আবদুর রশিদ। হালে সমালোচিত ও আলোচিত। নাম লেখিয়েছেন কোটিপতির তালিকায়। তার নামে বেনামে রয়েছে কোটি টাকার সম্পদ। তিনি আর কেউ নন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। সবাই তাকে সমীহ করে চলেন। অনেক কর্মকর্তাও তাকে হালে সালাম দেন। আপ্যায়ন করেন। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দাবরিয়ে বেড়াচ্ছেন গোটা সিটি করপোরেশন। তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর পাশাপাশি সরকারদলীয় শ্রমিক লীগের নেতাও তিনি।
প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে চলেন। কাজ ভাগিয়ে নেন হরহামেশা। শাসান অনেককে। হুমকি ধামকি তার কাছে মামুলি ব্যাপার। রশিদের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে ডিএনসিসির প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সচিব, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভাগীয় প্রধান এবং সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও অতিষ্ঠ। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে নানা প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনেরও অভিযোগ রয়েছে।
গত ২১ এপ্রিল শ্রমিক লীগের নেতা আবদুর রশিদের অস্বাভাবিক ক্ষমতার রশি টেনে ধরতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন মোহাম্মদপুরের আবদুর রব নামে জনৈক ব্যক্তি। ওই ব্যাক্তির দায়ের করা আবেদনে শ্রমিক লীগ নেতা রশিদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সুনিদিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আর এই অভিযোগগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তিনি অনুলিপি পাঠিয়েছেন, দুদক চেয়ারম্যান, এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ এবং ডিএনসিসির প্রশাসকের দফতরে।
ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আবদুর রশিদ নিজে মোটর সাইকেল চালাতে পারেন না। অথচ গত বছর ডিএনসিসি থেকে একটি নতুন মোটর সাইকেল (ঢাকা মেট্রো-ল -২৩-৭৭৮৩) নেন। পরে নগদ ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় ওই মোটর সাইকেলটি বিক্রি করেন মোহাম্মদ হোসেন নামে অপর এক কর্মচারীর কাছে। বর্তমানে ওই মোটর সাইকেলটি চালান হোসেনের ছেলে। কিন্তু দুর্নীতি পরায়ন ও অর্থলোভী রশিদ প্রতি মাসে ৩০ লিটার জ্বালানি তেলের টাকা উত্তোলন করেন ডিএনসিসির পরিবহন শাখা থেকে।
শ্রমিক লীগ নেতা রশিদ গত বছর ডিএনসিসির চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত পোশাক, জুতা ও ছাতার বরাদ্দকৃত টাকার ৩৫ শতাংশ কমিশনের নামে হাতিয়ে নেন।
অভিযোগ পত্রে রশিদের উত্থান সম্পর্কে বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সাল থেকে ডিসিসির গুলশানের রাজস্ব বিভাগের ট্রেড লাইসেন্স শাখায় বহিরাগত দালাল হিসেবে কাজ শুরু করেন এই রশিদ। ২০০৫ সালে বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরীর সুপারিশে রশিদ ডিসিসিতে লেজারকিপার পদে চাকরি পান। ২০০৬ সালে তিনি ট্রেড লাইসেন্স শাখায় সুপারভাইজার পদে বদলি হয়ে আসেন।
২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনে টাঙ্গাইলে বিএনপি নেতা সাবেক মন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসানের পক্ষে মাঠে ময়দানে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। কিন্তু ওই নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার সাথে সাথে রাতারাতি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের হাতে পায়ে ধরে শ্রমিক লীগের কর্মী পরিচয় দেন।
তবে ২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন বিভক্তির পর হুট করে রাতারাতি ডিএনসিসি শ্রমিক কমচারী লীগের একটি কমিটি তৈরি করেন। আর ওই কমিটির সভাপতি হন রশিদ। অথচ এর আগে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ডে তাকে দেখা যায়নি। বর্তমানে এমন কোনো অপকর্ম নেই যা আবদুর রশিদ করেন না।
ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ডিএনসিসির ট্রেড লাইসেন্স শাখার সুপারভাইজার রশিদ কৌশলে মহাজোট সরকারের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গির কবির নানক এমপি, বর্তমান মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান এমপি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের খুব কাছের লোক হয়ে যান। এরপরই প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি এবং নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে শুরু করেন ব্যাপক চাঁদাবাজি প্রতারণা এবং জালিয়াতি। চোখের পলকে শত কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন।
একই সাথে পাল্টে যায় তার আগের সেই ভদ্র নম্র আচরণ এবং শুরু হয় তার রাজকীয় জীবনযাপন। অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ৪টি ওয়ার্ডের ট্রেড লাইসেন্স সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে নেন। তার টেবিলে সার্বক্ষণিক ৪/৫ জন বহিরাগত দালাল কাজ করে। এর মধ্যে তার ভাগ্নে এবং শ্যালক রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত বছর শতাধিক ব্যবসায়ীর ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের নামে প্রায় ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। গত এপ্রিলে এই বিষয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে মেসার্স ন্যাচারাল ইলেকট্রিক এন্ড কোং-এর মালিক শহিদুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দফতরে অভিযোগ করেন।
শ্রমিক লীগ নেতা রশিদ বহিরাগত দালালদের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্সের নির্ধারিত ফি-এর কয়েকগুণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এই দালালরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৭০০ টাকার ট্রেড লাইসেন্সের জন্য হাতিয়ে নিচ্ছে ৫ হাজার টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা। তিনি প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
শ্রমিক লীগের নেতা পরিচয়ে রশিদ নিজের কর্মস্থলে হাজিরা খাতায় সই করেই তার টেবিলের চারদিকে দালালদের বসিয়ে রেখে বেরিয়ে পড়েন নানাবিদ তদবিরে। নেতা রশিদ সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন নগর ভবন এবং ৫টি আঞ্চলিক কার্যালয়ে। সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানা অপবাদ দিয়ে হয়রানিমূলক বদলির জন্য প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ক্লিনার থেকে কর্মচারীদের নিয়োগ, পদায়ন,বদলির ক্ষেত্রে ৩/৪ লাখ টাকা নেন এই নেতা রশিদ। ছাড়া ক্রয় ও ভান্ডার বিভাগ এবং রাস্তা, ড্রেন উন্নয়ন কাজের বেনামে ঠিকাদারিতে হস্তক্ষেপ রয়েছে তার। তার নগ্ন হস্তক্ষেপের ফলেই প্রশাসন গত বছর ১১ জন রোড ইন্সপেক্টরকে সাবেক পদে নামিয়ে দিয়ে আদেশ জারি করতে বাধ্য হয়েছে।
শুধু তার সাথে মতবিরোধের কারণে বেশ কয়েকজন প্রকৃত শ্রমিক লীগের কর্মীর চাকরি খাওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। এখন আবার ওই ১১ জনের মধ্যে নাসিম, কমল কৃষ্ণ, আকরাম, মোরসালিন, মাহতাবসহ ৭/৮ জনের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছেন আবদুর রশিদ।
শ্রমিক লীগ নেতা রশিদ, তার স্ত্রী এবং আত্মীয় স্বজনদের নামে-বেনামে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ করেছেন। এর মধ্যে রাজধানীর খিলক্ষেত (আশকোনা) এলাকায় জমি, টাঙ্গাইল শহরে জমি, বাড়ি, গ্রামে জমি এবং দোকান ,প্লটসহ ব্যাংক ব্যালেন্স রয়েছে। সরেজমিন তদন্ত হলে বেরিয়ে আসবে তার রাজকীয় জীবন যাপন এবং অবৈধ সম্পদের অনেক অজানা কাহিনী।
এ ব্যাপারে আবদুর রশিদ টাইমনিউজবিডি'কে বলেন, 'আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পুরো সত্য নয়। আমার প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেছে। এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না এবং আমি কিছুই বলব না।'
[b]ঢাকা, একে, ১২ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর[/b]
শ্রেণীহীন
কোটিপতি কর্মচারী!
আবদুর রশিদ। হালে সমালোচিত ও আলোচিত। নাম লেখিয়েছেন কোটিপতির তালিকায়। তার নামে বেনামে রয়েছে কোটি টাকার সম্পদ। তিনি আর কেউ নন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দাবরিয়ে বেড়াচ্ছেন গোটা সিটি করপোরেশন। তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর পাশাপাশি সরকারদলীয় শ্রমিক লীগের নেতাও তিনি





