ঢাকা: পরিস্থিতি চমৎকার। বাংলাদেশের ভাগ্য আর জনগণের হাতে নাই। বিদেশীদের কাড়াকাড়ি এখন ওপেন সিক্রেট। প্রকাশ্যে কুস্তি শুরু হয়েছে আঞ্চলিক শক্তি ভারত ও আন্তর্জাতিক শক্তি আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকদের মধ্যে।
ফলাফলও মিলছে নগদেই। শুক্রবার দুপুরেই জুমার নামাজ পড়েন এমন অভিজাত রাজনীতিকরা নৈশ অবসরের আয়েশ করতে পারছেন না। আতঙ্ক আর শিহরনে রজনীর নিরবতা ভাঙছে। ব্যস্ত সময় কাটছে গোয়েন্দা পুলিশের।
তারা চোখের পলকে পাকড়াও করেছেন বিএনপির যুক্তরাষ্ট্রপন্থী ছয় শীর্ষ নেতাকে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিঞা, এমকে আনোয়ার, আবদুল আওয়াল মিন্টু, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। সবার ঠিকানা মিন্টু রোডের গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়।
জাতীয় প্রেসক্লাবে আটকা পড়েছেন রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ। যেকোনো মুহূর্তেই গ্রেফতার হচ্ছেন তিনি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সটকে পড়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সাদেক হোসেন খোকা, আবদুল মান্নান, জয়নুল আবদিন ফারুক, আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম, এস এম জাহাঙ্গীরসহ কমপক্ষে ত্রিশ জন।
গ্রেফতারের রটনা থেকে ঘটনার আকষ্মিকতায় নিক্ষিপ্ত বিরোধী নেতাদের রাত কাটছে অজ্ঞাত ঢেরায়। তারা কি ভীতি, মনস্তাপে পুড়ছেন? নাকি লোভের ইশারা পেয়ে ঘামছেনও?
রোববার নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হলে তারা কি করবেন? অনেক হয়েছে মেনে নির্বাচনের পথে আসবেন, নাকি হরতালে গা ঝাড়া দেবেন? শনিবার সকাল থেকেই জবাব মিলবে আরো সব প্রশ্নের।
উৎকন্ঠায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। এখন আর পদত্যাগ ও সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকারে না থাকা নিয়ে অভিমান নয়। সব সময় বিরোধীদের দমনের চিরাচরিত শিহরন তাদেরও স্পর্শ করেছে।
সরকারি শিবিরে কিছুটা স্বস্তিও। অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠার মাঝে ফের তুফান হতে যাচ্ছিলো হেফাজতে ইসলাম। আঞ্চলিক শক্তির সাথে শেকড়ের সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক শক্তির সাথে কৌশলগত মৈত্রী। দোটানায় আছে হেফাজত। আপাতত ১৫ নভেম্বর শাপলা চত্বরে সমাবেশ হচ্ছে না।
ছায়াযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত বিরোধী দলকে বেশ সুবিধা এনে দিতে পারতো হেফাজতের সমাবেশ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গেলেন কওমী তালবে এলেমরা। তাদের উস্তাদরা এবার সচেতন। সবার আগে বিপদে সাহায্য পাওয়া নিশ্চিত হতে চান। কাজেই সময় নিচ্ছেন।
হেফাজত সময় নিলেও তাড়ার মধ্যে আছেন ভারত সমর্থিত সরকার পক্ষ। ২৫ অক্টোবর সামলানো গেছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতির প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নিতে না পারা বিরোধী পক্ষকে ভেতর থেকেই কমজোরি করা গেছে।
কিন্তু পর্দার আড়ালের কী গুরুত্ব আছে, যদি না মঞ্চ মাতানো না যায়? সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে না হয় সমঝোতা না হলো। সংবিধান প্রশ্নে তো দৃঢ়তা দেখাতে হবে।
জোর থাকলেও বহাল সংবিধানের চৌদ্দটা ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ফতোয়া দিয়ে সময় নষ্ট করলে ঝুঁকি রয়েছে। ঝুঁকি মতলবি হওয়ার চেয়ে সয়ংক্রিয় হওয়ার শঙ্কা বেশি। রাষ্ট্রযন্ত্র অচল থাকে না।
কাজেই পথ একটাই নির্বাচন। তার আগে পথ পরিষ্কার হতে হবে। হোক না নিষ্ক্রিয়, খেলার মাঠেই তো ঝিমাচ্ছে বিরোধীরা। কাজেই এক তরফা নির্বাচনের জন্যও লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে।
তাত্ত্বিকভাবে কৌশলটা 'শক এন্ড অ'। বড়ো ধরনের হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষকে স্তম্ভিত করে দেয়া। নিষ্ঠুর কৌশল। ঝুঁকিপূর্ণও বটে। তবে এতে হাতেনাতে ফল পাওয়া যায়। খুব কম সময়ের মধ্যে কাঠামোগত সঙ্কটে ফেলা যায় প্রতিপক্ষকে।
হরতালে প্রাণহানি হয়েছে। পুলিশের গুলি ও বিরোধীদের আগুনে যদিও। এসব মামলায় গ্রেফতার দেখালে পদ্ধতিগত সঙ্কট তৈরি হয়। যা কাঠামোগতভাবে প্রতিপক্ষকে ফোকলা করে দেয়। দাঁতই নাই যখন আপেলের খোসাও নারকেলে মালা যেন তখন।
আমরা স্মরণ করতে পারি মরহুম কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদকে। পাজামা-পাঞ্জাবী পড়তেন। খেতে পছন্দ করতেন ডাল, টাকি মাছের ভর্তা আর মোটা চালের ভাত। সাদাসিধে রাজনীতিক হলেও ফরহাদ ক্ষমতার পিঠায় বড় কামড়ই দিতে চেয়েছেন সারা জীবন।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ফরহাদের কৌশল। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দেড়শ' করে তিনশ' আসনে লড়বেন। স্বৈরাচারী এরশাদের নিশ্চত পরাজয়। বিজয়ী হলে দুই নেত্রীর কাছ থেকে পঞ্চাশটি করে একশ' আসন বগলদাবা করবেন বামেরা।
পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্দিষ্ট করে দিলেন ধুরন্ধর এরশাদ। চট্টগ্রামে গর্জে উঠলেন শেখ হাসিনা। শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য টেলিফোনে সুর পাল্টালেন তিনি। খালেদার উপরও চাপ ছিল। কিন্তু নিরাপোষ থাকলেন। কেন থাকলেন, এর রেটোরিক তাকে বিপুল জনপ্রিয়তা দিয়েছে।
কিন্তু ঘটনা অন্যখানে। সব নেতাদের জেলে রেখে খালেদা কাকে নিয়ে নির্বাচনে যাবেন? কাজেই নির্বাচন বর্জন। শেখ হাসিনাও ক্ষমতায় যেতে পারিনি। এরশাদ নির্বাচনী উল্টে দিয়ে জিতে গেলেন।
ফরহাদের অব্যবহৃত দাঁত সংসদ ছেড়ে রাস্তায় কাজে দিলো। দুই বছরের মাথায় সংসদ ভেঙে গেলো। ত্রিদলীয় জোটের যোগসাজশে বিদায় নিলেন এরশাদ।
কামড়াকামড়ির জেরে এবারও নির্বাচনের বাইরে থাকছেন খালেদা। তিন মাস কি তিন বছর তারপক্ষেও লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে। 'শক এন্ড অ'তে বিপর্যস্ত দেশে শেখ হাসিনার জন্য ব্যবহারিকভাবে ক্ষমতা চর্চা কঠিন হবে।
বিপর্যস্ত অর্থনীতি, রাজনীতি ও আস্থা মেরামতের কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে তাকেই। এর জন্য ভারতকেও দায় মোচন করতে হবে। ভারতভীতি বিড়ালটা কিন্তু একটা রোগা বাঘ। কাজেই ঝুঁকি রয়েছে।
অভিযানের লাভ লোকসান নির্ধারিত হয় ব্যয় অনুপাতে অর্জন দিয়ে। আধুনিক যুদ্ধ বিজ্ঞান অর্জনের পক্ষে কথা বলে না। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ করে ইউরোপ ফতুর হয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রও।
নির্বিচার গণহত্যা ছাড়া নখদাঁতহীন বিরোধীদেরও 'নাই' করে দেয়া সম্ভব না। সাক্ষী পাঞ্জাবের সওদাগর নওয়াজ শরীফ। নুসরাত ফতেহ আলী খানের মতো তার টাকও চকচক করে।গলায় সুর নেই বলে নওয়াজকে অনেক দিন শোনেনি কেউ





