সুন্দরী বিমানবালা আফরোজা ইসলাম সূচির মৃত্যু রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। একাধিক প্রেমের ফাঁদে আটকা পড়েছিল সূচি। নিজে থেকেই কাউকে ভালবেসেছে আবার কেউ তাকে জোর করে কাছে পেতে চেয়েছে। আবার কেউবা সূচির গভীর প্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।
এই ত্রিমুখী প্রেমের কাছে পরাজিত হতে হয়েছে সূচিকে। সূচি নিজে থেকে যার প্রতি অনুরক্ত ছিল, তাকে ভালবেসেছিল উজার করে। ভালবাসার সেই মানুষটিই কিনা তাকে বিয়ে না করে অপর এক সুন্দরী নারী চিকিৎসককে বিয়ে করে ফেলে।
এ নিয়ে চলে নিজের মানুষটির সাথে দীর্ঘ টানাপড়েন। আবার যারা তাকে পেতে চেয়েছিল তারাও সুযোগ বুঝে কাছে পেতে মরিয়া হয়ে উঠে। এমনি পরিস্থিতিতে মনের অবস্থা বেসামাল হয়ে পড়ে সূচির। শেষে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার পথই বেছে নেন তিনি। পরিবার, পুলিশ ও নিকট আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিহত সূচির নিকটাত্মীয় জানান, নিজে থেকে একজনের প্রতি অনুরক্ত থাকা স্বত্বেও অপর কয়েকজনের চাপে পড়ে একাধিক প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল সূচি। নিজের ভালবাসার মানুষটি যখন প্রতারণা করে বসে তখন সবার প্রতি অবিশ্বাস জন্মে সূচির মনে। তাই নানামুখী প্রেম ও প্রতারণার চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন সূচি।
সূচির ওই আত্মীয় আরও জানান, বিমানবালা হিসেবে সূচির চেহারা ছিল আকর্ষণীয়। সুন্দরী হওয়ায় প্রথম দেখাতেই অনেকে সূচির প্রেমে পড়ে যেত। এমনকি বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া স্বামী মোবারকও তাকে পুনরায় ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। এসব কারণেই সূচী শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার মতো কঠিন পথটি বেছে নেয়।
গেল সপ্তাহের বুধবার দুপুরে উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর রোডের ৪০ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের তৃতীয় তলায় সবার অগোচরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
ঘটনার তদারককারী উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আলী মাহমুদ বলেন, এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা (ইউডি) হয়েছে। পুলিশ সূচির মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, লন্ডন প্রবাসী মোবারক নামে এক যুবকের সঙ্গে টেলিফোনে বিয়ে হয় সূচির। কিন্তু মাস খানেক না যেতেই বিচ্ছেদ ঘটে তাদের। কিন্তু এরপরও মোবারক তার পিছু ছাড়েনি। সূচির প্রতি মোবারক দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাই বিবাহ বিচ্ছেদের পরেও সময়ে অসময়ে সূচিকে বিরক্ত করতেন তিনি। নানাভাবে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের জন্য চাপও দিতেন। এমনকি এয়ারপোর্ট এলাকায় গাড়িতে উঠানো নিয়ে টানাহ্যাচরার ঘটনাও ঘটায় মোবারক। বিচ্ছেদের পরও মোবারক সূচিকে নিজের স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন।
অন্যদিকে মোবারকের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ইউনাইটেড এয়ার লাইন্সে বিমানবালার দায়িত্ব পালনকালে কেবিন ক্রু মোর্শেদের সঙ্গে পরিচয় হয় সূচির।
একপর্যায়ে দু’জনে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু প্রেমিক মোর্শেদ সূচির ভালবাসার সাথে প্রতারণা করেন। মোর্শেদ সূচির সঙ্গে প্রেম করার পাশাপাশি আরও এক নারী চিকিৎসকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যান।
মোর্শেদের সাথে ওই চিকিৎসক প্রেমিকার সম্পর্ক শারীরিক পর্যায়েও পৌছায়। একদিন মোর্শেদকে ডেকে পেটে মোর্শেদের সন্তান থাকার কথা জানান ওই নারী। ফলে ওই নারীকে বিয়ে করতে বাধ্য হন মোর্শেদ।
হঠাৎ করে মোর্শেদের প্রতারণার এসব জেনে দিশেহারা হয়ে পড়েন বিমানবালা সূচি। মনের ভেতরে প্রতারিত হওয়ার তীব্র যন্ত্রণা বয়ে বেড়ায়। নিজের সম্পর্কে মায়ের সাথে সব কথা বলতেন সূচি। কিন্তু সূচি প্রেমে প্রতারিত হওয়ার কষ্ট মাকে জানাননি। এই সূত্রের দাবি, মোর্শেদের প্রেমে প্রতারিত হয়েই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন সূচি।
অপর এক সূত্র জানায়, শুধু মোর্শেদ নয়, প্রভাবিত হয়ে আরও একজনের প্রেমে পড়েছিলেন সূচি। গত বছরের জুন মাসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যোগদান করেন কেবিন ক্রু মির্জা আদনান নামে এক যুবক।  প্রথম পরিচয়ে আদনান সূচির সৌন্দর্যে পাগল হয়ে প্রেমে জড়ানোর চেষ্টা করেন। প্রথমে বিরক্ত হলেও এক সময় আদনানের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন সূচি। একদিকে মোর্শেদ আরেক দিকে আদনানের নতুন প্রেমের হাওয়া। আর সাবেক স্বামীর পেছনে লেগে থাকা এসব মিলিয়ে ত্রিমুখী প্রেমের ফাঁদে আটকে যান সূচি। মোর্শেদের প্রতারণায় নিজের জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এসে যায় সূচির।
আদরের সন্তানহারা পাগল প্রায় মা সুলতানা ইসলাম খান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'আমার মেয়ে সব কথাই শেয়ার করতো। কোনো কিছুই আমাকে না জানিয়ে থাকতে পারতো না। কিন্তু সেই মেয়ে কিছুদিন হলো আমাকেও এড়িয়ে যায়। কিছু জানতে চাইলে জানাতো না।'
সূচির মা বলেন, গেল সপ্তাহের মঙ্গলবার সূচি আমাকে মুঠোফোন কল করেছিল। মনটা খুব ভার অনুভব করলাম। জিজ্ঞেস করতেই কেঁদে বলেছিল ‘মা তোমাকে খুব মিস করছি’। হাজারবার জিজ্ঞেস করেও কিছু জানায়নি আমাকে। অনুভব করেছিলাম মেয়েটার বুকভরা যন্ত্রণা ছিল। এই যন্ত্রণা সইতে না পেরেই সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।
উত্তরা পশ্চিম থানা সূত্রে জানা গেছে, বিমানবালা সূচির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার শুক্রবার দুপুরে একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়েছে। সূচির মা সুলতানা ইসলাম বাদী হয়ে এ মামলাটি করেন।
উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মোহাম্মদ আলী মাহমুদ টাইম নিউজবিডিকে জানান, মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে তদন্ত কাজ চলছে। এ জন্য ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তদন্তের অংশ হিসেবে সূচির কথিত প্রেমিক মাহবুব মোর্শেদ, মির্জা আদনান, বান্ধবী লিকমাকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
জানা গেছে, ঘটনার পর থেকে নজরদারির কারণে এক প্রকার ‘গৃহবন্দী’ অবস্থায় দিন কাটছে সূচির কথিত প্রেমিক মোর্শেদের। উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর রোডের ২২ নম্বর ভবনের বাসায় থাকেন মোর্শেদ। বাসার নিরাপত্তাকর্মী হাবিব জানায়, স্যার (মোর্শেদ) ক'দিন ধরে অসুস্থ। কারও সঙ্গে যোগাযোগ বা কথা বলছেন না। পরে আসতে হবে।
অন্যদিকে আদনানও সময় বুঝে গা ঢাকা দিয়েছে। যে মোবাইল ফোন নাম্বারটি তার চালু ছিল তাও পরিবর্তন করেছে।
[b]ঢাকা, জেইউ, ২২ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // এআর
[/b]