উপজেলা নির্বাচনে খোদ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধেই বিধিবিধান ও নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিধান অনুযায়ী ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশের নির্দেশনা থাকলেও সরকারী দলের প্রার্থীদের বাঁচাতে ব্যক্তিগত তথ্যের হলফনামা প্রকাশ করছে না ইসি।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,এ নির্বাচনে ইসির ওয়েবসাইটে এখনো প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশ না করার বিষয়টি অবিশ্বাস্য।
ভোটের বাকি নেই আর এক সপ্তাহ,অথচ এখনও পর্যন্ত ইসির ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশ করা হয়নি। ইসির ওয়েবসাইটে উপজেলা নির্বাচনের একজন প্রার্থীর হলফনামাও প্রকাশ করা হয়নি।
অথচ উপজেলার প্রথম দফার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী চূড়ান্ত হয়ে গেছে ৯ দিন আগেই। ভোটগ্রহণ হবে আর ছয় দিন পর। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
মাঠপর্যায়ে রিটার্নিং অফিসারদেরও অনেকে ইসির স্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়ার দোহাই দিয়ে হলফনামার তথ্য কাউকে দিতে রাজি হচ্ছেন না।
নির্বাচন কমিশন যে নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়াল প্রস্তুত করেছে, তার চতুর্থ অধ্যায়ের ৪ নম্বর দফায় বলা হয়েছে,‘প্রার্থীদের কাছ হতে হলফনামার মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যাদি রিটার্নিং অফিসারকে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক প্রচার করতে হবে, যাতে ভোটারগণ প্রার্থীদের যাবতীয় তথ্যাদি বিচার-বিশ্লেষণ করে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করতে পারেন।
প্রার্থীর হলফনামার মাধ্যমে দাখিলকৃত তথ্যাদি লিফলেট আকারে ভোটারদের মাঝে প্রচার করতে হবে। লিফলেট উপজেলার হাট-বাজারে বা অন্য জনাকীর্ণ স্থানে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন এনজিও এরূপ প্রচারের বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে। তাদের কাছে এ তথ্য সহজলভ্য করতে হবে।
যেই দিন যে প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করবে,সম্ভব হলে সেদিনই সে প্রার্থীর তথ্যাদি প্রদানের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রয়োজনে সিডির মাধ্যমেও তথ্যাদি কপি করে দেয়া যেতে পারে। এসব তথ্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হবে।
প্রসঙ্গত,উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীকে রিটার্নিং অফিসারের কাছে নির্ধারিত ফরমে সাতটি তথ্যসংবলিত হলফনামা জমা দিতে হয়। হলফনামায় প্রার্থীর সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণ (সার্টিফিকেটের সত্যায়িত কপিসহ),বর্তমান ও অতীতের ফৌজদারি মামলার বিবরণ,ব্যবসা বা পেশার বিবরণী,আয়ের উৎস বা উৎসগুলো,প্রার্থীর নিজের ও অন্য নির্ভরশীলদের পরিসম্পদ ও দায়ের বিবরণী এবং ঋণের তথ্য দিতে হয়।
‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা-২০১৩’-এর বিধি ১৭-এর উপবিধি (৩) এর দফা (ঙ) অনুসারে কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা জমা না দিলে, জমা দেওয়া হলফনামায় অসত্য তথ্য বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে অথবা হলফনামায় উল্লিখিত কোনো তথ্যের সমর্থনে যথাযথ সার্টিফিকেট,দলিল,ইত্যাদি দাখিল না করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।
এ অপরাধে রিটার্নিং অফিসার নিজ উদ্যোগে অথবা এ বিষয়ে কারো আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন।
কিন্তু এসব বিধিবিধান নির্দেশনা শুধু কাগজে-কলমেই। নির্বাচন কমিশন নিজেই তা প্রতিপালন করছে না।
কয়েকজন নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,তাঁরা নিজেদের এ বিধিবিধান ও নির্দেশনা সম্পর্কে সেভাবে সচেতন নন।
নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ টাইম নিউজবিডিকে বলেন,উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা অনেক। এত প্রার্থীর হলফনামা ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটাররা যদি হলফনামা দেখতে চান তাহলে রিটার্নিং অফিসারের দপ্তর থেকে তা দেখতে পারেন।
নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়ালের নির্দেশনার বিষয়টি তাঁকে জানানো হলে তিনি বলেন,‘এটি আমাকে ভালো করে পড়ে দেখতে হবে।’
তবে ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন,‘উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করার পেছনে প্রার্থীদের সংখ্যাধিক্য কোন ফ্যাক্টর নয়, মূল কারণ অন্য জায়গায়।'
ওই কর্মকর্তা আরো জানান, ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনেও আমরা যথাসময়ে সব প্রার্থীর হলফনামা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছিলাম। এবারে না করার পিছনে ইসির অনীহাই দায়ী।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন,‘আমরা অনেক উপজেলার রিটার্নিং অফিসারের কাছে এ বিষয়ে সহযোগিতা পাচ্ছি না। ইসি সচিবালয়েরও সহযোগিতা পাইনি। এই আচরণ অবিশ্বাস্য। প্রার্থীর হলফনামা ইসির ওয়েবসাইটে থাকলে সেখান থেকে আমরা সহজেই তা সংগ্রহ করতে পারতাম। কিন্তু একটি মীমাংসিত বিষয়কে কী কারণে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।’
২২ ডিসেম্বর সিইসির সঙ্গে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নির্বাচন কমিশন সমন্বয় উপকমিটির সদস্যরা দেখা করে ওয়েবসাইটে হলফনামার তথ্য প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু ওই তথ্য প্রকাশের পক্ষে আইনগত মজবুত ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও ইসি নিজেদের পক্ষে তাঁদের এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলতে পারেনি।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের হলফনামা যথাসময়ে প্রকাশের পর তা থেকে তথ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানা রকমের নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ হতে থাকলে এক পর্যায়ে রহস্যজনকভাবে ইসির ওয়েবসাইটে ভুতুড়ে আচরণ শুরু হয়; হলফনামা উধাও হয়ে যায়।
[b]ঢাকা, এএ, ১২ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম) // কে বি [/b]
শ্রেণীহীন
নির্বাচন কমিশনই মানছে না নির্বাচনী বিধিমালা
উপজেলা নির্বাচনে খোদ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধেই বিধিবিধান ও নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিধান অনুযায়ী ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশের নির্দেশনা থাকলেও সরকারী দলের প্রার্থীদের বাঁচাতে ব্যক্তিগত তথ্যের হলফনামা প্রকাশ করছে না ইসি।





