তছনছ হয়ে গেছে সূচির স্বপ্ন। তার ইচ্ছে পূরন হয়নি। সে আর ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারলো না। তার সব কিছুই এলোমেলা হয়ে গেছে। দুষ্টের পাল্লায় পড়ে আমার মেয়ে চির তরে চলে গেছে। আর আমাকে কোনদিন বাবা বলে ডাকবে না। পরীক্ষাও দিতে আসবে না। একথা বলেই ডুকরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সূচির বাবা শফিকুল ইসলাম। তিনি শোকে অনেকটাই পাথর। বার বার মুছড়ে পড়েন আর দু'চোখ জুড়ে আসছিল পানি। মেয়ের স্বপ্ন নিয়ে এভাবেই বর্ননা দেন। এদিকে পুলিশ অনেকটাই নিশ্চিত প্রেমের কারণেই মৃত্যু হয়েছে আফরোজা আক্তার সূচি।
তিনি দিচ্ছিলেন বিবিএ পরীক্ষা। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করেন তিনি। মেধাবী মেয়ে। উচ্চ মাধ্যমিকের পর ইউনাইটেড এয়ারওয়েজে বিমানবালা হিসেবে কাজ শুরু করেন। বছর চারেক সেখানে কাজ করার পর গত কোরবানির ঈদের আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যোগ দেন। একই সঙ্গে তিনি বিবিএ পড়ছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার। কিন্তু দুর্বৃত্তরা স্বপ্ন পূরণ হতে দিলো না।
আফরোজ ইসলাম সূচির পিতা পরিবহন ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম। তার দাবি  তাঁর মেয়ে আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়েছে।
নিহত  সূচি (২৩) রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার ৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর রোডের ৪০ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় সাবলেট হিসেবে ভাড়া থাকতেন।
গলায় ওড়না পেচানো অবস্থায় সূচির লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে চালানো হলেও দ্রুত মৃত্যুর রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে বলে পুলিশ ও নানান সূত্রে জানা গেছে।
তবে তার মৃত্যুর রহস্য নিয়ে ক্রমেই প্রশ্ন উঠেছে।সূচিকে হত্যা করা হয়েছে না সত্যিই তিনি আত্মহত্যা করেছেন এ নিয়ে ক্রমেই সন্দেহের দানা বাধছে। নেপথ্যে যে প্রেমঘটিত বিষয়ের সংশ্লিষ্টতার ছিল সে কথা জোড়ালো ভাবে বলছে পুলিশ।নিহত সূচির পরিবারের সদস্যরা দাবি করছেন, সূচি আত্মহত্যা করতে পারে না। ঘটনার দিন দুপুরেই সূচির পরীক্ষা ছিল। সেজন্ সূচি পড়াশুনাও করছিল জোরেশোরে। কিন্তু সেই মেয়ে দুপুর না গড়াতেই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে ভাবা যায় না। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ময়নাতদন্তের পূর্বে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না আসলে হত্যা না আত্মহত্যা। আত্মহত্যা হলেও কেউ প্ররোচিত করেছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহত সুচির কয়েকজন সহকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এদের মধ্যে সুচির কথিত প্রেমিক মাহবুব মোর্শেদ রয়েছেন বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
পুলিশ ও নিহতের স্বজন সূত্রে জানা গেছে, উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর সড়কের ৪০ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় একটি পরিবারের সঙ্গে ফ্ল্যাটে ভাগাভাগি করে থাকতেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিমানবালা আফরোজ ইসলাম সূচি। তার সঙ্গে থাকতো প্রবাসী ভাইয়ের স্ত্রী সুমি। সূচি চাকরির পাশাপাশি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে (এআইইউবি) বিবিএ পড়ছিলেন।
বুধবার সকাল ১১টার ঘটনা। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সূচির ভাবী সুমি বাসা থেকে বেরিয়ে যান। দুপুর দুইটায় পরীক্ষা তাই সে সময় সূচি পড়ছিল। কিন্তু দুপুর পৌনে দুইটার দিকে ভাবি সুমি বাসায় ফিরে দেখেন সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে সূচি।
ঘটনা যখন এমনি তখন কাছাকাছি সময় ব্যবধানে বাসায় পৌঁছে যায় সূচির সহকর্মী বিমানবালা সৈয়দা রাখিনা লিকমা, কেবিন ক্রু মাহবুব মোর্শেদ ও মির্জা আদনান। তারা সবাই সূচির ঝুলন্ত লাশ নিয়ে যান পাশের ক্রিসেন্ট হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকরা সূচিকে মৃত ঘোষণা করলে লাশ আবার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।
খবরে হাজির হয় উত্তরা থানা পুলিশও। তারা লাশটি উদ্ধারের পাশাপাশি রাখিনা লিকমা, মাহবুব মোর্শেদ ও আদনান এবং সূচির ভাবী সুমি ও পাশের ভাড়াটিয়া লাকী আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যান থানায়।
সূচির ভাবি সুমি টাইম নিউজবিডি’র কাছে দাবি করেন, সূচির ঝুলন্ত শরীর দেখে আমি দিকবিদিক ভাবতে পারছিলাম না কি করবো। চিৎকার চেচামেচি করে সবাইকে ডেকেছি। ফোন করে উত্তরা পুলিশকে খবরটি দেয়া হয়।
সুমি বলেন, সূচির সহকর্মী বিমানবালা সৈয়দা রাখিনা লিকমা, কেবিন ক্রু মাহবুব মোর্শেদ ও মির্জা আদনানকে আমি খবর দেই নি। বিষয়টি আমার কাছে সন্দেহপ্রবণ মনে হওয়ায় পুলিশকে জানিয়েছি যে খবর না দেযা স্বত্তেও পুলিশের আগে তারা কিভাবে দ্রুত ঘটনাস্থলে চলে আসতে পারলো।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সূচির বন্ধুরা জানান, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে সূচীর সঙ্গে তাদের কথাবার্তা হয়েছে। এ সময় তার (সূচী) আচরণ ও কথাবার্তা ছিল অস্বাভাবিক ও এলোমেলো। সে সবাইকে ফ্ল্যাটে আসতে বলে। এজন্যই তারা সবাই সূচীর ফ্ল্যাটে ছুটে যায়।
নিহত সূচির পিতা পরিবহন ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, বিমান বাংলাদেশে কাজ শুরু করার পর সূচিকে একাধিকবার বিয়ের প্রস্তাব দেয় কেবিন ক্রু মাহবুব মোর্শেদ। কিন্তু সে বিবাহিত। বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মোর্শেদ সূচিকে উত্যক্ত করে। শফিকুল ইসলাম দাবি করে বলেন, আমাদের ধারণা মোর্শেদ কিংবা তার স্ত্রীর হাতেই আমার মেয়ে খুন হয়েছে।
সূচির চাচা হারুনুর রশিদের দাবিও একই। তিনি জানান, সূচিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তারা থানায় মামলা করবেন। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মোর্শেদ কিংবা তার স্ত্রী জড়িত বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সূচির পরিবারের এক আত্মীয় টাইম নিউজবিডি’কে জানান, বিমানের কেবিন ক্রু মাহবুব মোর্শেদ সূচিদের বাড়ি টাঙ্গাইলে একাধিকবার বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। অবশ্য শেষমেষ অন্য মেয়েকে বিয়ে করে মোর্শেদ। তবে বিয়ের পরও সূচির সঙ্গে রেখেছেন যোগাযোগ। সম্প্রতি তারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে একসঙ্গেই কাজ করছিল।
সূচির পরিবারের ওই আত্মীয় ভিন্ন আরও তথ্য দেন। তিনি জানান, মোবারক নামে লন্ডন প্রবাসী এক তরুণের সাথে সূচির টেলিফোনে বিয়ে হয়েছিল। ৫ বছর পূর্বে পারিবারিকভাবে অনুষ্ঠিত ওই বিয়েতে সূচির মত ছিল না। বিয়ের মাত্র এক মাসের মাথায় তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। তবে লন্ডন প্রবাসী মোবারক নামে ওই তরুন বিচ্ছেদের পরও সূচিকে ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠে। এমনকি সূচি, তার মা-বাবা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে নোয়াখালীর আদালতে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন মোবারক। মামলা থেকে রেহাই মিললেও সূচি পরিবারের পেছনে লেগে ছিল মোবারক।
এব্যাপারে উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম জানান, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও তদন্তের আগে কিছু বলা সম্ভব নয়। সূচির মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। গলায় ফাঁসের লাল কালচে কাটা দাগ ছাড়া শরীরে অন্য কোন আঘাতের চিহ্ন বা জখম পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে ভিকটিম গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আলী মাহমুদ টাইম নিউজবিডি’কে জানান, ঘটনার পর এখন পর্যন্ত নিহতের বন্ধুসহ ৩ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, প্রেমঘটিত বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল সূচি। এজন্যই সে আত্মহত্যা করে থাকতে পারে।
ঘটনার এই তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, তদন্তের প্রয়োজনে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদেরকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, আমরা এখনো ময়না তদন্তের রিপোর্ট হাতে পাই নি। নিহতের পরিবারের কেউ এখনও মামলা করেননি। মামলা হলে ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
তিনি আরও জানান, সূচির লাশ মেডিকেলে পাঠানোর সময পুলিশের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ১১১৬) করা হয়েছে। সূচি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বিষয়টি প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হলেও সত্যিকার অর্থে হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা,জেইউ,২১ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম)