বাংলার বাঘ খ্যাত এ কে ফজলুল হকের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি বহুগুণের অধিকারী ছিলেন, বাংলার মানুষের কাছে তিনি শের-ই বাংলা হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন।
১৯৬২ সালের এদিন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশালের রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে।
১৮৮৯ সাথে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় মুসলামানদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৮৯১ কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পাস করেন।
১৮৯৩ সালে তিনি গণিত, রসায়ন ও পদার্থ বিদ্যায় প্রথম শ্রেণীতে বি.এ.পাস করেন। এবং ইংরেজি বিভাগে এম.এ ক্লাশে ভর্তি হন। ১৮৯৭ সালে তিনি লর্ড রিপন কলেজে ভর্তি হয়ে বি.এল. পাস করেন।
আশুতোষ মুখার্জির হাত ধরে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯০০ সালে তিনি ওকালতিতে যোগদান করেন এবং ১৯০১ সালে তিনি বরিশালে ফিরে আসেন। ১৯০৩-১৯০৪ সাল পর্যন্ত তিনি বরিশাল বারের সহকারী সম্পাদক হিসেবে জয় লাভ করেন।
এম.এ পাস করার পর শেরে বাংলা একে ফজলুল হক নবাব আব্দুল লতিফ সি আই ই-এর পৌত্রী খুরশিদ তালাত বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৯০৬ সালের ওকালতি ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
[b]কর্মজীবন
বঙ্গীয় আইন পরিষদ[/b]
১৯১৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এ. কে. ফজলুক হক বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৫ সালে পুনরায় ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
[b]নিখিল ভারত মুসলিম লীগ[/b]
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ নিয়ে বাংলার জনগণ বিভক্ত হয়ে পড়লে, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ উপলব্ধি করেন মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি সংগঠন দরকার। এই চিন্তা থেকেই ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্স আহবান করেন। এই কনফারেন্সে নবাব সলিমুল্লাহ নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নামে রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন ও সেই প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। অবশেষে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের সূত্রপাত ঘটে।
[b]নিখিল ভারত কংগ্রেস[/b]
১৯১৪ সালে ফজলুল হক নিখিল ভারত কংগ্রেসে যোগ দেন। একই সঙ্গে তিনি মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস দলের নেতা হয়ে উঠেন। ১৯১৮ তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন।
[b]খেলাফত আন্দোলন[/b]
এ. কে. ফজলুক হক খেলাফত আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর খেলাফত আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এ. কে. ফজলুক হক নিখিল ভারত খেলাফত কমিটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
[b]বাংলার শিক্ষামন্ত্রী এ. কে. ফজলুক হক[/b]
১৯২২ সালে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে এ. কে. ফজলুক হক খুলনা উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা করেন এবং নির্বাচিত হন। ১৯২৪ সালে খুলনা অঞ্চল থকে তিনি পুনরায় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং এ সময় বাংলার গভর্ণর ছিলেন লিটন ফজলুল হককে বাংলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিয়োগ করেন।
[b]কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচন[/b]
১৯৩৫ সালে এ. কে. ফজলুক হক কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। তিনিই কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র।
[b]কৃষক রাজনীতি[/b]
১৯২৪ সালে শিক্ষামন্ত্রীর পদে ইস্তফা দেয়ার পর থেকে আবুল কাশেম ফজলুল হক সম্পূর্ণরূপে জড়িয়ে পড়েছিলেন কৃষকদের রাজনীতি নিয়ে। ১৯২৯ সালে নিখিল বঙ্গ প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতায়। ঢাকায় প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৪ সালে। এই সম্মেলনে এ. কে. ফজলুক হক সর্বসম্মতিক্রমে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। এই প্রজা সমিতির মধ্য দিয়েই পরবর্তিতে কৃষক-প্রজা পার্টির সূত্রপাত ঘটে।
[b]১৯৩৭ সালের নির্বাচন[/b]
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টি ৩৯টি আসন ও মুসলীম লীগ ৩৮ টি আসন লাভ করে। নির্বাচনে মুসলিম লীগের সথে সমঝোতায় গিয়ে এ. কে. ফজলুক হক ১১ সদস্য বিশিষ্ট যুক্ত মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেরে বাংলা।
[b]লাহোর প্রস্তাব[/b]
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলীম লীগের অধিবেশনে সভাপতি ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের উপস্থাপক ছিলেন এ. কে. ফজলুক হক। এই লাহোর প্রস্তাবই “পাকিস্তান প্রস্তাব” হিসেবে পরবর্তীকালে আখ্যায়িত হয়।
[b]মুসলিম লীগে যোগদান[/b]
১৯৪৬ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচনে বরিশাল অঞ্চল ও খুলনার বাগেরহাট অঞ্চল থেকে প্রার্থী হয়ে তিনি নির্বাচিত হন। কিন্তু, দলীয় ভাবে পরাজিত হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভা গঠন করেন ও বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই নির্বাচনের পর দলীয় নেতাকর্মীদের চাপে হক সাহেব মুসলিম লীগে যোগ দেন। কিন্তু দলের সদস্য হিসেবে তিনি ছিলেন নীরব।
[b]কৃষক শ্রমিক পার্টি গঠন[/b]
১৯৫৩ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় তার বাসভবনে কৃষক-প্রজা পার্টির কর্মীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে দলের নাম থেকে প্রজা শব্দটি বাদ দিয়ে ‘কৃষক শ্রমিক পার্টি’ গঠন করা হয়। আবদুল লতিফ বিশ্বাসকে সাধারণ সম্পাদক করে এই পার্টির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এ. কে. ফজলুক হক।
[b]যুক্তফ্রন্ট গঠন[/b]
১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর এ. কে. ফজলুক হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে গঠিত হল যুক্তফ্রন্ট। এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ ৯ টি আসন লাভ করে। ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল এ. কে. ফজলুক হক চার সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয় ১৫ মে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেরে বাংলা।
পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এ. কে. ফজলুক হক
যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি ছিল। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিপরিষদ এই ২১ দফা বাস্তবায়নের জন্য তৎপর হন। তাদের গৃহিত উল্লেখ্যযোগ্য কর্মসূচিগুলো হলো:
১. বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ।
২. ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা।
৩. ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতিতে ‘শহীদ মিনার’ নির্মাণ।
৪. বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা।
৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বর্ধমান হাউসকে বাংলা ভাষা গবেষণা কেন্দ্র বা বাংলা একাডেমি ঘোষণা করা।
৬. জমিদারি ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া।
[b]১৯৫৫-এর নির্বাচন[/b]
১৯৫৫ এর ৫ জুন সংখ্যাসাম্যের ভিত্তিতে পুনরায় গণপরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। মুসলিম লীগের চৌধুরী মোহাম্মদ আলী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন। এ. কে. ফজলুক হক ছিলেন এই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। হোসেন সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বিরোধী দলের নেতা।
[b]পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর[/b]
১৯৫৬ সালের ২৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালের ১ এপ্রিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার তাকে গভর্ণরের পদ থেকে অপসারণ করে। এরপরই তিনি তার ৪৬ বছরের বৈচিত্রময় রাজনৈতিক জীবন থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।
[b]মৃত্যু[/b]
১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১০ টা ২০ মিনিটে এ. কে. ফজলুক হক ৮৬ বছর ৬ মাস বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ২৮ এপ্রিল সকাল সাড়ে দশটা পর্যন্ত তার মরদেহ ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় তার ২৭ কে. এম. দাস লেনের বাসায় রাখা হয়। সেদিন সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকার পল্টন ময়দানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাকে সমাহিত করা হয়। একই স্থানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিনের কবর রয়েছে। তাদের তিনজনের সমাধিস্থলই ঐতিহাসিক তিন নেতার মাজার নামে পরিচিত। রেডিও পাকিস্তান সেদিন সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে সারাদিন কোরআন পাঠ করে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে তার প্রতি সম্মান দেখানো হয়। ৩০ এপ্রিল সোমবার পাকিস্তানের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্কুল কলেজে ছুটি ঘোষণা করা হয়।
[b]ঢাকা, ২৭ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি) //এমএ[/b]
শ্রেণীহীন
রিক্ত হস্তেই ফিরে গিয়েছিলেন বাংলার বাঘ
বাংলার বাঘ খ্যাত এ কে ফজলুল হকের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি বহুগুণের অধিকারী ছিলেন, বাংলার মানুষের কাছে তিনি শের-ই বাংলা হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন।





