উনিশ শতকের গোড়ার দিকের ঘটনা। তখন বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের কষ্টের সীমা ছিল না। মালিকেরা নগণ্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দরিদ্র মানুষের শ্রম কিনে নিত। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাড়ভাঙা শ্রম দিয়েও শ্রমিক তার ন্যায্য মূল্য পেত না। মালিকেরা উপযুক্ত মজুরি তো দিতই না, বরং তাদের অধীনস্থ শ্রমিকদেরকে দাসদাসীর মতো মনে করত। আর তাদের সাথে পশুর মতো ব্যবহার করত। সুযোগ পেলেই মালিকেরা শ্রমিকের ওপর চালাত নানা শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন।
শ্রমিকের গায়ের ঘাম ও সীমাহীন শ্রমের বিনিময়ে মালিকের সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠত। অথচ তার ছিটেফোঁটাও শ্রমিকের ভাগ্যে জুটত না। পরিবার-পরিজন নিয়ে শ্রমিকের কাটত দুর্বিষহ জীবন। সে সময় শ্রমিকের জন্য কাজের নির্দিষ্ট সময় যেমন ছিল না, তেমনি ছিল না মজুরির কোন নিয়ম-কানুন। ফলে শ্রমিকের শ্রমকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে মালিকেরা অর্জন করত সীমাহীন সম্পদ।
এভাবে শোষণ-নিপীড়ন ও বঞ্চনাই শ্রমিকের ভাগ্যলিখন হয়ে দাঁড়াল। মালিকের সীমাহীন অনাচার, অর্থলিপ্সা ও একপেশে নীতির ফলে শ্রমিকদের মনে জমতে শুরু করে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও দ্রোহ। ১২ ঘণ্টা কাজ করেও যখন শ্রমিকের সংসার চলত না, স্বজনের মুখে তিন বেলা খাবার তুলে দেয়া সম্ভব হতো না, তখন শ্রমিকেরা সুযোগ পেলেই প্রতিবাদী হওয়ার চেষ্টা চালাতেন। তবে এ রকম বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ প্রায়শই মালিকের পশুতুল্য ও আগ্রাসী হামলায় হতো ক্ষতবিক্ষত। এমতাবস্থায় জীবনের আশঙ্কা যেমন ছিল, তেমনি শ্রমের সুযোগও হাতছাড়া হতো। ফলে শ্রমিকেরা আরো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হত।
এ অবস্থায় ১৮৬০ সালে সর্ব প্রথম শ্রমিকরা তাদের কর্মঘণ্টা ১২ থেকে কমিয়ে ৮ ঘন্টানির্ধারনেরদাবি জানায়। কিন্তু দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি তাদের আন্দোলনও জোরালো রূপ নেয়নি। কারণ সে সময় আন্দোলন করার মতো তাদের কোন প্লাটফরম বা শ্রমিক সংগঠন ছিল না।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1398914031.jpg[/img]
ওই আন্দোলন সফল না হলেও দমে যায়নি শ্রমিকেরা। তারা বুঝতে শুরু করে যে, বণিক ও মালিক শ্রেণীর এই রক্ত শোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত হতে হবে। তাই প্রথমবারের মতো ১৮৮০-৮১ সালের দিকে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠা করে Federation of Organized Trades and Labor Unions of the United States and Canada। ১৮৮৬ সালে যার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় American Federation of Labor। এই সংঘের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে।
এই শ্রমিক সংগঠনটি ১৮৮৪ সালে প্রথমবারের মতো '৮ ঘণ্টা দৈনিক মজুরি' নির্ধারনের প্রস্তাব পাশ করে এবং মালিকও বণিক শ্রেণীকে এই প্রস্তাব কার্যকরের জন্য ১৮৮৬ সালের ১লা মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। একইসাথে তারা এই সময়ের মধ্যে সংঘের আওতাধীন সকল শ্রমিক সংগঠনকে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংগঠিত হওয়ার জন্য বার বার আহবান জানায়।
প্রথম দিকে অনেকেই প্রস্তাবটিকে অবাস্তব অভিলাষ, অতি সংস্কারের উচ্চাকাংখা বলে আশংকা প্রকাশ করে। কিন্তু বণিক ও মালিক শ্রেণীর কোন ধরনের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে প্রতিবাদি ও প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে। এ সময় শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রপন্থী দলও একাত্মতাজানায়।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1398916085.jpg[/img]
তবে এতে তেমন কাজ হলো না। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি তো মানলই না, বরং তারা শক্ত অবস্থান নিলো। ফলে এক সময় শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরণের আকার ধারণ করল। পহেলা মে কে ঘিরে জমতে শুরু করল প্রতিবাদ, প্রতিরোধের আয়োজন।আর সেটা ঘটল আজকের তথাকথিত মানবাধিকার ও সভ্যতার অহঙ্কারী দেশ আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে।
অন্যদিকে ১মে কে মোকাবেলায়পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সরকারকে অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে। ধর্মঘট আহবানকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য শিকাগো বাণিজ্যিক ক্লাব ইলিনয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ২০০০ ডলারের মেশিনগান কিনে দেয়।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1398914071.jpg[/img]
এরইমধ্যে চলে আসে ১ মে। প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক তাদের কাজ ফেলে এদিন সমগ্র যুক্ত্ররাষ্ট্রের রাস্তায় নেমে আসে। শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘট আহবান করা হয়। প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হয়।
অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা, মিছিল, মিটিং, ধর্মঘট, বিপ্লবী আন্দোলনের হুমকি সবকিছুই মিলে ১মে উত্তাল হয়ে উঠে। পার্সন্স, জোয়ান মোস্ট, আগস্ট স্পীজ, লুই লিং সহ আরও অনেকেই শ্রমিকদের মাঝেপথিকৃত হয়ে উঠেন।ধীরে ধীরে আরও শ্রমিক কাজ ফেলে আন্দোলনে যোগ দেয়। আন্দোলনকারি শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ১লক্ষ। আন্দোলন চলতে থাকে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1398936872.jpg[/img]
১৮৮৬ সালে ৩ মে মতান্তরে ৪মেসন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হেমার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকরা মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হয়। আগস্ট স্পীজ জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছিলেন। এমন সময় হঠাৎ দূরে দাঁড়ানো পুলিশ বাহিনীর কাছে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে।
এ ঘটনায় এক পুলিশ নিহত হয় এবং ১১ জন আহত হয়, পরে আরও ৬জন মারা যায়। এ ঘটনায় পুলিশবাহিনীও শ্রমিকদের উপর অতর্কিত হামলা শুরু করে। যা সাথে সাথেই দাঙ্গায় রূপ নেয়। ওই দাঙ্গায় ১১ জন শ্রমিক নিহত হন। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজসহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1398914139.jpg[/img]
ঘটনা পর প্রহসনমূলক এক বিচারের মাধ্যমে ১৮৮৭ সালের ১১নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুই লিং একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্যএকজনের পনের বছরের কারাদণ্ড হয়। সেদিন ফাঁসির মঞ্চে আরোহনের পূর্বে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, 'আজ আমাদের এই নি:শব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে'।
অবশ্য ১৮৯৩ সালের ২৬ জুন ইলিনয়ের গভর্ণর অভিযুক্ত ৮ জনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন। একই সাথে রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনোই প্রকাশ পায়নি।
শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদেরদৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করারদাবিআনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবি আদায়ের দিন হিসেবে। পৃথিবীব্যাপী আজও তা পালিত হয়ে আসছে।
তবে ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ করা হলেও কাগজ-কলমে আর বাস্তবের মধ্যে ফারাক রয়েছে। প্রতি বছরই ঘটা করে পালন করা হয় মে দিবস বা শ্রমিক দিবস। তবে উন্নয়ন হয়নি শ্রমিকের ভাগ্যে। কাজের পরিবেশেরও উন্নয়ন হয়নি। উন্নয়ন হয়নি তাদের বেতন কাঠামোয়।
সভ্যতার প্রতিটি ইট,বালু, পাথরে যাদের ফোটা ফোটা ঘাম জড়িয়ে আছে সেই শ্রমিকরা কিন্তু কখনোই সভ্যতার আশীর্বাদধন্য শ্রেণী ছিলনা, এখনো নয়।দাস প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে।শ্রমিকদের অনেক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।তারপরওতারা কর্মক্ষেত্রে পদে পদে বঞ্চিত হচ্ছে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1398914191.jpg[/img]
আ্ইএলও’র এক সমীক্ষায় দেখাগেছে, মধ্য প্রাচ্যে প্রায় ৬ লাখ শ্রমিক বাধ্যতামূলক শ্রমের স্বীকার বা ফোর্সড লেবারের ভিক্টিম।প্রতি ৩০০ জনে ১ জন এর শিকার হচ্ছেন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শ্রমিকরা বেশি ভুক্ত ভোগী হচ্ছেন।উন্নত বিশ্বেও তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিকরা বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেন।
বাংলাদেশে সবচেয়ে সুলভে শ্রম পাওয়া যায়।শুধু মাত্র সস্তা ও বিরাট জনবলের উপর ভিত্তি করে আমাদের তৈরি পোষাক শিল্প বিশ্বের মাঝে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। কিন্তু যাদের শ্রমে আজ পোশাক শিল্পের এত উন্নতি তাদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়।
২০১৩সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ঘটনা আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় শ্রমিকদের জীবন কতটা নিরাপদ। ওই ঘটনায় অন্তত ১১৩৫ জন শ্রমিকের নির্মম মৃত্যু হয়েছে।আর আহত হয়েছেনদুই হাজারেরও বেশি শ্রমিক-কর্মচারী। নিখোঁজ রয়েছেন তিন শতাধিক।এছাড়াও তাজরিন অগ্নিকান্ড ট্রাজেডি;স্পেকটাম ভবন ধসে ৬৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু তাদের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার কথা বলে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1398936874.jpg[/img]
সরকারি হিসাবে, রানা প্লাজা ধসের আগের পাঁচবছরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৫১টি। প্রাণ গেছে ৪৮৮ জনের। গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র হিসাবমতে, গত ১৩ বছরে ১৬৬ দুর্ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন পোশাক কারখানায়। এতে নিহত হয়েছেন ২২২ জন শ্রমিক। আর গত ২৩বছরে ভবনধস ও আগুনে প্রাণহানি ঘটেছে ৩৮৮ জন শ্রমিকের।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1398914223.jpg[/img]
দেশের অর্থনীতিতে সিংহভাগ অবদান এই সব শ্রমিকদের। যাদের অধিকাংশই নারী।অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা মোট কথা জীবন যাত্রার মান বিশ্লেষণ করলে তারা দারুণ অবহেলিত বঞ্চিত। তাদের আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নেই বললেই চলে।
শ্রমিকের জীবন নিয়ে যারা খেলা করে সেই সব পোশাক কারখানার মালিকদের কখনো বিচার হয় না।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1398918208.jpg[/img]
তারা রয়ে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আর এ কারণেই কারখানাগুলোতে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে শ্রমিকদের জীবন উৎসর্গের তালিকাও। কারখানার মালিকরা দৃষ্টান্তমূলক সাজা পেলে এ ধরণের দুর্ঘটনা সন্দেহাতিতভাবে কমে যেত।
মে দিবস উদযাপন সত্যিকার অর্থে সফল হবে যেদিন সকল শ্রমিক, সকল পেশার শ্রমজীবি তাদের অধিকার লাভ করবে। মালিক-ভৃত্য সম্পর্কের বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে অংশীদারিত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে। যাদের শ্রমের উপর ভিত্তি করে আমাদের এই সভ্যতা, সভ্যতার বিকাশ ও উন্নয়ণ তাদের অধিকার নিশ্চিত হলেই মে দিবস পালনের স্বার্থকতা খুঁজে পাবো। আমরা সেদিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন শ্রমিকদেরকে অধিকার আদায়ের জন্য আর কাজ ফেলে রাস্তায় নামতে হবে না।
[b]ঢাকা, ০১ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি[/b]





