গত ৪ বছরে রাজউকের ২ শতাধিক প্লটের আকার বৃদ্ধির তথ্য উপাত্ত পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)  । আর এই প্লট গ্রহিতাদের মধ্যে রয়েছে সাবেক ও বর্তমান বিচারক, মন্ত্রী,এমপি,আইনজীবী, রাজনীতিক, আমলা, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও বিত্তবান প্রভাবশালীদের নাম।
সূত্র মতে, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শওকত হোসেন নিজে, স্ত্রী ড.আয়শা বেগম ও মাতা  জাকিয়া আমজাদের নামে নীতিমালা লঙঘন করে রাজউকের ৩  টি প্লটের আকার ইচ্ছা মাফিক বৃদ্ধি করে নেন। এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়ে দুদক আরো ২ শতাধিক  প্লটের আকার বৃদ্ধির চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে দুদক।
জানা যায়,রাজউকের চেয়ারম্যান,বোর্ড সদস্য এবং কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় প্রভাবশালী ও বিত্তবানরা  রাজউকের উত্তরা আবাসিক প্রকল্প, উত্তরা সম্প্রসারিত আবাসিক প্রকল্প, পূর্বাচল নিউ টাউন প্রকল্প এবং কেরাণীগঞ্জ ঝিলমিল প্রকল্প থেকে ১৫টি ক্যাটাগরির ২ শতাধিক প্লটের আকার বৃদ্ধি করে নিয়েছেন।
এদিকে গত ২ এপ্রিল দুদকের অনুসন্ধানী কর্মকর্তা উপপরিচালক যতন কুমার রায় রাজউকের  বর্ধিত প্লট বরাদ্দের তালিকাসহ আনুষাঙ্গিক নথিপত্র চেয়ে চিঠি দেন রাজউককে। ওই চিঠির আলোকে রাজউক ১৫ এপ্রিল দুদকে একটি তালিকা সরবরাহ করে। গত ৪ বছরে রাজউকের অন্তত ১৫টি বিধি লঙঘন করে ২ শতাধিক বর্ধিত আকারের প্লট বরাদ্দের তথ্য রয়েছে। রাজউক প্লটগুলো বরাদ্দ প্রাপ্তদের নামের তালিকায় রয়েছেন- বিচারক, মন্ত্রী , এমপি, রাজনীতিক, আমলা,দুদক কর্মকর্তা,পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তা, ডাক্তার, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী পেশাজীবীরা। এদের মধ্যে সাবেক এবং বর্তমান মন্ত্রী, এমপি, বিচারক, আমলা এবং সরকারি কর্মকর্তার নাম রয়েছে।
তথ্য গোপন করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৩টি প্লটের আকার বৃদ্ধি করে নেয়ার অপরাধের অভিযোগে গণপূর্ত মন্ত্রলালয়ের সাবেক সচিব (বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ সচিব) ড. খন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে গত ২২ এপ্রিল মতিঝিল থানায় ৩টি মামলা(মামলা নং-৭,৮,৯) দায়ের করে দুদক।
এর আগে দুদকের অনুসন্ধানী কর্মকর্তা যতন কুমার রায় কয়েক দফায় সাবেক পূর্ত সচিব শওকতের  ৩টি প্লটের আকার বৃদ্ধির ঘটনায় তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোঃ নূরুল হুদা, বোর্ডের সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার (অর্থ), আখতার হোসেন ( এস্টেট), এম. মাহবুবুল আলম (উন্নয়ন), সদস্য নাজমুল হাই (প্রশাসন ও ভূমি), শেখ আব্দুল মান্নান (পরিকল্পনা), সাবেক চেয়ারম্যান শহীদ আলম, মোঃ আজিজুল হক, সাবেক সদস্য একেএম হারুন, নাসির উদ্দিন, রিয়াজুল করিম, সাবেক সচিব আতাউল হক মোল্লা, সাবেক পরিচালক  (এস্টেট) মোঃ শামছুল আলম, রেজাউল করিম তালুকদারসহ ২০জন সাবেক ও বর্তমান রাজউক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু রাজউকের কোনো কর্মকর্তাকে এই মামলায় আসামি না করায় নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন দুদক নীতি নির্ধারণী কর্মকর্তারা।
এই ঘটনায় মিডিয়ায়, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এবং রাজনৈতিক ও পেশাজীবী মহলেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়েছে রাজউকের প্লটের আকার বৃদ্ধি করে নেয়া সুবিধা ভোগীদের মাঝেও।
অভিযোগ উঠেছে, চারটি প্লকল্পে প্লট বরাদ্দ নিয়ে কোটি কোটি টাকা ঘুষ বানিজ্যে মেতে উঠেন রাজউকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। সীমিত আয়ের নিরীহ মানুষদের প্লট নানা অজুহাতে কেড়ে নিয়ে তুলে দিচ্ছেন বিত্তবান, ক্ষমতা ও প্রভাবশালীদের হাতে।
গত ৪ বছরে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান খান রাজউকের ৩টি আবাসিক প্রকল্পের লে-আউট পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলেন। প্রস্তাবিত লে-আউটে যেখানে লেক, সবুজ চত্বর, পার্ক, মাঠ ছিল সেগুলো কমিয়ে ও আয়তন ছোট করে প্লটের সংখ্যা বাড়ান।
এর মধ্যে পূর্বাচলের ১৭ ও ১১ নম্বর সেক্টরের মাঝখানে লেকের প্রস্থ কমিয়ে প্লটের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। ১৭ নম্বর সেক্টরে ৭টি সারিতে প্লট ছিল। পরে ২টি সারি বাড়িয়ে দেন। উত্তরা তৃতীয় পর্বে কূটনৈতিক এলাকা বাদ দিয়ে সাধারণ প্লট সৃষ্টি করেন। ঝিলমিল প্রকল্পে লেকের প্রস্থ কমিয়ে দেন। প্লটের সংখ্যা বাড়িয়ে আকার পরিবর্তনের নামে প্লটগুলো দেয়া হয়েছে প্রভাবশালীদের। অথচ কিস্তির টাকা পরিশোধ করে এখনো দখল বুঝে পাননি কয়েক হাজার গ্রাহক।
ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট-ডিআইটি (রাজউক) ১৯৬৯ সালের অ্যালোটমেন্ট অব ল্যান্ডস রুলস এবং বিধিতে পরিস্কারভাবে প্লট বরাদ্দ এবং আকার পরিবর্তনের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। ১৩ নম্বর বিধান অনুযায়ী কোনো কারণে যদি বরাদ্দের আবেদন বাতিল হলে, ১০ নম্বর বিধান অনুসরণ করে বাতিল করতে হবে। ১০ নম্বর বিধানে বলা হয়েছে, কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে আবেদন করলে তাৎক্ষণিকভাবে ও আবেদন বাতিল করা যাবে। আবেদনে মিথ্যা তথ্য প্রমাণিত হলেও কোনো কারণ দর্শানো ছাড়া বরাদ্দ বাতিল হতে পারে।
তবে পুন:বরাদ্দ দিতে হলে ৮ নম্বর বিধি অনুসারে সঠিক আবেদনকারী ও বরাদ্দ প্রাপ্তদের তালিকা  পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করতে হবে।
একইভাবে কোনো প্রকল্প থেকে কারো প্লটের বরাদ্দ বাতিল হলে বাতিলকৃত প্লট পুন:বরাদ্দ দিতে নতুন করে দরখাস্ত আহবান করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।
৮ নম্বর বিধিতে আরো বলা হয়েছে, আবেদনের মাধ্যমে প্লট প্রাপ্তদের নামের পত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে। আবার প্লট পেয়েও কোনো কারণে যদি বরাদ্দ বাতিল হয়ে যায় তার বাতিল তালিকা বিজ্ঞপ্তিতর মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। বরাদ্দ বাতিল প্লট বরাদ্দ দিতে নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরখাস্ত আহ্বান করতে হবে।
কিন্তু রাজউক শত শত প্লটের আকার বৃদ্ধির আবেদনের প্রেক্ষিতে বরাদ্দ দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে কোনো বিধি অনুসরণ করা হয়নি। পুনঃ বরাদ্দের জন্য নতুন করে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়নি।
ডিআইটি (রাজউক) রুলসের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরে নিজ মালিকানায় প্লট-ফ্ল্যাট-বাড়ি থাকলে রাজউকের প্রকল্পে আবেদন করতে পারবেন না।
রাজউকের পরিচালক (এস্টেট) মোহাম্মদ মুসা জানান, বিধি বহির্ভুত প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়নি।
চেয়ারম্যান মোঃ বদিউজ্জামান বলেন, রাজউকের বর্ধিত ও পরিবর্তিত আকারে প্লট বরাদ্দের বিষয়টি দেখার জন্যই রাজউক থেকে তালিকা আনা হয়েছে।এই বিষয়ে তদন্ত করার পর বলা যাবে রাজউক বিধি বহির্ভুতভাবে প্লট বরাদ্দ দিয়েছে কিনা।
দুদক সচিব মো.ফয়জুর রহমান চৌধুরী বলেন, প্লটের আকার বৃদ্ধি ,অনিয়ম এবং জালিয়াতির ঘটনায় খন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে ৩টি মামলা হয়েছে। তদন্তে ও ঘটনায় সংশ্লিষ্টদেরকেও চার্জশিটে আসামি করা হতে পারে। কারণ মামলা হলো প্রথম ধাপ, এরপরে আরো অনেক ধাপ রয়েছে।
[b]ঢাকা, একে, ২৫ এপ্রিল (টাইমনিউজবিডি.কম)// এনএস[/b]