বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির দোছড়ি সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) মধ্যে গতকালের  প্রচণ্ড গুলিবিনিময়ের  পর সীমান্তে ভারী অস্ত্র মোতায়েন করেছে প্রতিবেশী দেশটি।
গতকালের (শুক্রবার) দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা গুলিবিনিময়ের সময়ও মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপি সদস্যরা ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত বুধবার মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপি সদস্যদের গুলিতে নিহত হন বিজিবির নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান। গতকাল (শুক্রবার) তার লাশ ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও তা না দিয়ে উল্টো গুলি বর্ষণ করে বিজিপি। ৱ
বর্তমানে মিয়ানমার তার সীমান্তে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে রণপ্রস্তুতি নিচ্ছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। মংডু শহরের বলিবাজার, ফকিরাবাজার, ওয়ালিদং, তুমব্রু ও ঢেঁকিবুনিয়া সীমান্ত এলাকার ১ নম্বর ও ২ নম্বর সেক্টরে মিয়ানমার অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে। সীমান্তের জিরো পয়েন্ট এলাকায় অঘোষিত কারফিউ চলছে।
এ পরিস্থিতিতে উখিয়া-নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী লোকজনের মধ্যে বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ফলে উভয় দেশের সীমান্ত এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়েছে। আতঙ্কে পাইনছড়ি এলাকার আশপাশের পাড়াগুলোর লোকজন নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন।
সূ্ত্রে আরও জানা যায়, শুক্রবার বেলা ৩টা ২০ মিনিটের সময় পাইনছড়ি সীমান্তের ৫২ নম্বর পিলারের কাছে বিজিবির একটি টহল দল আগের দিন বিজিপির অতর্কিত গুলিবর্ষণের পর থেকে নিখোঁজ নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানের লাশ নিতে গেলে বিজিপি সদস্যরা অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। বিজিবিও আত্মরক্ষার্থে পাল্টাগুলি চালায়। বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে গুলিবিনিময়। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বিজিপির আবারো গুলিবর্ষণের পর পাইনছড়ি সীমান্তে বিজিবির শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ির ইউএনও আবু সাফায়েত মো: সহিদুর রহমান সীমান্তে গুলি বিনিময়ের কথা স্বীকার করে বলেছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিজিবি ও দোছড়ির স্থানীয় সূত্র জানায়, বিজিবির নিখোঁজ নায়েক সুবেদারের লাশ নেয়ার জন্য বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গতকাল বেলা ৩টা নাগাদ সীমান্তের ৫০ নম্বর পিলার এলাকায় সাদা পতাকা নিয়ে অবস্থান নেন। পরে ৫২ নম্বর পিলারের স্থানে বিজিপির পক্ষ থেকে লাশ হস্তান্তর করা হবে জানালে বিজিবির একটি দল সেখানে যাওয়ার পথে মিয়ানমারের বিজিপি সদস্যরা অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু করে।
বিজিবির একটি সূত্র জানায়, মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায়। হামলায় ৮৫ ও ৬০ মি: মি: অস্ত্রসহ ভারী মেশিনগান ব্যবহার করা হয়। হামলার সময় ওই এলাকায় বিজিবির চট্টগ্রামের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ আহম্মদ আলী, কক্সবাজারের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল ফরিদ হাসানসহ বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবস্থান করছিলেন।
নিখোঁজ নায়েক সুবেদার মিজানের লাশ নেয়ার জন্য নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে একটি কফিনও সীমান্তে নেয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমার লাশ ফেরত না দিয়ে অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। দোছড়ির ইউপি চেয়ারম্যান রশিদ আহম্মদ জানান, পাইনছড়ি সীমান্তে গুলিবিনিময়ের পর আতঙ্কে ওই এলাকার আশপাশের পাড়ার লোকজন পালিয়ে গেছে। কক্সবাজার বিজিবির সেক্টরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গুলিবিনিময়ের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর আচরণে পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার দেবদাশ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, বিজিবির পক্ষ থেকে তাদের বলা হয়েছে, মঙ্গলবার গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিখোঁজ নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তাকে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে তার লাশ ফেরত দেয়ার কথা ছিল। এ সময় মিয়ানমারের পক্ষ  থেকে  প্রথম গুলিবর্ষণ করা হয়।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদ্য স্থাপিত পাইনছড়ি বিওপি ক্যাম্প থেকে গত বুধবার একদল বিজিবি সদস্য নিয়মিত টহলের উদ্দেশ্যে বের হয়ে দোছড়ি ও তেছড়ি খালের সংযোগস্থলে পৌঁছলে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে বিজিপি তাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ সময় বিজিবি সদস্য ছোটাছুটি করে পালিয়ে গেলেও দায়িত্বরত নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। পরে বিজিপি জাতিসঙ্ঘ কনভেনশন অমান্য করে বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো পয়েন্ট এলাকায় অনুপ্রবেশ করে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ তার লাশ নিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের শেষের দিকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী তৎকালীন নাসাকা বাহিনী অতর্কিতভাবে ঘুমধুমের রেজু ফাত্রাঝিরি বিজিবি ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে এক বিজিবি সদস্যকে হত্যা করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনাকে পুঁজি করে মিয়ানমার থেকে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের আবারো বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে মিয়ানমারের বিজিপি সদস্যরা সীমান্তে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বারবার গুলিবর্ষণ করছে।
গতকাল শুক্রবার সকালে সীমান্ত এলাকা ঘুরে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বাইশপারি ৪১ নম্বর সীমান্ত পিলার এলাকায় মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘুমধুম বিজিবির সুবেদার সাহাব উদ্দিন জানান, সীমান্তে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে লোকজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। যে কারণে সীমান্তের উভয় পাড় মানবশূন্য হয়ে পড়েছে। রেজু আমতলী ক্যাম্পের সুবেদার মো: সোহরাব হোসেন জানান, বিজিপির গুলিবর্ষণের পর থেকে সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম জানান, গতকাল শুক্রবার পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিহত বিজিবির নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানের লাশ ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও বিকেল পর্যন্ত ফেরত দেয়নি।
কক্সবাজার ১৭ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম বলেন, বুধবার পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনার পর থেকে আমার নিয়ন্ত্রণাধীন ১৮ থেকে ৪০ নম্বর সীমান্ত পিলার পর্যন্ত সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং তাদেরকে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, মিয়ানমার আগে থেকে সীমান্তে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে। সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত দুই দেশের মধ্যে সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে একটি বৈঠক আগামী ৩ জুন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, শুক্রবারও পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার বিজিপি সদস্যরা আবারও দফায় দফায় গুলিবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। যে কারণে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকায় যোগাযোগ করতে না পারায় বিস্তারিত জানানো সম্ভব হচ্ছে না।
কক্সবাজার বিজিবির সেক্টর কমান্ডর খোন্দকার ফরিদ হাসানের বক্তব্য নেয়ার জন্য তার  মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। দৌছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রশিদ আহমদ বলেন, পাইনছড়ি এলাকায় শুক্রবার বিজিপি আবারো গুলিবর্ষণ করায় সীমান্ত এলাকায় পূর্বনির্ধারিত পতাকা বৈঠক হয়নি। ফলে লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়াও স্থগিত হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ১৫২ কিলোমিটার অভিন্ন সীমানা রয়েছে। ভারতের পর একমাত্র মিয়ানমারের সাথেই বাংলাদেশের অভিন্ন সীমানা রয়েছে।
(সৌজন্য: নয়াদিগন্ত)