দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতায় জানুয়ারি মাসে সারা দেশে ৩৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতরা পুলিশ, আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ১৮ দলীয় জোট সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং পেট্রল বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। জানুয়ারি মাসের প্রতিবেদনে মানবাধিকার লংঘনের বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এসব তথ্য জানায়।
৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ‘বিতর্কিত’ উল্লেখ করে সংগঠনটি জানায়, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হওয়ায় অধিকারও সরাসরি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু নানা হয়রানির মধ্যে থেকেও বিভিন্ন এলাকায় অধিকারের মানবাধিকার কর্মী ও বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীদের মাধ্যমে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের এসব তথ্য সংগ্রহ করে অধিকার। তবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধনী ২০০৯ ও ২০১৩) বলবৎ থাকার কারণে প্রতিবাদ হিসেবে অধিকারের এ প্রতিবেদনটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি। অধিকার এ নিবর্তনমূলক আইনটি বাতিলের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে।
[b]রাজনৈতিক সহিংসতায় এক মাসে নিহত ৩৯: [/b]
অধিকার জানায়, ১৫৩টি আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার কারণে ৯ কোটি ১৯ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬১ জন ভোটারের মধ্যে ৪ কোটি ৮০ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগের কোনো সুযোগ পাননি। ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বিরোধীদলীয় জোট নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দেয়ায় সহিংসতা শুরু হয় বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। ২৫ নভেম্বর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরপরই বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট লাগাতার অবরোধ ও হরতালের ডাক দেয়। ওইদিন থেকে ১০ জানুয়ারি দুর্বৃত্তদের ককটেল ও পেট্রল বোমা হামলায় ২১ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হন। পরে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে আরও ১৮ জন মারা যান। সারা দেশে নির্বাচন-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে অনেক সাধারণ মানুষ গণগ্রেফতারের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
[b]নির্বাচন-পরবর্তী ধর্মীয় সংখ্যালঘু নাগরিকদের ওপর হামলা: [/b]
নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের ওপর হামলা হয়। এ সময় তাদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে আক্রমণ করা হয়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনের পরই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য পরিকল্পিতভাবে হামলা করা হয়েছে। যা এখনও হচ্ছে। এ হামলাগুলোর ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যেসব দুর্বৃত্ত এসব অপরাধ করেছে, তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছে অধিকার।
[b]প্রতিদিন গড়ে একজন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার: [/b]
বিতর্কিত নির্বাচনের পর যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিচারবহিভর্‚তভাবে হত্যার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ৫ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত শুধু যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১১ ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। যাদের মধ্যে তিনজন বিএনপি, সাতজন জামায়াতের কর্মী ও একজন কথিত অপরাধী বলে জানা গেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ৩৯ জনের মধ্যে ২০ জন ক্রসফায়ারে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ১১ জন বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের সদস্য, ১৫ জন জামায়াত ও শিবির সদস্য, একজন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সদস্য, একজন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) সদস্য ও ১০ জন কথিত অপরাধী বলে জানা গেছে। একজনের পেশা জানা যায়নি।
[b]মত প্রকাশ ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা: [/b]
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার বিরোধীদলীয় ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া- চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, আমার দেশ ও ইনকিলাব বন্ধ করে দিয়েছে। আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও ইনকিলাবের তিন সাংবাদিককে গ্রেফতার করে কারাগারে আটক রেখেছে।
[b]সীমান্তে বিএসএফের মানবাধিকার লংঘন অব্যাহত :[/b] ২০১৩ সালে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ২৯ জন নিরস্ত্র বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করে। ২০১৪ সালেও এই ধারা অব্যাহত আছে। জানুয়ারি মাসে বিএসএফ সীমান্তে বাংলাদেশীদের ওপর মানবাধিকার লংঘনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে বিএসএফ একজন বাংলাদেশীকে নির্যাতন করে হত্যা করা ছাড়াও চারজনকে আহত করেছে। একই সময়ে বিএসএফের হাতে অপহৃত হয়েছেন ১৩ জন।
[b]গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা অব্যাহত: [/b]
২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে ১৬ ব্যক্তি গণপিটুনিতে মারা গেছেন। মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অস্থিরতার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে বলে অধিকার মনে করে।
তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকদের অবস্থা:
জানুয়ারি মাসে তৈরি পোশাক শিল্প কারখানাগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় ৬০ শ্রমিক আহত এবং ২০ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। বিক্ষোভের বেশির ভাগ ঘটনাই শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা বা ওয়েজবোর্ড নির্ধারিত বেতন বৃদ্ধির দাবিতে সংঘটিত হয়।
[b]নারীর প্রতি সহিংসতা: [/b]
নারীর প্রতি সহিংসতা এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অধিকার মনে করে অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। জানুয়ারি মাসে ১২ জন নারী যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজনকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে এবং পাঁচজন বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২ জন নারী ও মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জন নারী, ১৯ জন মেয়ে শিশু ও দুইজনের বয়স জানা যায়নি। ১১ জন নারীর মধ্যে দুইজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং তিনজন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ১৯ জন মেয়ে শিশুর মধ্যে একজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং একজন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এছাড়া চারজন নারী ও মেয়ে শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এক মহিলাকে ধর্ষণ চেষ্টার সময় হত্যা করা হয়েছে। ১৩ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে আÍহত্যা করেছে একজন মেয়ে শিশু। এছাড়া বখাটে কর্তৃক আহত হয়েছেন একজন নারী। একজন লাঞ্ছিত ও ১০ জন নারী বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটে বা তাদের পরিবারের সদস্যদের আক্রমণে পাঁচজন পুরুষও আহত হয়েছেন।

[b]ঢাকা, ইএইচ, ২ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসএমএ[/b]