ঢাকা: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল কাদের মোল্লা ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী জেল খানায় থাকা অবস্থায় প্রয়োজনীয় সব কিছু জেল কোন অনুযায়ী হলেও ফাঁসি কার্যকর কেন জেল কোড অনুযায়ী হবে না এমন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন তার পরিবারের সদস্যরাসহ আইনজীবীরা।

মোল্লাপুত্র হাসান জামিল বলেছেন,আমার বাবা কারাগারে থাকতে সব কিছু জেল কোড অনুযায়ী হয়েছে। শেষ মুর্হতে এসে কেন জেল কোন মানা হচ্ছে না।

তিনি বলেন,জেলে থাকা অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি,আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাৎ,তাকে বিভিন্ন কাগজপত্র সরাবরাহ,ডিভিশন প্রদান সবকিছুই জেল কোড মেনে করা হয় সেজন্য ট্রাইব্যুনাল জেল কর্তৃপক্ষকে বেশ কয়েকবার লিখিত আদেশও  দিয়েছেন। অথচ এখন সরকার বলছে জেল কোড মানা হবে না।

জেল কোড মানার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরে জেল কোড প্রযোজ্য নয়। তিনি বলেন,সংবিধানের ৪৭ ধারা মতে জেল কোড এখানে অ্যাপ্লিকেবল (প্রযোজ্য) নয়। যা আমি বার-বারই বলে আসছি।

তবে তার আগে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহাবুব হোসেন তিনি বলেন, কাদের মোল্লার দণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে কারা বিধি প্রজোয্য। তিনি বলেন, রায় কার্যকর করতে আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে ডিসমিসের আদেশ দিয়েছেন তাতে যে পর্যবেক্ষণ রয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরে কারা কর্তৃপক্ষ কাদের মোল্লার রায় কার্যকর করবেন।

তিনি বলেন, জেল কোড অনুযায়ী ২১ থেকে ২৮ দিনের মাধ্যে রায় কার্যকর করতে পারবেন। বার কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের জবাবে তিনি, তারা বিচার প্রক্রিয়াকে ভুল ব্যাখা করছেন।

তিনি বলেন, কাদের মোল্লার মৃত্যু পরোয়ানা সঠিক হয়েছে কারণ সুপ্রিমকোর্ট কারো মৃত্যু পরোয়ানা পাঠায় তার নজির কোথাও  নেই।

আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিন্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আইন অনুযায়ী কাদের মোল্লার রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সময়ও আগামী ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তাই ২৩ ডিসেম্বরের আগে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই।

রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করবেন, কী করবেন না-এবিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কাদের মোল্লা এখনও জানাননি বলেও জানান ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

তিনি বলেন, এখন যদি আব্দুল কাদের মোল্লাকে সরকার জেল কোড না মানেন তাহলে তা হবে অন্যায়। আর এই বিচার প্রক্রিয়া যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এটা তারই প্রমাণ।

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকে তাজুল ইসলাম বলেন, গ্রেফতার থেকে শুরু এ পর্যন্ত সবকিছু জেল কোড অনুযায়ী হয়েছে। আর এখন আইসিটি আইন দেখিয়ে সরকার জেল কোড ব্যাতি রেখে রায় কার্যকর করতে চাচ্ছে।

তিনি বলেন,জেল কোডের বাইরে গিয়ে রায় কার্যকর করা হলে তা হবে বর্বরতা। এটি হবে জঙ্গলি শাসনের আলামত। তিনি বলেন,ফাসিঁ কার্যকর করতে জেল কোড মানতেই হবে।

আসামীপক্ষের এই আইনজীবী বলেন,২০১০ সালের ১৩ জুলাই আব্দুল কাদের মোল্লাকে গ্রেফতার এবং পরবর্তীতে জেলখানায় থাকা অবস্থায় তার ক্ষেত্রে সবকিছুই জেলকোড মেনেই করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরাও তার ক্ষেত্রে তখন জেলকোড প্রয়োগের বিরোধীতা করেননি। কিন্তু আব্দুল কাদের মোল্লার রায় পরবর্তী কার্যক্রম জেল কোড অনুযায়ী মেনে নিতে চাচ্ছেনা সরকার পক্ষ।

তিনি অভিযোগ করে বলেন,আব্দুল কাদের মোল্লার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের জন্যই জেল কোড মানতে চাচ্ছে না।

এ সময় তিনি কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে জেলকোড মেনে চলার বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পাশ করা  কয়েকটি আদেশ তুলে ধরেন-

গত বছর ৮ নভেম্বর বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে হাসপাতালের চিকিৎসা বিষয়ে জেল কর্তৃপক্ষ জেল কোড অনুযায়ী ঠিক করবেন মর্মে আদেশ দেন। তাকে জেলে রেখে চিকিৎসা করাবেন না হাসপাতালে পাঠানোর দরকার আছে। এটা তারাই ঠিক করবেন।

এছাড়া একই দিন কাদের মোল্লার সাথে তার আইনজীবীদের সাক্ষাতের বিষয়ে আদেশ দেন।

আদেশে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন আসামিপক্ষের দুইজন আইনজীবীর সাথে আসামীর প্রিভিলেজড কমিউিনিকেশনের ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হল। এসময় তাদের সাথে অন্য কেউ উপস্থিত থাকেবনা। নিরাপত্তারক্ষী থাকবে তবে সে দেখবে। তাদের মধ্যকার কথা শুনতে পারবেনা। এছাড়া ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল প্রিভিলেজ বিষয়ে আরেকটি আদেশ দেন।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বাংলাদেশে যে যত বড়ই অপরাধী হউক না কেন সকলের ক্ষেত্রেই আইন সমান। আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে তা হবে না। ওনার ক্ষেত্রে জেল কোড না মেনে সরকার চাচ্ছে তাদের স্বৈরাচারির স্বরূপ দেখাতে চাচ্ছে।

তিনি বলেন, জেল কোড না মানলে গনগণের মনে সব সময় একটা প্রশ্ন থেকেই যাবে।

ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাভোকেট জেয়াদ আল মালুম বলেন, ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী এই ব্যক্তির কোনো অধিকার পাওয়ার ক্ষমতা নাই। সেখানে এই ব্যক্তি জেল কেডের অধিকার থেকেও কোন অধিকার পাবে না।

তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী রায় কার্যকর করবে সরকার, কারা কর্তৃপক্ষ নয়। সুতরাং আব্দুল কাদের মোল্লার রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে কারা বিধি মানার কোন আইন নাই।