রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের মূল হোতা ছিল মুসাউয়ের জুনায়েদ আব্দুস সালাম ওরফে জুনায়েদ। নিজে অস্ত্র ব্যবহার করতো। পাশাপাশি অস্ত্র ভাড়াও দিতো। মূলত রাজধানীর তেজগাঁও, মহাখালী, বনানী, গুলশান, বাড্ডাসহ আশপাশের এলাকার চোর থেকে শুরু করে ছোট বড় সন্ত্রাসীরা জুনায়েদের কাছ থেকে অস্ত্র ভাড়া নিতো।
রাজধানীর অভিজাত এলাকায় অবস্থান নিয়ে অবৈধ অস্ত্রের গ্যাং লিডার হিসেবে কাজ করতো জুনায়েদ। ঘন ঘন কৌশল পরিবর্তন করায় এই চক্রের মূল হোতাকে ধরা তো দূরের কথা পুরো চক্রটি ছিল পুলিশের ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
তবে গত শনিবার জুনায়েদকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয় পুলিশ। আদালতের মঞ্জুর করা ৩ দিনের রিমান্ডের প্রথম দিন ‍জিজ্ঞাসাবাদে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয় জুনায়েদ।
গত শনিবার দিবাগত রাতে ছিনতাই ও এক ছাত্রকে অপহরণকালে পুলিতের হাতে ধরা পড়ে জুনায়েদ। পরে তার দেয়া তথ্যানুযায়ী বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ির ১০৫ নম্বর বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমান অস্ত্র, গুলি, পেট্রল, বোমা, বাঘ ভাল্লুকের চামড়া, দেশি-বিদেশি ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ। অভিযানে ওই বাসা থেকে তার কথিত স্ত্রী আফসারা রুশিদ, মা রোখসানা ও এক সহযোগী তুষারকেও আটক করে পুলিশ।
এই ঘটনায় পুলিশ দ্রুত বিচার, প্রাণী সংরক্ষণ নিরাপত্তা ও অস্ত্র আইনে দুটিসহ মোট ৪টি মামলা দায়ের করে। এছাড়া আসামিদের প্রত্যেককে ৫দিন করে রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠায়। আদালত ৪ আসামির চার মামলায় বিভিন্ন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তারা রিমান্ডে বনানী থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। আদালতের মঞ্জুর করা তিন দিনের রিমান্ডের প্রথম দিনে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে উক্ত তথ্য দেয় জুনায়েদ।
বনানী থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জুনায়েদ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। তথ্য গুলো যাচাই করছি। চক্রের অপরাপর সদস্যদের আটক করতে জুনায়েদকে সাথে নিয়েও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
বনানী থানার অফিসার ইন চার্জ (ওসি) ভুঁইয়া মাহবুব হোসেন টাইম নিউজবিডি’কে জানান, প্রত্যেক আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে জিজ্ঞাসবাদে আসামিদের মধ্যে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য দিয়েছে জুনায়েদ। উর্ধ্বোতন কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হচ্ছে। তার নিকট যে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ ছিল সে ব্যাপারে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তার নিকট থেকে পাওয়া তথ্য আমরা যাচাই-বাছাই করছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুনায়েদের প্রথম টার্গেট ছিল রাজধানীর অভিজাত এলাকা। তবে তেজগাঁও, বাড্ডা, রামপুরা, ভাটারা,খিলক্ষেত ও উত্তরাতেও তাঁর নজরদারি ছিল। এসব এলাকার অবৈধ অস্ত্রের গ্যাং লিডার ছিল সে। প্রয়োজনে নিজেও অস্ত্র ব্যবহার করতো। পাশাপাশি ভাড়াটে ছিঁচকে চোর কিংবা এলাকার অন্যান্য ছোট–বড় সন্ত্রাসীদের অস্ত্র দৈনিক হিসেবে ভাড়া দিতো।
জুনায়েদের অস্ত্রের যোগান আসতো ভারত থেকে রাজশাহী, চাঁপাই সীমান্ত হয়ে। চড়া দামে অস্ত্র বিক্রি করতো। এছাড়া নিয়মিতভাবে অস্ত্রের গুলিও বিক্রি করতো।
অপরদিকে অভিজাত পরিবারের সন্তান বিশেষ করে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া ছেলেদের ভালবাসার ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করতো। এক্ষেত্রে কাজে লাগাতো কথিত স্ত্রী আফসারাকে। যারা দামি দামি গাড়ি নিয়ে আসতো তাদেরকে আফসারা ভালবাসার ফাঁদে ফেলতো। পরে সাঙ্গপাঙ্গদের লাগিয়ে জুনায়েদ হাতিয়ে নিতো লাখ লাখ টাকা। লোকজনকে ব্ল্যাক মেইল থেকে শুরু করে ছিনতাইয়ের কাজেও আফসারাকে ব্যবহার করতো জুনায়েদ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জুনায়েদ শর্টগান ব্যবহার করতো। ১৫টি বিদেশি পিস্তল তার নিকটে থাকার কথা। অধিকাংশ অস্ত্র তার লকার,  বাড়ির ভেতরে দক্ষিণ পূর্ব কোণায় ফুলের টবের নিচে এবং তার প্রাইভেট কারের নিচের বিশেষায়িত জায়গায় রাখতো।
অন্যদিকে গ্রেফতারকৃত জুনায়েদকে বনানী থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও জিজ্ঞাসা করছে। জোনায়েদকে ঘিরে এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় ও সচেতন। জোনায়েদের সাথে আন্তর্জাতিক কোনো জঙ্গি সংগঠনের যোগযোগ রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
মঙ্গলবার গোয়েন্দা পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে জানিয়েছে বনানী থানা পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছি। কিছু বিষয়ে আমরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে আপাতত কিছু কিছু বলা যাচ্ছে না।
গুলশান জোনের ডিসি খন্দকার লুৎফুল কবীর টাইম নিউজবিডিকে জানান, পুরো চক্রটিকে ধরার জন্য জুনায়েদকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জুনায়েদকে সাথে নিয়ে বনানী বারিধারা এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। ২৪ ঘন্টার রাউন্ড ডিউটি অব্যাহত রয়েছে।
[b]ঢাকা, জিইউ, ১২ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেএইচ[/b]