কেউ গুম বা অপহরণের শিকার হলে তাঁকে উদ্ধারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হবে কেন-এমন প্রশ্ন তুলেছেন টিআইবি'র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। 'নিজ উদ্যোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না?'
বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)কর্তৃক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে 'বাংলাদেশের জাতীয় শুদ্ধাচার ব্যবস্থার বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের প্রকাশ শেষে এসব প্রশ্ন করেন তিনি।
ড. ইফতেখার বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে সব ক্ষেত্রে সরকার প্রধানের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকছে। প্রধানমন্ত্রী অনুমতি দিলে গুম বা অপহরণের শিকার ব্যক্তি উদ্ধার হবেন, নইলে হবেন না- এর নাম সুশাসন নয়।
তিনি বলেন, সংবিধানে প্রধান নির্বাহী অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরশাসকে পরিণত করা হয়েছে। আবার প্রধানমন্ত্রী নিজেও একনায়কের ন্যায় ক্ষমতার ব্যবহার করছেন।
গণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিমূলক সুশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যথেষ্ট সদিচ্ছার অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অপহরণ, গুম ও খুনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, দেশে সব ধরণের ছোটখাটো অপরাধকর্মে এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পদে পদে আইনের শাসন লঙ্ঘিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান নিজ ক্ষেত্রের বাইরেও অতি উৎসাহী হয়ে অন্যত্র তাদের ক্ষমতা প্রয়োগে চেষ্টা করছে। ক্ষমতার এই যে অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা সুশাসন নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল স্তম্ভগুলোকে সরকার দলীয়করণ করে একক প্রভাবাধীনে রেখেছে। সরকার নিজস্ব এজেন্ট অথবা মনোনীত প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে সংসদ, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, পুলিশ (আইন প্রয়োগকারী সংস্থা), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়সহ সব ক্ষেত্রে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দুর্নীতির সহায়ক শক্তির তুলনায় দূর্নীতি দমনের সহায়ক শক্তি অনেক দুর্বল। যে কারণে সংসদের মতো জায়গায় ৫৭ শতাংশ ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত হতে পারছেন। এর প্রভাব সবক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। একারণে রাজনীতিকে জনগণ এখন একটি দুর্বৃত্তায়নের ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত করছে।
দুদক একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হলেও মামলা দায়ের করার পর দলীয় বিবেচনায় আবার সেই মামলা প্রত্যাহার করেছে। এরকম ডজন খানেক মামলা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর উদ্বেগজনক মাত্রায় দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, অপর্যাপ্ত সম্পদ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতির বিস্তার এবং দুর্নীতির অস্বীকৃতি চর্চার ফলে সৃষ্ট বিচারহীনতার সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে। যে কারণে জাতীয় শুদ্ধাচার ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে।
তিনি আরো বলেন, "সরকার কর্তৃক জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল ২০১২ গৃহীত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই গবেষণাটি প্রণীত হওয়ায় টিআইবি আশা করে সরকারের কৌশল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বর্তমান গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশসমূহ বিবেচনায় নেয়া হবে।
এসময় সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, গবেষণাটির যুগ্ম প্রণেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন এম. আমিনুজ্জামান, টিআইবি’র উপ-নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল।
[b]ঢাকা, জেইউ, ১৪ মে (টাইমনিউজবিডি.কম)//কেবি[/b]