বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ,দার্শনিক,শিল্পী-সাহিত্যিক,বুদ্ধিজীবী,বিশিষ্ট নাগরিক ও সংগঠনকে সম্মাননার সময় দেওয়া ক্রেস্টে স্বর্ণ জালিয়াতির খবরে আলোচনা চলছে সর্বত্র। জানা গেছে ওই ক্রেস্টে যে পরিমাণ স্বর্ণ থাকার কথা ছিল,তা দেওয়া হয়নি। আর ক্রেস্টে রুপার বদলে দেওয়া হয় পিতল,তামা ও দস্তামিশ্রিত সংকর ধাতু।
কেউ কেউ বলছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য দেয়া এই সম্মাননায় স্বর্ণ জালিয়াতিতে মান ইজ্জত আর রইল না। মহান এই উদ্যোগই যেন ম্লান হয়ে গেল।
পত্র পত্রিকায় খবরটি প্রকাশের পর বিষটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গঠন করা হয়েছে কয়েকটি তদন্ত কমিটি। দাবি উঠেছে স্পিকারের নেতৃত্বে সংসদীয় কমিটি গঠনের।
বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা দেয়ার সিদ্ধান্ত:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে অবদান রাখায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিগত সরকার বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৭ ধাপে প্রায় ২৫০ বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেয়া হয়েছে।
ক্রেস্টের স্বর্ণের ১২ আনাই মিছে:
অনুমোদিত নকশা অনুসারে ক্রেস্ট তৈরির পর তাতে দেওয়া স্বর্ণ এবং রুপার মান ও পরিমাণ যাচাই করার জন্য ৩টি নমুনা পাঠানো হয় বিএসটিআইতে। নথিপত্রে দেখা যায়,সম্মাননা প্রদানের তৃতীয় পর্বে ২০১২ সালের ১৮ অক্টোবর এই পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় এবং ওই দিনই প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। তার দুই দিন পর ২০ তারিখে ৬১ জন বিদেশি অতিথির হাতে ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।
এরপর আরও ৪ পর্বে যথাক্রমে ৬২,১,৬৯ ও ৬০ ব্যক্তি-সংগঠনকে সম্মাননা ক্রেস্ট দেওয়া হয়।
এর মধ্যে স্বাধীনতা সম্মাননা পান একজন,ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী (মরণোত্তর)। ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিসহ ১৩ বিশিষ্টজনকে দেওয়া হয় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা। বাকি সব ব্যক্তি ও সংগঠনকে দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা। ইন্দিরা গান্ধীকে দেওয়া স্বাধীনতা সম্মাননা ক্রেস্টটি ২০০ ভরি স্বর্ণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এটিও সরবরাহ করে এমিকন। ২৪ ক্যারেটের (বিশুদ্ধতার সূচক) স্বর্ণ দিয়ে এটি তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরমাণু শক্তি কমিশনে ওই ক্রেস্টটি পরীক্ষা করে দেখতে পায়,তাতে ১০ দশমিক ১১ ক্যারেট স্বর্ণ রয়েছে। বাকিটা খাদ। ফলে এটি আবার সরবরাহকারীকে দিয়ে নতুন করে করানো হয়েছিল। সর্বশেষ পরীক্ষায় তাতে ২৩ দশমিক ৫ ক্যারেট স্বর্ণ পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম ও মন্ত্রণালয়ের তখনকার সচিব এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তদন্ত কমিটি গঠন:
বিষয়টি তদন্ত করতে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার জিল্লার রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
স্পিকারের নেতৃত্বে সংসদীয় কমিটি গঠনের দাবি:
ক্রেস্টে স্বর্ণ কম দেওয়া ও বেশি বিল আদায়ের বিষয়ে তদন্ত করতে সংসদীয় কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
সম্প্রাতি স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজী পয়েন্ট অব অর্ডারে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা পদক দেওয়া বিদেশি অতিথিদের ক্রেস্টে ভেজাল স্বর্ণ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি এ দাবি জানান।
সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজী বলেন,এ ঘটনায় সারা পৃথিবীতে আমাদের মাথা নিচু হয়ে গেছে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,‘নিশ্চয়ই এ ঘটনায় কেউ না কেউ জড়িত রয়েছে। এ কারণে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করলে চলবে না। উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করতে হবে। তিনি স্পিকারের নেতৃত্বে সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের বক্তব্য:
ক্রেস্টে ভেজাল থাকার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মো. মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেছেন,ক্রেস্ট তৈরির বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাজ ছিল না। তাই এ বিষয়টি তাঁর বলার বিষয় নয়।
সম্মাননা প্রদান নীতিমালা:
বিদেশিদের সম্মাননা প্রদান-সংক্রান্ত নীতিমালায় বলা আছে,প্রতিটি ক্রেস্টে এক ভরি (১৬ আনা) স্বর্ণ ও ৩০ ভরি রুপা থাকবে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে করা বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় দেখা গেছে, এক ভরির (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) জায়গায় ক্রেস্টে স্বর্ণ পাওয়া গেছে মাত্র ২ দশমিক ৩৬৩ গ্রাম (সোয়া তিন আনা)। এক ভরির মধ্যে প্রায় ১২ আনাই নেই। আর রুপার বদলে ৩০ ভরি বা ৩৫১ গ্রাম পিতল,তামা ও দস্তামিশ্রিত সংকর ধাতু পাওয়া গেছে।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য:
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমিকনের মালিক মীর দাউদ আহমেদ বলেন,গলানোর সময় স্বর্ণের সঙ্গে রুপা মিশে গেছে। এ জন্য বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় স্বর্ণের পরিমাণ কম এসেছে। তিনি বলেন,ধারণা করা হচ্ছে,বিএসটিআই স্বর্ণগুলো মেশিনে তাপ দিয়ে গলিয়েছে। গলানোর পর পানি বের হয়েছে এবং তার সঙ্গে স্বর্ণ চলে গেছে। তিনি দাবি করেন,বাংলাদেশের কোথাও এসব স্বর্ণ সঠিকভাবে পরিমাপের কোনো যন্ত্র নেই। স্বর্ণ গলানোরও কোনো নিয়ম নেই।
দাউদ আহমেদ বলেন,‘মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমরা সরাসরি কাজ পেয়েছি। শেষ সময়ে এসে কাজটি পাওয়ায় দিনরাত কাজ করতে হয়েছে। যেমন ১০ দিন আগে বলেছে,৮০টি পদক দাও। আবার ১৫ দিন পর বলছে,আরও ৫০টা দাও।’ তিনি বলেন,‘আমরা বরং স্বর্ণ অনেক বেশি দিয়েছি,এ জন্য পরীক্ষায় স্বর্ণ পাওয়া গেছে।’
তিনি বলেন,‘প্রতিবার সরবরাহ করার পরই এক মাসের মধ্যে আমরা বিল পেয়েছি।’ সব কটি ক্রেস্টের জন্য প্রায় সাড়ে পাঁচ শ ভরি স্বর্ণ কার কাছ থেকে কিনলেন জানতে চাইলে দাউদ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন,‘তাঁতীবাজার থেকে কিনেছি। অনেক দিন আগের কাগজপত্র। তাই কাগজপত্র খুঁজে পাব কি না,সন্দেহ।’
জুয়েলার্স মালিক সমিতির নেতা বললেন:
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন,গলানো হলে বড়জোর ১ শতাংশ স্বর্ণ কমবেশি হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য:
২০১১ থেকে ২০১৩ সালের অক্টোবরের মধ্যে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল। তখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন এ বি তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি ইন্দিরা গান্ধীর ক্রেস্টের বিষয়টি তদারক করেছি। কারণ,ওটা পুরোটাই স্বর্ণ ছিল। অন্যগুলোর বিষয় নজর দিতে পারিনি।’
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওই সময়ের সচিব মিজানুর রহমান বলেন,‘সম্মাননার ক্রেস্ট বিএসটিআইয়ে পরীক্ষা করার জন্য পাঠানো হয়েছিল কি না,তা আমার জানা নেই।
ক্রয় কমিটির প্রধান:
এ-সংক্রান্ত ক্রয় কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) গোলাম মোস্তফা বলেন, স্বর্ণ একটু কমবেশি হতে পারে। কিন্তু এত কম হবে কী করে!’ দরপত্র আহ্বান না করার কারণ জানতে চাইলে গোলাম মোস্তফা বলেন,‘তাড়াহুড়োয় সম্ভব হয়নি।’
ক্রয় কমিটির সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব বাবুল মিয়া বলেন,‘বিএসটিআইয়ের মান পরীক্ষায় স্বর্ণের পরিমাণ কম দেখা যাওয়ায় আমাদের কর্তৃপক্ষ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বসেছিল। সরবরাহকারী বলেছিলেন,সোনা গলানোর পর ছাঁচে লাগানো হলে পরিমাণে একেবারে হুবহু পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা বলেছি, যা দেওয়ার কথা ছিল,তা-ই যেন দেওয়া হয়।’
ক্রয় কমিটির অন্যতম সদস্য বাবুল মিয়া বলেন,‘স্বর্ণ তো কোটিং করা হয়েছে। কোটিংকে আলাদা করে পরীক্ষা করা হলে পুনরায় স্বর্ণ পাওয়া দুষ্কর।’
মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়,পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্তে ক্রয় কমিটি করে ‘কোটেশন’ পদ্ধতিতে এই কেনাকাটা করা হয়।
সরবরাহকারী প্রষ্ঠিানের বিল:
ক্রেস্ট সরবরাহকারী এমিকনকে মন্ত্রণালয়ের পরিশোধ করা একটি বিলে দেখা যায়, একটি ক্রেস্টের জন্য তাদের ২৩ দশমিক ৫ গ্রাম স্বর্ণ আর ৩০ গ্রাম রুপার বিল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নীতিমালা অনুযায়ী স্বর্ণ দেওয়ার কথা ছিল ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম।
ওই বিলে ২৩ দশমিক ৫ গ্রাম স্বর্ণ এক লাখ ১৬ হাজার ৩২৫ টাকা,৩০ গ্রাম রুপার জন্য ৮৭ হাজার টাকা, ধাতব মানপত্র পাঁচ হাজার টাকা, রুপা গলানো ও খাঁচ তৈরি বাবদ ১৫ হাজার টাকা,ক্রেস্ট রাখার জন্য জামদানির বর্ডার দেওয়া কাঠের বাক্স বাবদ ১৫ হাজার টাকা,স্বর্ণ ও রুপা প্রক্রিয়াকরণ বাবদ ২৫ হাজার টাকা মিলিয়ে মোট দুই লাখ ৬৩ হাজার ৩২৫ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
সর্বশেষ তদন্ত কমিটি:
মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা স্মারকে স্বর্ণ কম দেয়ার অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠকে ৩ সদস্যের একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয় বলে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
মো.আফছারুল আমীনকে কমিটির আহ্বায়ক এবং ইকবালুর রহিম ও গোলাম দস্তগীর গাজীকে সদস্য করা হয়েছে।
জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন,‘আমিও কিছুটা শুনেছি এ বিষয়ে। প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে,সে যে-ই হোক।’
[b]ঢাকা, ২৫ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেএ[/b]
শ্রেণীহীন
সম্মাননা ক্রেস্টের স্বর্ণ হজম করল কে?
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, শিল্পী-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট নাগরিক ও সংগঠনকে সম্মাননার সময় দেওয়া ক্রেস্টে স্বর্ণ জালিয়াতির খবরে আলোচনা চলছে সর্বত্র





