আন্তর্জাতিক নারী দিবস। যার পূর্বের নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস। প্রতি বছরের ৮ মার্চ দিবসটি পালন করা হয়। বিশ্বব্যাপী নারীরা একটি প্রধান উপলক্ষ্য হিসেবে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীনা নিয়ে এ দিবস উদযাপন করে থাকেন। বিশ্বের এক এক প্রান্তে নারী দিবস উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য এক এক রকম হয়। কোথাও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপনই মুখ্য বিষয় হয়। আবার কোথাও মহিলাদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠাটি বেশি গুরুত্ব পায়। দিবস উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম হলেও এর পেছনের ইতিহাসটা একই। আর সেটা হলো সংগ্রামের ইতিহাস।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201403/1394215030.jpg[/img]
নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। একসময় নারী শ্রমিকদের কাজ করতে হতো ১২ ঘণ্টা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে টানা বারো ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রমের পর নারীদের জুটত সামান্য কিছু খাবার। একটু ভুল করলেই শুরু হতো অত্যাচার। তার ওপর আবার পুরুষ সহকর্মী যা মজুরি পেত তার অর্ধেকও পেত না নারীরা। অমানবিক পরিশ্রমের পর এই বৈষম্যমূলক মজুরী মানতে পারেনি নারীরা। প্রতিবাদ করেছে। আন্দোলন করেছে। রাস্তায় নেমেছে দাবি আদায়ে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201403/1394214803.jpg[/img]
১৮৫৭ সালের ৮ মার্চের ঘটনা। সেদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমে এসেছিলেন সেখানকার সেলাই কারখানার নারী শ্রমিকেরা। প্রতিবাদ জানিয়েছিল মজুরি বৈষম্য আর কাজের অমানবিক পরিবেশের। দাবি জানিয়েছিল কর্মঘণ্টা ১২ থেকে কমিয়ে ৮ ঘণ্টা করার। কিন্তু দাবি মেনে নেয়নি মালিকপক্ষ। বরং সেদিনের সেই মিছিলে লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল সরকারের পেটোয়া বাহিনী। দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে আন্দোলনরত সেই নারী শ্রমিকদের ওপর। সেদিন বহু নারীকে আন্দোলন করার অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কারাগারে নির্যাতিত হয়েছিলেন অনেকেই। তবে থেমে যায়নি তাদের আন্দোলন। সফল না হলেও সেদিনের আন্দোলন জাগিয়ে তুলেছিল বিশ্বের নিপীড়িত নারীদের।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201403/1394214873.jpg[/img]
ওই ঘটনার আরো তিন বছর পর ১৮৬০ সালের ৮ মার্চ নারী শ্রমিকরা আবারো সংঘবদ্ধ হন। তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নিজস্ব ইউনিয়ন গঠন করেন। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনের নেত্রী ক্লারা জেটকিন পুরুষের পাশাপাশি নারীর সম-অধিকারের দাবিটি আরও জোরালো করেন। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। তার নেতৃত্বেই ১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্টে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে ১৭টি দেশের ১০০ জন প্রতিনিধি নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে এ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯১১ সাল থেকে ৮ মার্চ দিনটিকে 'নারীর সম-অধিকার দিবস' হিসেবে পালিত হয়।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201403/1394214843.jpg[/img]
১৯১১ সালের ১৯ মার্চ প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করা হয়। এই দিনে সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, অষ্ট্রিয়া ও জার্মানিতে লক্ষাধিক নারী মিছিল ও সমাবেশের মধ্য দিয়ে এ দিনটি উদযাপন করেন। আর ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে। নারী অধিকারের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনায় রেখে ১৯৪৫ সালে সানফ্রান্সিসকোতে জাতিসংঘ স্বাক্ষর করে 'জেন্ডার ইকুয়ালিটি' চুক্তিতে। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার পথে অনেকটা এগিয়ে যায়। ১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৮ মার্চ নারী দিবস পালনের জন্য উত্থাপিত বিল অনুমোদন পায়। ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৪ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করে জাতিসংঘ।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201403/1394214905.jpg[/img]
দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার অভীপ্সা নিয়ে। বাংলাদেশও প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে দিবসটি পালন করে। বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় ৮ মার্চ। এরমধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, কিউবা, জর্জিয়া, গিনি-বিসাউ, ইরিত্রিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, লাওস, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনেগ্রো, রাশিয়া, তাজাকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উগান্ডা, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়া। চীন, মেসিডোনিয়া, মাদাগাস্কার, নেপালে শুধুমাত্র মেয়েরাই সরকারি ছুটি পায়।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201403/1394214996.jpg[/img]
ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে সারা বিশ্বেই নারী দিবস উদযাপন করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, এতে কি নারী শ্রমিকদের ভাগ্যে কোন পরিবর্তন আসছে? কমেছে কি তাদের পরিশ্রম। বাজার মূ্ল্যের সঙ্গে সঙ্গে কি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের মজুরী? কর্ম ক্ষেত্রে কি তাদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে? হয়তো এসব প্রশ্নে উত্তর হবে না বোধক। তাহলে এইযে ডামাডোল পিটিয়ে নারী দিবস পালন করা হচ্ছে, এর স্বার্থকতা কোথায়?
[b]ঢাকা, এআর, ৮ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি[/b]