দিনাজপুরে রেকর্ড পরিমাণ আলু চাষ হয়েছে এবার। কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় চাষীদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে করুণ আর্তনাদ। কারণ নতুন উৎপাদিত ১৮ কেজি আলু বিক্রি করে এক কেজি মোটা চাল কিনতে হচ্ছে চাষীদের। এক কাপ চায়ের দামে বিক্রি হচ্ছে ৩ কেজি আলু। বাজারে প্রতি কেজি আলু গড়ে বিক্রি হচ্ছে ১ টাকা ৮০ পয়সা দরে।
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার প্রাণনগর গ্রামের আলু চাষী আব্দুর রশিদ বলেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে সমিতি এবং এনজিও হতে ঋণ গ্রহণ করে এক একর জমি ৮ হাজার টাকা চুক্তিতে আলু চাষ করেছিলাম। ওই জমিতে সার,বীজ,কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরিসহ খরচ হয়েছে ৫৫ হাজার ২০০ টাকা। জমি চুক্তি ও কৃষি উপকরণ এবং শ্রমিকের মজুরিসহ সর্বমোট ব্যয় হয়েছে ৬৩ হাজার ২০০ টাকা। এক একর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে ৮ হাজার কেজি। এক টাকা ৮০ পয়সা কেজি দরে ৮ হাজার কেজি আলু বিক্রি করে পাওয়া গেছে ১৪ হাজার ৪০০ টাকা। জমির মালিককে ৮ হাজার টাকা পরিশোধ করে অবশিষ্ট আছে মাত্র ৬ হাজার ৪০০ টাকা। এমন কাহিনী উপজেলার অনেক কৃষকের।
বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার নিখিল চন্দ্র বিশ্বাস জানান,এবার রেকর্ড পরিমাণ আলু চাষ হয়েছে। ছাড়িয়ে গেছে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা। দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে ঝুঁকিতে পড়ে ব্যবসায়ীরা সর্তকতার সঙ্গে ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। এর প্রভাব পড়েছে পল্লীবাজারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আলু চাষীরা। কিন্তু কৃষককেরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে সরকার এবং কৃষিবিভাগ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি জানিয়েছেন,উপজেলায় ৬ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৩০ হাজার ১৪৫ মেট্রিক টন। আলুর মোট চাষ হয়েছে ১০ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে। এবার ফলন ভালো হওয়ায় এক লাখ ৯৮ হাজার ৩৫২ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
শুধু বীরগঞ্জে নয়,উত্তরের শস্যভান্ডার দিনাজপুরে এবার আগাম আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু আলু তুলে বিক্রি করে মজুরের টাকা না উঠায় এবার ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ আলু। উৎপাদিত আগাম জাতের আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষকরা। অন্যদিকে পাওনাদারদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেক আলু চাষী। আলু বিক্রি করে চাষীদের উঠছে না উৎপাদন খরচ।
গত বছর আগাম আলুর বাজার মূল্য ভাল পাওয়ায় এবার দ্বিগুণ জমিতে আলুর চাষ করেন বিরল উপজেলার কৃষক মতিউর রহমান। ফলনও পেয়েছেন ভাল। বেশ খোশ মেজাজেই ছিলেন তিনি। কিন্তু দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আলু বিক্রি করতে না পেরে ক্ষেতের আলু ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে। শুধু কৃষক মতিউর নয়,এমন অবস্থা দিনাজপুরের অসংখ্য কৃষকের। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আলু জেলার বাইরে যেতে না পারায় জেলার হাট-বাজারগুলোতে আলুর স্তুপ জমছে। এতে কম দামে ক্রেতারা আলু কিনতে পেরে একটু স্বস্তি পেলেও বিক্রেতারাও পড়েছেন বিপাকে। বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ২ টাকা কেজি দরে। কৃষক পাচ্ছে না আলুর ন্যায্য দাম। উৎপাদিত আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। দর কমে যাওয়ায় ফলন ভাল পেলেও হতাশ তারা।
লাভজনক ফসল হওয়ায় জেলায় এবার ৩৫ হাজার ৪৭৪ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। চাষ হয়েছে ৪৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে। এরমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক হয়েছে আগাম আলু চাষ।
আগাম চাষাবাদ করে এ অঞ্চলের কৃষকরা এবার আলুর বাম্পার ফলন পেয়েছেন। কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা পড়েছেন মহাবিপাকে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে আলু চাষাবাদের পরিধি আরও কমে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
ঢাকা, ২৮ জানুয়ারি(টাইমনিউজবিডি)// জেআই