে দু'জন ছিনতাইকারী। ইউসুফ যখন ব্যাংকের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠতে থাকেন। তখন তাকে অস্ত্র ঠেকিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে ছিনতাইকারীরা। এ সময় ইউসুফের চিৎকারে আশপাশের দোকানদাররা এসে ইউসুফকে উদ্ধার করে এবং মাসুদ পারভেজকে অস্ত্রসহ আটক করে।পরে রমনা থানা পুলিশ এসে পারভেজকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়।
এ ব্যাপারে ছিনতাইয়ের কবলে পড়া 'রাফা মটরস' নামক পার্টসের দোকানের কর্মচারী ইউসুফ জানান, 'আমার বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে টাকার ব্যাগ টানাটানি শুরু করে পারভেজসহ দুই ছিনতাইকারী। পরে আমি জীবনের তোয়াক্কা না করে পারভেজকে পা দিয়ে লাথি মেরে ফেলে দেই এবং ছিনতাইকারী বলে চিৎকার করি। পরে লোকজন এসে পারভেজকে আটক করে। অপরজন পালিয়ে যায়।'
এ ব্যাপারে পূবালী ব্যাংকের এজিএম জিয়াউর রহমান টাইমনিউজবিডি'কে বলেন, চিৎকারের ঘটনায় বের হয়ে দেখি লোকজন ছিনতাইকারী পারভেজকে মারধর করছে। বিষয়টি রমনা থানা পুলিশকে জানাই।
ফ্যান্টাসিয়া মার্কেটের জিয়া মটরস নামক দোকানের মালিক জিয়া উদ্দিন টাইমনিউজবিডিকে বলেন, 'বাংলামটর এলাকার ইউনিভার্সাল মটরস এর মালিক সোহেল রানা আমার বন্ধু। তিনি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার দিন রাত সোয়া ৯টার দিকে গলি পথ দিয়ে ফেরার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হন। সে সময় তার ১৬ লাখ টাকা খোয়া যায়। ওই ঘটনায় রমনা থানায় একটি ছিনতাইয়ের মামলা করেন তিনি। ওই ঘটনার সাথেও মাসুদ পারভেজের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করেন জিয়াউদ্দিন।
এ ব্যাপারে ইউনিভার্সাল মটরস এর মালিক সোহেল রানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাইমনিউজবিডিকে জানান, ছিনতাইয়ের ঘটনার কয়েকদিন আগ থেকে আমার দোকানে কারণে অকারণে ঘোড়াফেরা করে মাসুদ পারভেজ। এ ঘটনায় বাক-বিতণ্ডাও হয়েছিল আমার সাথে। এর দু'দিন পড়েই আমি ছিনতাইয়ের শিকার হই।
তিনি জানান, এ ঘটনায় একটি ছিনতাইয়ের মামলা করেছি। পারভেজ ওই ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত বলে থানা পুলিশকে অবগত করা হয়েছে।
ফ্যান্টাসিয়া মার্কেটের সভাপতি অলি আহমেদ টাইমনিউজবিডিকে বলেন, ছিনতাইকারী নিজেকে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে দাবি করায় আমরা শঙ্কিত। দলীয় প্রভাবে জেল থেকে মুক্তি পেলে পারভেজ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করতে পারে। বিষয়টি থানা পুলিশকে অবগত করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা মটরস পার্স বিজিনেসম্যান ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সভাপতি ও রমনা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাঈদুর রহমান সাঈদ টাইমনিউজবিডি'কে বলেন, কোনো ছিনতাইকারী ছাত্রলীগ করতে পারে না। দলে ছিনতাইকারীর কোনো স্থান নেই। ধরা পড়া ছাত্রলীগ নেতার এখন পরিচয় শুধু ছিনতাইকারী। এ ঘটনায় তার সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য রমনা থানা পুলিশকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে বলা হয়েছে।
তিনি জানান, দলে এ ধরণের সুবিধাবাদী কিছু ছাত্রলীগ নেতা রয়েছেন। যারা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এসব করছেন। এ ধরণের নেতাকর্মীদের লিস্ট করা হচ্ছে। অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনগতভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
রমনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মশিউর রহমান টাইমনিউজবিডি'কে বলেন, হাতেনাতে ধরা পড়া ছিনতাইকারী ছাত্রলীগ নেতা বলে পরিচয় দিলেও সে একজন পেশাদার ছিনতাইকারী। এর আগে বিভিন্ন সময় ছিনতাইয়ের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। তবে গ্রেফতারকৃত ছিনতাইকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ছিনতাইয়ের করতে গিয়ে অস্ত্রসহ ধরা পড়ার ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি অস্ত্র মামলার প্রস্তুতি চলছে। আরেকটি মামলা হচ্ছে রাফা মটরস এর মালিকের পক্ষ থেকে। দু'টি মামলাই রোববার রাতেই দায়ের করা হবে বলে জানান তিনি। অধিকতর তদন্ত করে গ্রেফতারকৃতের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
[b]ঢাকা, জেইউ, ১৩ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর // জেআই[/b]
শ্রেণীহীন
কর্মচারি থেকে ছাত্রলীগ নেতা হয়ে যেভাবে ছিনতাইকারী
ছিলেন বাংলামটর এলাকার একটি পার্সের দোকানের কর্মচারি। এরপর লবিংয়ে রাতারাতি রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তারপর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে হয়ে উঠেন ভয়ঙ্কর ও পেশাদার ছিনতাইকারী। বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইয়ের ঘটনায় তার নাম আসলেও অজ্ঞাত কারণে রয়ে যান ধরা ছোঁয়ার বাইরে।





