[b]ঢাকা:[/b] গত পাঁচ জানুয়ারি একতরফা বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশ একের পর এক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন এবং ভোটারবিহীন নির্বাচন এই সব প্রতিবেদনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। মঙ্গলবার ব্রিটেনের বিখ্যাত টাইমস ম্যাগাজিনের অনলাইনে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে।
ম্যাগাজিনটি হিন্দুদের ওপর এই হামলায় বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করা হয়েছে। যে সব হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তাদের অধিকাংশই দারিদ্র্য। ভারতের সীমান্তের কাছে অবস্থিত সাতক্ষীরার হিন্দুদের ওপর বেশি হামলা হয়েছে বলেও জানায় টাইমস। 
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389748475.jpg[/img]
ম্যাগাজিনটির দাবি, হিন্দুদের জমি দখল করতেই জামায়াত এই হামলা পরিচালনা করেছে। তবে একতরফা নির্বাচনের মতোই একতরফা জামায়াত বিদ্বেষী প্রতিবেদন বলা যায় এটিকে। যাদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে, পুরো প্রতিবেদনে তাদের কোন বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়নি। শেষ দিকে হামলার জন্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেও কিছুটা দায়ী করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের লেখক জোসেফ এ্যালচিন ঢাকা ভিত্তিক আওয়ামী লীগপন্থী ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনের সিনিয়র রিপোর্টার। প্রতিবেদনের কোথাও তিনি যৌথবাহিনীর গুলিতে বিরোধী নেতাদের নির্বিচারে হত্যা কথা তুলে আনেননি।
এর দুইদিন আগে রোববার যুক্তরাষ্ট্রের বহুলপ্রচলিত পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস লেখেছে, বাংলাদেশে শুরু হতে পারে একদলীয় শাসন শিরোনামের একটি প্রতিবেদন। প্রত্রিকাটি লিখেছে, গত ২০ বছর ধরেই ক্ষমতার পালাবদল দুই নেত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চাক্রিকভাবে তাদের মধ্যেই ক্ষমতার লেনদেন চলছে।  কিন্তু গত সপ্তাহের ঘটনায় তাঁদের সেই সহাবস্থানের সমাপ্তি ঘটতে পারে, শুরু হতে পারে একদলীয় শাসনের ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ।
পত্রিকাটির হিসেবে, সর্বশেষ চারটি নির্বাচনে দুই বার করে প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। তাঁদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্ষমতার কেন্দ্রে এক ধরনের ভারসাম্য বজায় রেখেছিল।এই নির্বাচনের ফলে দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও জটিল হবে বলে মনে করেন কি- এক সাংবাদিকের এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আপনি কী চান, আমার কাঁদতে শুরু করা উচিত? ওহ, সংকট, আমরা সংকটে পড়েছি! আপনি কী সেটা চান?' 
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389748632.jpg[/img]
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত ২০ বছর ধরেই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ চলছে এই দুই নারীর হাতেই। দুজনই একগুঁয়ে এবং কর্তৃত্ববাদী, কিন্তু তুমুল জনপ্রিয়। গত চারটি নির্বাচনে দুই বার করে বিজয়ী হয়েছেন তাঁরা। তাঁদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায় এক ধরনের ভারসাম্য এলেও গত সপ্তাহের ঘটনার ফলে সেই ভারসাম্যের অবসান এবং ঝুঁকিপূর্ণ একদলীয় শাসনের উদ্যোগ শুরু হতে পারে।বিজয়ীই সব ক্ষমতার অধিকারী হবে- এটাই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এ জন্য বিজয়ী হতে নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য সব ধরনের বাজি ধরেন দুই নেত্রী।
এতে বলা হয়, এবার নির্বাচন বয়কট এবং রাজপথে সহিংস বিক্ষোভের মাধ্যমে লক্ষ্য পূরণের বাজি ধরেছিলেন খালেদা জিয়া। আর শেখ হাসিনা বাজি ধরেছিলেন প্রধান বিরোধী দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন করার। ধরে নিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা এতটা কঠোর হবে না, যাতে তাঁকে পিছু হটে নতুন করে নির্বাচন দিতে হয়। এখন মনে হচ্ছে, বাজিতে জিতে শেখ হাসিনা জিতে গেছেন এবং প্রাপ্তিও যথার্থ।
তবে গত ১০ জানুয়ারি ব্রিটেনের ইকোনোমিস্ট লিখেছে, “শেখ হাসিনার দেশের গণতন্ত্র এখন ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায়।নয় কোটি ২০ লাখ সম্ভাব্য ভোটারের মধ্যে (১৫ কোটির বেশি জনসংখ্যার মধ্যে) ভোট পড়েছে খুব সামান্যই। সরকার বলছে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। তবে অন্যরা বলছে খুব কম। এটি ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগকে আরেক মেয়াদের জন্য তেমন কোনো ভিত্তি তৈরি করে দেয়নি।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, “বহু ভোটকেন্দ্রে ভোটারই প্রায় দেখা যায়নি। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর দেখা যায় সন্দেহজনকভাবে বিশালসংখ্যক ব্যালট পেপার কাস্ট হয়েছে। ৩০০ আসনের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি। এতে শুধু আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলগুলোর প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছে। রাজধানীর ২০টি আসনের মধ্যে শুধু নয়টি আসনে ভোট হয়েছে।”
দি ইকোনোমিস্ট বলছে, “বিগত চারটি নির্বাচনের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন না হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না এই দাবিতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার ছোট ছোট মিত্রদলগুলো নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। ২০১১ সালে শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ সাংবিধানিক ধারা বাতিল করে দেন।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, “সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কার্যত গৃহবন্দী করা হয়। শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বয়কট করায় সাবেক সামরিক শাসক এবং বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হোসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সামরিক হাসপাতালে অবরুদ্ধ রাখা হয়। চতুর্থ রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে  নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৭ জানুয়ারি বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়ে যায়। সংবাদ সম্মেলন শেষ করার পর বেগম জিয়ার এক উপদেষ্টাকে গ্রেফতার করা হয়। বিরোধীদলের কয়েক হাজার কর্মীকে এই পর্যন্ত আটক করা হয়েছে।”  
প্রতিবেদনে বলা হয়, “নির্বাচনে জয় লাভের পর রাজনৈতিক ভয়ভীতি প্রদর্শনকে সহিংসতা বন্ধের প্রচেষ্টা হিসেবে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ভোটের দিন বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষ, পুলিশের গুলি এবং ভোটারদের ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখার সহিংসতায় অন্তত ২০ জন নিহত হন।”
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201401/1389748698.jpg[/img]
পত্রিকাটি লিখছে, “সব মিলিয়ে রক্তাক্ত কদর্যতার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে নতুন একটি বছরের শুরু হলো। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় পাঁচশ’র বেশি মানুষ নিহত হয়, যা স্বাধীনতার পর সবচেয়ে সহিংস বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ক্ষেত্র বিশেষে সরকার এর জন্য দায়ি করেছে বিএনপিকে, বিশেষ করে এর ইসলামী জোটকে। নির্বাচনের পর তৃণমূল পর্যায়ের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে জামায়াতি দস্যুরা।”
দি ইকোনোমিস্ট বলছে, “যদিও এই সহিংসতার দায় আওয়ামী লীগের ওপরও বর্তায়। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মাধ্যমে একজন শীর্ষ বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকে ফাঁসি দেয়া হয়। এরফলে দেশব্যাপী উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়াটি মাসব্যাপী চলে।”