রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭-এ অবস্থিত দৃক গ্যালারীতে প্রচুর মানুষের আনাগোনা। মানুষের ভীড়ে ছুটাছুটি করছে মেঘ। আগন্তুকরা অবাক চোখে গ্যালারিতে ছবি দেখতে ব্যস্ত থাকলেও মেঘকে ব্যস্ত দেখা যায় স্মৃতি হয়ে যাওয়া বাবা-মায়ের ছবি সাজাতে।
মেঘের সঙ্গে কথা হয় খেলাচ্ছলে। প্রশ্ন না করলেও তার কথায় ঘুরে ফিরে আসে বাবা-আর মায়ের কথা। মা-বাবার খুনিদের মেঘ এখনও জানে চোর হিসেবে। আর সে চোরদের শাস্তি দিতে একটি পিস্তলের জন্য প্রার্থনা সৃষ্টিকর্তার কাছে। মেঘের মামা নওশের আলম রোমান ব্যস্ত চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন নিয়ে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392105009.JPG[/img]
বাবা-মায়ের ছবিই এখন তার সব স্মৃতি। প্রতিটি ছবির মধ্যে গল্প লুকানো। যা এখন একমাত্র সম্বল তার। ছোট্ট এ শিশুটির যতটুকু স্মৃতি ছিল বাবা-মায়ের সঙ্গে তা সবকিছু মনে নেই। যতটুকু মনে আছে তা নিয়েই বেড়ে উঠছে সে। যখনই তাদের ছবি দেখে তখনই বাবা-মাকে নিয়ে স্মৃতির ঘোরে ডুবে যায় মেঘ। পরিচিত বন্ধু পেলেই মাকে নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বলে বেড়ায় অনর্গল।
কথার এক ফাঁকে মেঘ এই প্রতিবেদককে বলে বসে “দেখুন এই বইটি, আপনি কি জানেন আমার আব্বু বই লিখেছেন? আমার বাবার লেখা বইটির দাম দেড়শ টাকা। যদি চান তবে একটা বই নিতে পারেন।” বাবা মায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে এভাবেই বাবা মাকে ‘মনে করেছে’ শিশু মেঘ।
নিজ বাড়িতে খুন হওয়া সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির পরিবারের উদ্যোগে রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭-এ অবস্থিত দৃক গ্যালারীতে আয়োজন করা হয়েছে তিনদিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনী। সেখানে এসব কথা বলে সাংবাদিক দম্পত্তির শিশু পুত্র মেঘ।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392105053.JPG[/img]
মেঘ রাজধানীর উইলিয়াম কেরি ইন্টারন্যাশনার স্কুলের সিনিয়র কেজি শ্রেণীর শিক্ষার্থী। পুরো প্রদর্শীতে ঘুরে বারবার বাবা মায়ের ছবির দিকে তাকাতে দেখা গেছে মেঘকে। হঠাৎ হঠাৎ ছুটে যায় আগন্তুকদের সাথে আসা শিশুদের সাথে খেলার জন্য।
দুই বছর আগে সকালে ঘুম ভেঙে উঠে বাবা-মায়ের শোবার ঘরে তাদের রক্তাক্ত লাশ দেখে নানিকে খবর দিয়েছিল সাড়ে ৫ বছরের ছোট্ট মেঘ। 
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর তাদের সাড়ে পাঁচ বছরের শিশু সন্তান মেঘের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অনেকে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ঘোষণাও এসেছিল মেঘের দায়িত্ব নেবার প্রতিশ্রতির। প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের খুনিদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার। ঘটনার দু’বছর পার হয়েছে। মেঘের বয়স এখন সাড়ে ৭ বছর। এখন একটু একটু বুঝতেও শিখেছে মেঘ। কিন্তু পিতামাতা হারা অসহায় মেঘের পাশে কেউ নেই।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392105307.jpg[/img]
মা-বাবার স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানো মেঘ বড় হচ্ছে স্বজনদের স্নেহের পরশ নিয়ে। তার স্মৃতিতে এখন বাবা আর মায়ের মুখচ্ছবি। যদিও স্বজনরা ভয়াবহ সেই স্মৃতি ভুলে মেঘকে স্বাভাবিকভাবে চলার পথ প্রশস্ত করতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মেঘের স্বজনদের দাবি কেউ তার দায়িত্ব নিক এটি তারা নিজেরাও চান না। তারা চান হত্যাকাণ্ডের বিচার।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392105145.jpg[/img]
মন্তব্য লেখার ডায়েরিতে নিহত সাংবাদিকদের মনে করে মন্তব্য লেখার সময় মেঘ অপলক তাকিয়ে থাকে। সেসময় এই প্রতিবেদককে মেঘ প্রশ্ন করে “তোমার হাতের লেখা সুন্দর। ছোটবেলায় তুমি নিশ্চয় প্রত্যেকদিন স্কুলে যেতে। পরে মেঘ এই প্রতিবেদককে জানায় আমিও প্রত্যেকদিন স্কুলে যাই।”
সাগর-রুনির স্মৃতি স্মরণে ধানমন্ডির দৃক গ্যালারিতে আয়োজিত ওই আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে রুনির ভাই নওশের আলম রোমানের সাথেও কথা হয়।
মেঘের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নওশের আলম টাইম নিউজবিডিকে বলেন, পিতামাতাকে হারানোর পর মেঘের দেখভালের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীও নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আর কারো খোঁজ মেলেনি। আরও অনেকে অনেক আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাদের কেউ আর মেঘের পাশে দাঁড়াননি।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392105198.jpg[/img]
তিনি জানান, আমরা চাইও না আমরা থাকতে মেঘের দায়িত্ব কেউ নিক। আমরা বিচার চাই। ছোট্ট শিশুটি এখনও নিজের মতো করে তার বাবা মাকে স্মরণ করে।
তিনি বলেন, “পিতা মাতা হারা ভাগ্নে মেঘ ইন্দিরা রোডের একটি বাসায় নানি নুরুননাহার মীর্জার বাসায় থাকে মেঘ। তারাই তাকে দেখাশোনা করছেন। মেঘ এখন অনেক কিছু বুঝে। বাবা-মায়ের ঘটনাটি এখন অনেকটা প্রকাশিত। বিভিন্ন সময়েই তার মন খারাপ হলে তাদের ছবি দেখে বিভিন্ন ঘটনা গল্প করে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201402/1392105244.jpg[/img]
তার চোখের সামনে যা ঘটেছে সেগুলো ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করলে তাকে ভুলিয়ে রাখতে পারি না।  এখনও সে মাঝে মাঝে বলে মামা জানো বাবা না আমাকে হাতের বাঁধনটা খুলে দিতে বলেছিল। কিন্তু সারা ঘরে রক্ত দেখে মেঘ আর সেই দিকে এগিয়ে যেতে পারেনি।
আবেগাপ্লুত হয়ে রোমান আরও জানান, আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে নিজ উদ্যোগে এই প্রদর্শনী করছি। যাতে আমাদের মতো যারা স্বজন হারিয়েছেন অন্ততপক্ষে তারা বিচার পায়। এ উদ্যোগটা আমাদের খুব ক্ষুদ্র উদ্যোগ। ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও আমরা জানান দিতে চেষ্টা করছি যারা স্বজন হারিয়েছেন তাদের যন্ত্রণা আমরা বুঝি।
[b]ঢাকা, জেইউ, ১১ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম)// কে বি [/b]