সশস্ত্র দুই পাহাড়ি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে প্রায় ৩ সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ জীবন কাটাচ্ছেন খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম বাবুছড়া ইউনিয়নের ২০ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ।
ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে চলমান এ দ্বন্দ্বে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। অবরুদ্ধ থাকায় সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে।
এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকায় দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া নাড়াইছড়ি বাজারে কোন সাহায্য পাঠাতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী দুর্গম নাড়াইছড়ি দখল নিয়ে দুই আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ ও জেএসএসের (সন্তু) মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে সশস্ত্র লড়াই চলে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০ এপ্রিল বাবুছড়ার জারুলছড়িতে দু’পক্ষের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী বন্দুকযুদ্ধ হয়। সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে তা চলে ৮টা পর্যন্ত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সেখানে দুইপক্ষের মধ্যে প্রায় দুই হাজার রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়। এ সময় সেখানে মর্টারের মত ভারি আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহৃত হয়।
খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছলে উভয় গ্রুপের সন্ত্রাসীরা নিরাপদে পালিয়ে যায়। সেনাবাহিনী ঘটনাস্থল থেকে ১ রাউন্ড তাজা বুলেট, ১টি ক্লিনিং রড (অস্ত্রের একটি অংশ), বিভিন্ন অস্ত্রের ১৫৩ রাউন্ড গুলির খোসা এবং ৯ রাউন্ড (মিস ফায়ার) গুলি উদ্ধার করে।
যুদ্ধে ইউপিডিএফের দুই কর্মী নিহত ও ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও মৃতদেহ খুঁজে পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তবে ঘটনাস্থলে জমাট রক্ত পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
এলাকাবাসী জানায়, ওই ঘটনার পর নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য ফাঁস হতে পারে এমন আশঙ্কায় দু’পক্ষই স্থানীয়দের চলাচলসহ সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এমনকি নাড়াইছড়িবাসীর নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পরিবহনের একমাত্র নৌপথটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ত্রাসীরা তাদের মোবাইল ফোনও কেড়ে নেয়। ফলে এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র মাধ্যম বনজ সম্পদ সংগ্রহসহ খাদ্য সংগ্রহ বন্ধ হয়ে গেছে।
ওই ঘটনার পর ২৪ এপ্রিল সন্ত্রাসীরা নাড়াইছড়ি বাজারে আগুন দেয়। এতে পুড়ে যায় ৬০টি দোকান। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ ও জেএসএস (সন্তু) পরস্পরকে দায়ী করে। এমনকি জনগণকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাতেও পরস্পরকে দোষারোপ করছে উভয়পক্ষ।
বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সুগপ্রিয় চাকমা ২০ গ্রামের মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগের পথ বন্ধ থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এলাকার ইউপি সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। অনেক কষ্ট করে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুড়ে যাওয়া নাড়াইছড়ি বাজারের ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সংগ্রহ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
দীঘিনালা ইউপি চেয়ারম্যান নবকমল চাকমা এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, যাদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি তাদের উপকার করতে না পারায় নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। তবে এলাকাবাসীর কাছে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দিতে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
গ্রামবাসীদের অবরুদ্ধ থাকার ঘটনা নিশ্চিত করে ইউপিডিএফের দীঘিনালা শাখার সংগঠক কিশোর চাকমা ঘটনার জন্য জেএসএস (সন্তু) পক্ষকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, জেএসএসের (সন্তু) সশস্ত্র কর্মীরা এলাকায় অবস্থান করে গ্রামবাসীকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। লোকজন চরম আতঙ্কে দিনযাপন করছেন।
জেএসএস (সন্তু) পক্ষের কেন্দ্রীয় সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, জনগণের অবরুদ্ধ থাকার বিষয়টি জানা নেই। তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি নাড়াইছড়ি বাজারে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করে বিচারের দাবি জানান। তিনি বলেন, যারা বাজারে আগুন দিয়েছে তারাই গ্রামবাসীকে অবরুদ্ধ করে রাখতে পারে।
দীঘিনালা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলুল জাহিদ পাভেল ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নিরাপত্তার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা পেলেও সাহায্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, নাড়াইছড়িতে সাহায্য পাঠাতে বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।
[b]ঢাকা, ১২ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেআই[/b]
শ্রেণীহীন
ইউপিডিএফ ও জেএসএস দ্বন্দ্বে অবরুদ্ধ পাহাড়ি জনপদ
সশস্ত্র দুই পাহাড়ি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে প্রায় ৩ সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ জীবন কাটাচ্ছেন খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম বাবুছড়া ইউনিয়নের ২০ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ।





