হত্যা, গুম ও অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের বিরুদ্ধে হরহামেশাই আসছে নানান অভিযোগ। পুলিশ, র্যাব, ডিবি ও বিজিবিসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্তূপ জমা পড়ছে স্ব স্ব কার্যালয়ে। এসব অভিযোগ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, কেন, কি কারণে বা কাদের সাহায্যে এসব অপরাধ প্রবণতার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে। কর্মকর্তারা আরও বলছেন, এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ছাড়াও নানান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। অপরাধ দমনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের কিছু কর্মকর্তা নিজেরাই অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রমাণও মিলছে বিভিন্ন মহলে।
বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে নানা তথ্য। সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভাটারা থানার এক এসআই ও অপর একজন এএসআই, পল্লবী ও কাফরুল থানার একজন করে এসআই ও এক এএসআইকে দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ভাটারা থানার ওই দুই এসআই ও এএসআই-এর বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও দায়ের করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপরাধ দমনে যাদের নিয়োগ দেয়া হয় তারা নিজেরাই যদি অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তবে অপরাধ কমাবে কারা? এমনটি চলতে থাকলে অপরাধ বাড়বে বৈ কমবে না। এতে অন্য অপরাধীরা অরাধকর্মে উৎসাহিত হবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
র্যাবের হিসেব মতে গত এক বছরে ১১৯ জন অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০ জন শিশু ছিল। এসব অপহরণের ঘটনায় জড়িত ১৮৪ কিডন্যাপারকে আটক করেছে র্যাব।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, যেসব আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অপরাধকর্মের কারণে চাকুরিচ্যূত হয়েছে তাদেরই এসব অপহরণের ঘটনায় সংশ্লিষ্টা বেশি প্রমাণ হচ্ছে।
শিশু অপহরণ: গত ১৯ জানুয়ারি রাতে সাভারের বলিয়ারপুরে শিশু অপহরণকারী গ্রেফতারে ফাঁদ পাতে ঢাকা জেলা ডিবি পুলিশ। ওই ফাঁদে ধরা পড়েন কাফরুল থানার এসআই মনির হোসেন ও এএসআই জাহিদ হোসেন! ওই রাতেই পুলিশের এ দুই কর্মকর্তাকে কাফরুল থানায় হস্তান্তর করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় কাফরুল থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়। এর কয়েক দিন পর অভিযুক্ত পুলিশের ওই দুই কর্মকর্তাকেও প্রত্যাহার করা হয়। ঘটনাটি বর্তমানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত করছেন।
ছাত্র অপহরণে কাফরুল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ওয়াজেদ আলীসহ দুই জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
ব্যবসায়ীপুত্র শফিকুল অপহরণ: রাজধানীর ব্যবসায়ী পুত্র মিরপুর-১-এ বেসরকারি প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ কৌশল (ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের ছাত্র শফিকুল ইসলাম গত ১৯ জানুয়ারি অপহৃত হন। ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেয়ার পর গত ২৩ জানুয়ারি বিকাল পাঁচটায় মুক্তি পান তিনি।
গোয়েন্দা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই অপহরণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন খোদ পুলিশের একাধিক সদস্য। অপহরণের শিকার শফিকুল ইসলামের পিতা ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম টাইম নিউজবিডি’কে জানান, গত ১৯ জানুয়ারি সকালে একটি ফোন পেয়ে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। রাত পৌনে আটটায় অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি ছেলের মোবাইল ফোন থেকে তাঁকে বলেন, ছেলেকে আটক করা হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে ৫০ লাখ টাকা দিতে হবে। তা না হলে ছেলেকে হত্যা করা হবে।
গোয়েন্দ পুলিশ সূত্র জানা যায়, ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ এ ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারে অপহরণকারীদের সঙ্গে কাফরুল থানার পুলিশের একটি দলের যোগসাজশ ছিল। অপহরণ বাবদ টাকা আদায় করার জন্য চাকরিচ্যুত এক আনসারকে ব্যবহার করেন তারা।
অন্যদিকে র্যাব এঘটনায় ছয় জনের একটি ভূয়া ডিবির দলকে আটক করে। এরপর র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ওই ছয় জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারেন, তাদের দলনেতা হলেন কাফরুল থানার এসআই শেখ মনিরুজ্জামান। তাঁর সঙ্গে আছেন সহকারী এসআই জাহিদুর রহমান, কনস্টেবল মনির, কনস্টেবল জাবেদ মিয়া ও চাকরিচ্যুত আনসার সদস্য ফারুক মল্লিক।
এব্যাপারে মিরপুর অঞ্চলের উপকমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ টাইম নিউজবিডিকে জানান, কাফরুল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী ওয়াজেদ আলী ও উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এসআইয়ের সঙ্গে থাকা এক সহকারী উপপরিদর্শক ও দুই কনস্টেবলের ব্যাপারে তদন্ত হচ্ছে।
থানায় পুলিশ হেফাজতে জনি হত্যা: অন্যদিকে গত ৯ ফেব্রুয়ারি পল্লবী থানা পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় মো. জনি নামের পল্লবী বিহারি ক্যাম্পের এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। জনি বিহারি ক্যাম্পে বসবাসকারী মো. মোস্তফার ছেলে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে জাহিদুল ইসলাম নামের পল্লবী থানার এক এসআই জনিকে ধরে নিয়ে থানায় পিটিয়ে হত্যা করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের খাতায় জনির মৃত্যু সম্পর্কে 'শারীরিক আঘাত'-এর কথা উল্লেখ করেছেন চিকিৎসক।
নিহত জনির চাচা হায়দার আলী জানিয়েছেন, জনি একসময় জাহিদ দারোগার (এসআই জাহিদুল) ব্যক্তিগত মাইক্রোবাস চালাত। বেতন কম হওয়ায় এক বছর আগে চাকরি ছেড়ে দেয়। মাসখানেক আগে জাহিদ দারোগা আবারও জনিকে তার গাড়ি চালাতে বলেন। জনি এতে রাজি না হওয়ায় দারোগা তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এর কয়েক দিন পর ওই দারোগা জনিকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলেন। এঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। তবে তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে আর কিছু জানা যায় নি।
ভাটারা থানা পুলিশের চাঁদাবাজি: অন্যদিকে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভাটারা থানার এএসআই সজল কান্তি হীরা নূরেরচালা বাজার থেকে জাহাঙ্গীর মিয়া উজ্জ্বল নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে থানার এসআই মো. ইসরাইলের কাছে নিয়ে যান। এসআই ইসরাইল উজ্জ্বলকে ছেড়ে দিতে তার কাছে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। না দিলে তাকে থানায় নিয়ে ক্রসফায়ারে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় এবং চাঁদার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজারে। একপর্যায়ে উজ্জ্বল ২০ হাজার টাকা দিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষরের পর থানা থেকে মুক্ত হন।
১৩ ফেব্রুয়ারি উজ্জ্বল আদালতে পুলিশের ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে ডিবি পুলিশের উপকমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ভাটারা থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মামলা হওয়ার পর পুলিশের ওই দুই কর্মকর্তাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে গুলশান বিভাগের উপকমিশনারের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এব্যাপারে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ইসরাইল টাইমনিউজবিডিকে বলেন, তিনি অভিযোগকারী ব্যক্তিকে চেনেন না। ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ সত্য নয়।
ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ: নারায়ণগঞ্জের ঠিকাদার ও যুবলীগ নেতা আবু সুফিয়ান এবং তার দুই জন সহযোগীকে ডিবি পুলিশ গুম করে বলে অভিযোগ উঠে। তবে পরে শুধু আটক করার বিষয়টি স্বীকার করে পুলিশ।
ঘটনার পর নিখোঁজ পারভেজের স্ত্রী সোহানা বেগম গুলশান থানায় প্রথমে জিডি পরে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা দায়ের করে। মামলা দায়ের হওয়ার পর গুলশান থানা পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, থানার একটি অপহরণ ও গুমের মামলায় করা সুনির্দিষ্ট অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের আটক করা হয়েছে।
ঢাকা ডিবির উপ কমিশনার (ডিসি) শেখ নাজমুল আলম পিপিএম জানান, সুফিয়ান গুম হয়েছে বলে যে দাবি তোলা হয়েছে তা সত্য নয়। আবু সুফিয়ানকে গুম করা হয়নি। গুলশান থানার একটি অপহরণ ও গুমের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই সুফিয়ানকে আটক করা হয়েছে।
তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সুফিয়ানকে উঠিয়ে আনার পর বিষয়টি সদর মডেল থানার ওসিসহ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চকে অবহিত করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
তবে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত বছরের ৬ জুলাই ঢাকার গুলশানের ২নং এভিনিউ থেকে ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন সাদা পোশাকদারী নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবলীগের বহিস্কৃত প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক জহিরুল ইসলাম ভূইয়া
পারভেজকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এর থেকেই তিনি নিখোঁজ।
থানা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে সাংবাদিকের রহস্যজনক মৃত্যু: গত রোববার উত্তরা পশ্চিম থানা ভবনের(৭ তলা) ছাদ থেকে পড়ে শাহ আলম সাগর (৪০) নামে এক সাংবাদিকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। রোববার পৌনে ৮ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শাহ আলম সাপ্তাহিক ‘অপরাধ দমন’ নামের একটি পত্রিকার প্রতিবেদক ছিলেন।
নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শাহ আলমকে থানা ভবনের ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে। পড়ে যাওয়ার সময় শাহ আলম বাঁচাও বাঁচাও বলে স্বজোরে চিৎকার করে বলে জানান নিহতের প্রত্যক্ষদর্শি বন্ধু নজরুল ইসলাম।
এব্যাপারে উত্তরা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার(এসি) সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, থানার ভবনের ছাদ থেকে পড়ে শাহ আলম মারা গেছে।
উত্তরা ট্রাষ্ট কলেজের অধ্যক্ষ বশির আহমেদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের জের ধরে দু'জনেই পরস্পরের বিরুদ্ধে চলতি মাসে উত্তরা পশ্চিম থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।
এরই সূত্র ধরে থানার এক উপ পরিদর্শক রোববার সন্ধ্যার পর দুই জনকে ঘটনাটি মীমাংসার জন্য থানায় আসতে বলেছিলেন। কিন্তু পুলিশের যোগসাজশে শাহ আলমকে ধাওয়া দিয়ে ছাদে উঠানো হয়। এরপর ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তরা পশ্চিম থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা। এনিয়ে চরম বিপাকে রয়েছে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ।
এ বিষয়ে ডিএমপির মুখপাত্র এবং মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। যেসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। প্রচলিত আইনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। তবে অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপর মিথ্যা দায় চাপানো হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ঢাকা, জেইউ, ৩ মার্চ ( টাইমনিউজবিডি.কম ) //এসআর





